ঈদ আসে, ঈদ যায় – মুহূর্ত গুলো ফেরে না

ঈদের বেশ ক’দিন বাকি থাকতেই শুরু হয়ে যায় কেনাকাটার ধুম। সরকারী কর্মচারীরা অনেকের বেতন-বোনাসও হয়তো তখনও হয়নি। বেসরকারী কিছু প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু, তথাকথিত ব্র্যান্ড শপের আউটলেটগুলোতে গেলেই দেখতে পাওয়া যায় ক্যাশ কাউন্টারে বিল পেমেন্টের লম্বা দীর্ঘ লাইন।

ছোট বেলার ঈদের কেনাকাটাগুলো সত্যি একেবারে অন্যরকম ছিল। আগে থেকেই চিন্তা করে রাখতাম এবার ইদে কোনটা কিনবো। শার্ট, প্যান্ট, জুতা, পাঞ্জাবি, টুপি, আতর কোনটাই বাদ যেত না। তখন একেক ইদের সময় একেক কাপড়ের ট্রেন্ড ছিল। কোন সময় প্রিন্টের কাপড়ের শার্ট, কোন সময় চেক কাপড়ের শার্ট সাথে রঙিন বেল্ট!

উফ্! কত স্মৃতি! ভুলে যাওয়া কঠিন।

ঈদের পোষাক কেনার পর থেকেই শুরু হত উত্তেজনা। নতুন জামা-কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল সব আলমারীতে লুকিয়ে রাখতাম পুরনো হয়ে যাবে এই ভেবে।

আর একটু পর পর নিজে নিজে গিয়ে চুপি চুপি আলমারী খুলে দেখতাম কাপড় ঠিক আছে কিনা! নতুন কাপড়ের গন্ধ শুঁকতাম! চুপি চুপি দেখার কারণ আর কেউ যেন দেখতে না পারে। কেউ দেখে ফেললেই ঈদের নতুন কাপড়ের মজা শেষ!

২৯ রোজার পর থেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম চাঁদ দেখার জন্য। যেদিন চাঁদ উঠার কথা সেদিন ইফতারের পর পর সবাই দৌড়ে সামনের রাস্তায় চলে যেতাম চাঁদ দেখার জন্য। চিৎকার হৈ হুল্লোড় করতাম সবাই মিলে।

কেউ কেউ চাঁদ না দেখা গেলেও বলতো ঐ যে আমি দেখছি! আয় আয় দেখাই! গেলেই বলতো, ‘ঐ যে, ঐ যে!’

ঐ যে ঐ যে’র মধ্যে এটা সীমাবদ্ধ, চাঁদ আর দেখা যেতো না। তারপর বাড়ি এসে ট্রানজিস্টার রেডিও নিয়ে বসে বসে বাংলাদেশ বেতার শুনা। কখন ঘোষনা আসবে, ‘পবিত্র সাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা গিয়েছে। আগামীকাল সারাদেশব্যাপী পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে!’

ঘোষনা শোনার পর চরম উত্তেজনা কাজ করতো।

চাঁদ দেখা গেলেই খুশীতে আটখানা হয়ে পড়তাম আর পরেরদিন অর্থাৎ ঈদের দিনের প্ল্যান-প্রোগ্রাম চিন্তা করতাম। ২৯ রোজা না হয়ে যদি ৩০ টা হতো, তখন খুব মন খারাপ হত, ইস! আরেকটা বেশী রোজা রাখতে হবে। চাঁদরাতে কখনোই ভালো ঘুমাতে পারতামনা, একধরণের উত্তেজনা কাজ করত।

যদিও, এখন ৩০ রোজা হলেই আমরা খুশি হই। একদিন ছুটি বেশি যে পাওয়া যায়!

মনে হতো কখন ভোর হবে। কখন ঘুম থেকে উঠবো। প্রতিযোগীতা চলতো কে সবার আগে ঘুম থেকে উঠতে পারে, কে সবার আগে গোসল করতে পারে! তখন তো শীতকাল থাকতো, গোসলের সময় পানি যত ঠান্ডাই হোক সেটা কোন ব্যাপারই ছিল না।

গোসল শেষ হওয়ার পর মনে হতো কখন নতুন জামা আলমারী থেকে বের করবো, কখন পড়বো, কখন সবাইকে দেখাবো!

আহ্! কত মধুর স্মৃতি, আসবে না আর কখনো ফিরে !

ঈদের দিন সারাবেলা কিভাবে কাটাব, কোথায় কোথায় বেড়াতে যাব এই ভেবে। আমার বেড়াতে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেলামী আদায় করা, যত বেশী আত্মীয়দের বাড়ী যাওয়া যায়, তত বেশী সেলামী আদায় করা যাবে – শুধুমাত্র এই উদ্দেশ্যেই আত্মীয়দের বাড়ী বেড়াতে যেতে একপায়ে খাড়া থাকতাম সবসময়। সেলামী আদায়ের এই বুদ্ধিটা আমার মনে হয় ছোটবেলায় সবার মনের মধ্যেই কাজ করে।

নতুন কড়কড়ে নোট পেয়ে তার ঘ্রাণ নেয়ার মুহুর্তটা ছিল সত্যিই অসাধারণ এক সুখানুভূতি। সারাদিন মোটামুটি সব জায়গায় বেড়ানো শেষে , খাওয়া দাওয়া করে মোটামুটি ভালই সময় কেটে যেত। পরিবারের সব সদস্য তখন একসাথে থাকতাম বলে আনন্দের মাত্রাটা ছিল অন্যরকম, সবার সাথে একসাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিয়ে মনের মাঝে একটা স্বর্গীয় অনুভূতি কাজ করতো।

এখনকার দিনের ঈদগুলো একেবারেই অন্যরকম। সারা রমজান মাসেই অফিস নিয়ে ব্যস্ততায় দিনের বেলা সময় কেটে যায়। ঈদের শপিং করলাম কি করলাম না সেটা নিয়ে কোন অনুভূতিই কাজ করেনা।

তবে পরিবারের বাকী সবার জন্যই কেনা হয়।

এখন, ঈদের দিন তেমন কোথাও যেতেও আর ইচ্ছে করেনা। ছোটবেলার মত কেউ আর সেলামীও দেয়না তেমন , তাছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে ধীরে ধীরে কেমন যেন সেই উচ্ছ্বাসটা পাওয়া যায় না। তবে ইদের দিন সন্ধ্যার পর বাজারে সবাই মিলে জম্পেশ আড্ডা দেয়া হয়। সবাই ইদ উপলক্ষে বাড়িতে থাকে।

তবে আজকাল সামাজিকতার অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে।

ঈদের কেনাকাটা দিয়ে শেষ করি লেখাটা। কত মানুষের ঈদের দিন একটু ভাল খাওয়ার সাধ্য নেই, একটা ভাল কাপড় কেনার সাধ্য নেই!

আর আমরা একের অধিক সেট কাপড় নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ছাড়া কিনিই না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।