একটি ডিম দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলী!

শূন্য রানে আউট হইতে চায়না কেউই! কিন্তু ক্রিকেটে এই ০ রানেই খেই হারিয়ে আউট হয়ে যান ব্যাটসম্যানেরা। ৯৯ রানে যেমন মানুষ নার্ভাস অনুভব করে তদ্রুপ এই ০ রানে ব্যাট করা ব্যাটসম্যানদের মনে নার্ভাসনেস কাজ করে।

টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মিলে ২৮৩৫ জন ব্যাটসম্যান ১৫৭১৮ বার শূন্য রানে আউট হয়েছেন। এর ভিতরে টেস্টে ২০৯১ জন ব্যাটসম্যান ৮৮৩১ বার, ওডিআই ক্রিকেটে ১৫০৪ জন ব্যাটসম্যান ৫৯০৬ বার এবং টি টুয়েন্টি ক্রিকেটে ৪৮৫ জন ব্যাটসম্যান ৯৭৬ বার ০ রানে আউট হয়েছেন।

১৪১ বছরের ক্রিকেট ইতিহাসে তিন ফরম্যাটে মিলিয়ে ৪১২৩ জন ক্রিকেটার ব্যাটবল হাতে নিয়েছেন (অভিষেক)। এই ৪১২৩ জনের ভিতরে ২৮৩৫ জনই ০ রানে আউট হবার তিক্ত অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। অর্থাৎ ০ রানে আউট হয়নি মাত্র ১২৮৮ জন ক্রিকেটার। তবে এই ১২৮৮ জন ক্রিকেটারের ভিতরে ৭৮ জন ব্যাটসম্যান ব্যাট হাতে নামতে পারেননি।

ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি ৫৯ বার ০ রানে আউট হয়েছেন মুত্তিয়া মুরালিধরন। এছাড়া কোর্টনি ওয়ালস ৫৪ বার, সানাৎ জয়সুরিয়া ৫৩ বার, গ্লেন ম্যাকগ্রা ৪৯ বার ও মাহেলা জয়বর্ধনে ৪৭ বার ০ রানে আউট হয়েছেন। পাকিস্তানের শহিদ খান আফ্রিদিকে ডাকবাবা, বা ডাকের বরপুত্র ইত্যাদি ইত্যাদি বললেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৮ জন ব্যাটসম্যান তার চেয়ে বেশি সংখ্যক ‘ডাক’ মেরেছেন।

৩ ফরম্যাট মিলিয়ে আফ্রিদির ডাকের সংখ্যা ৪৪ টি। অথচ তারই স্বদেশী ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরামের ডাকের সংখ্যক ৪৫ এমনকি ভারতের জহির খানও ৪৬ বার ডাক মেরেছেন।

আফ্রিদির নাম কেন যে সবাই বলে, তারও একটা যুক্তিযুক্ত কারনও আছে। একজন দর্শক তার জীবনে যতগুলো ব্যাটসম্যানকে ০ রানে আউট হতে দেখেছেন, সেগুলোর ভিতরে আফ্রিদির আউটগুলো ছিল খুবই ইউনিক, মহাকাব্যিক এমনকি স্টাইলিশও। এখনকার সময়ে বিরাট কোহলি ব্যাট করতে নামলে যেমন বাড়ির কর্তাবাবু তার গিন্নির সাথে বাজি ধরে বলতে পারেন যে বিরাট একটি সেঞ্চুরি করেই ফিরবেন, তেমনি আফ্রিদির বেলায়ও গিন্নিকে তার কর্তা বাজি ধরতে পারেন, ‘দেইখো, আফ্রিদি একটা ডাক মেরে ফিরলে বলে!’

টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি, পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট, বিপিএল, বিগ ব্যাশ, পিএসএল, সিপিএল, ন্যাটওয়েস্ট ব্লাস্ট, বিচ ক্রিকেট এমনি বরফের ক্রিকেটে গিয়েও ০ রানের রেকর্ড আছে আফ্রিদির। এগুলো আফ্রিদি বলেই সম্ভব বলে সবাই তাকে আদর করে হয়ত ডাকবাবা বলে থাকে। সর্বশেষ আজ, মানে ১২ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে আফগানিস্তান প্রিমিয়ার লিগেও (এপিএল) ডাক মারলেন তিনি। ডিম দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জলী জানাতেই কি আফ্রিদির এই প্রয়াস? – এই উত্তর অবশ্য অজানা।

