প্রতিভা সাঙমার এক বিন্দু আলো

আজ থেকে ৮৫ বছর আগের ঘটনা!

টাঙ্গাইলের মধূপুরের গভীর অরন্যে গারোদের ঘরে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে শিশু। পরম মমতায় তার নাম রাখা হয় প্রতিভা। পুরো নাম প্রতিভা সাঙমা। এই প্রতিভার জ্ঞান প্রতিভায় যে গোটা মধূপুর আলোকিত হবে তা কে জানতো?

কিন্তু নৃগোষ্ঠী হয়ে জ্ঞান সাধনা, তাও এক মেয়ের! সে সময়ে এমন দুঃসাহসিকতার কথা কল্পনাতেও আসেনি কারোর। আর এমন দুঃসাহসিক স্বপ্ন তাকে জ্ঞান সাধনার সকল বাঁধা দূরে ঠেলে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়।

আশেপাশে কোথাও কোন বিদ্যালয় ছিলনা তখন। নিজ গ্রাম ইদলপুর থেকে বহুদূর হেটে তারপর পাওয়া যেত ঘোড়ার গাড়ী, সেই ঘোড়ার গাড়ী দিয়ে  মুক্তাগাছা পর্যন্ত। তারপর আবার হেটে ছোট ছোট পায়ে বেগুনবাড়ী। সেখান থেকে নদী পেড়িয়ে আবার মাইলের পর মাইল হাঁটতে হত। এই ছিল শুধু তাঁর বিদ্যালয়ে পাঠ নেয়ার গল্প। কতবড় জ্ঞানপিপাসু হলে এমন পারা যায় আমাদের এ আধূনিক যুগে আমরা তা হয়তো ভেবেও বুঝতে পারবো না।

কিন্তু এত কষ্ট করে তিনি যখন পরীক্ষাতে ৮০ ভাগ নম্বর তুলতে পারলেন না তখন তার বাবা তাকে বিয়ে দিতে চাইলেন। তিনি পড়লেন মহা বিপদে। আজ এ বয়সে ও তিনি যখন তার এ জীবনের গল্প বলছিলেন তখন গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ছিল তাঁর। বড় দুঃসময় ছিলো তার জীবনে। তিনি পালিয়ে গেলেন বাড়ী থেকে।  তিনি সেন্ট মেরীতে যোগদান করেন। সেখান থেকে টিচার্স ট্রেনিংয়ে প্রশিক্ষণ নিতে সেগুনবাগিচায় এলেন।

ঘুরে গেল জীবনের মোড়। তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানে হলেন প্রথম। কষ্টের সেই কেষ্ট এতদিনে পেলেন তিনি। যোগদান করলেন হলি ফ্যামিলি গার্লস স্কুলে। কিন্তু মন পড়ে আছে তার মধূপুরের ইদলপুরে। যত বড় কিছুই হন না কেন মহৎ মানুষেরা, বুদ্ধিমানেরা কখনোই নিজের শিকড়কে ভোলেন না।

প্রতিভা সাঙমাও তার ব্যতিক্রম নন। ১৯৬৫ সালে তিনি ফিরে এলেন মধূপুরের ইদলপুরে। তার মত যেন কষ্টকরে কোন মেয়েকে বিদ্যালয় পড়তে না হয় এজন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন – মধূপুর গার্লস স্কুল।

ঘরে ঘরে গিয়ে বোঝাতে লাগলেন শিক্ষার মাহাত্ম্য।  কিন্তু নুন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তারা কি করে বিদ্যালয়ে পাঠাবেন সন্তানকে?

প্রতিভা সাঙমা এবার টাকা খরচ করে বিদ্যালয়ের পোষাক কিনে দিলেন শিশুদের। শুরু হল নবজাগরণ।  দলে দলে শিশুরা আসতে লাগলে বিদ্যালয়ে। মেয়েদের আত্মশক্তি বাড়াতে তিনি ব্যবস্থা করলেন গার্লস গাইডের। সেই থেকে এখন অবধি তিনি আছেন সেই শিক্ষা আন্দোলনের সাথে। জাতি গড়ার মহতি কর্মে।

প্রতিভা সাঙমা তেমনই আলোর বিন্দুর নাম, যে আলোর জন্ম হলে আকাশে সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে আলোর রশ্মি দিকে দিকে ছড়িয়ে গিয়ে চমৎকার এক বিজয়ের আতশবাজি হয়।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।