যাইহোক এখানে কাউকে ছোট বা হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য কথাগুলো বলছিনা। এখানে শুধুমাত্র পরিসংখ্যানের পর্যালোচনা করা হচ্ছে মাত্র।

লোকে বলে পাকিস্তানীরা নাকি ০ রানে আউট হইতে ভালবাসে। আফ্রিদি আকরামরা এতে খুব অভ্যস্ত ছিল। সঙ্গে ইউনিস খান, ওয়াকার ইউনিস, ইনজামাম, কামরান আকমল, সেলিম মালিক, মোহাম্মদ হাফিজেরাও ৩০ বা ততোধিক বার ০ রানে আউট হয়েছেন। এই তালিকায় যে শুধু পাকিস্তানীরা আসে মূলত সেটা নয়, বরংচ এখানে টেন্ডুলকার, পন্টিং, ক্যালিস, লারা, ওয়াহ, গিলক্রিস্ট, শেবাগ কিংবা ম্যাককালামেরাও আছেন। সদ্য এই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন আমাদের মাশরাফি ও তামিমও! তবে ২৯ ডাক নিয়ে অল্পের জন্য বেচেঁ গিয়েছেন দাদা সৌরভ গাঙ্গুলী, অ্যালান ডোনাল্ড ও কাপিল দেব। ২০০৫ সাল

ডাক যেহেতু সহজলভ্য একটা জিনিস, সেখানে অভিষেকে ডাক মারাটাও একটা আর্ট বলতে পারেন। যদিও কোনো ব্যাটসম্যান কখনই চাননা যে তিনি ০ রানে আউট হন, আর সেটা যদি হয় অভিষেক ম্যাচ, তাহলে তো মোটেই কেউ চাইবেনা। অথচ টেস্ট ক্রিকেটে এই পর্যন্ত ৪৩ জন ক্রিকেটার তাদের অভিষেক টেস্টে উভয় ইনিংসেই ০ রানে আউট হয়েছে যার সর্বশেষ নিদর্শন আয়ারল্যান্ডে অ্যান্ড্রু বালবির্নি ।

এই ৪৩ জনের ভিতরে আবার ১৯ জনই ছিলেন দলের অধিনায়ক! এই আউটকে অবশ্য ক্রিকেটের পরিভাষায় ‘কিংস পেয়ার’ বলা হয়। ২০০৫ সালে ইংল্যান্ড দলের অভিষেক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে প্রথম বলেই ০ রানের আউট হয়ে যান দলীয় অধিনায়ক মাইকেল ভন।

উইকেটটি নিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু সাইমন্ড। প্রতিশোধ হিসেবে বেভান সেদিন অজিদের হারিয়েই দিয়েছিলেন ১০০ রানের ব্যাবধানে। ভনকে আউট করা সাইমন্ডস কেও ফিরে যেতে হয় ০ রানে, উইকেটটি নেন জন লুইস। লুইস সেদিন অস্ট্রেলিয়ার ৩ জন ব্যাটসম্যানকে ০ রানে ফেরত পাঠান প্যাভিলিয়নে; সাইমন্ডস, পন্টিং ও ক্লার্ক।

যে ভাত রাধে সে চুলও বাধে। তেমনি ক্রিকেটে যারা সবচেয়ে বেশিবার শূন্য রানে আউট হয়েছে, ঠিক তারাই অন্য ব্যাটসম্যান কে ০ রানে আউট করেছে।ওয়াসিম আকরাম যেমন ৪৫ টি ডাক মেরেছেন, তেমনি বল হাতে ১৮৯ টি উইকেট নিয়েছেন কোনো ব্যাটসম্যানকে ‘ডাক’ এর মাধ্যমে, এছাড়া গ্লেন ম্যাকগ্রা ১৭৬ বার, মুরালিধরন ১৫৯ বার, চামিন্দা ভ্যাস ১৪৭ বার ডাক উইকেট পেয়েছেন।

ডাক মেরে আউট হওয়া কিংবা ডাক উইকেট তুলে নেওয়া ছাড়াও আরো একটা রেকর্ড আছে ক্রিকেটে। সেটা ডাক না মারা। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপলার ওয়েসেলস তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারে কখনো ডাক মারেননি। বর্তমান সময়ে খেলা ক্রিকেটারদের ভিতরে ভারতের যুজবেন্দ্র চাহাল (৫৭) ও স্যামুয়েল বদ্রী (৫৪)ও তাদের ক্যারিয়ারে কোনো ডাক মারেননি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।