দ্বিতীয় পুরুষ: অত্যন্ত ‘ফাঁকিবাজি’ কাজ হয়েছে

১৯৯৩ সালে কলকাতার চায়নাটাউনে একটা ঘটনা ঘটে। পরপর তিনজন মারা যায়। একইভাবে কুপিয়ে খুন। প্রায় ২৫ বছর পর ২০১৯ এ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। একই প্যাটার্নে তিনটি খুন আবার ও হয়। এই ঘটনার তদন্ত নিয়েই গল্প।

বাইশে শ্রাবণ যারা দেখেছেন সকলেই জানেন অভিজিৎ পাকড়াশী হচ্ছে পরমব্রত। অমৃতা মানে রাইমা তার একদা প্রেমিকা ছিল। এখন সে বিবাহিত বউ। সূর্য মানে আবির নিজের সাংবাদিকতার কাজই করছে। এখনকার এই খুনের কেসটা তে পরমকে সাহায্য করার জন্য জুনিয়র অফিসার গৌরব এর আগমন ঘটে।

ঋতব্রত এক নাবালক পেশাদার খুনি যাকে সেই ১৯৯৩ সালের খুনের ঘটনার জন্য পুলিশ পাকড়াও করে প্রথমে জুভেনাইল কারেকশন হোম এবং সেখান থেকে পরে জেলে পাঠায়। আর অনির্বাণ হচ্ছে এখনকার অর্থাৎ ২০১৯ সালের এক পেশাদার খুনি যে এখনকার খুন গুলোর সঙ্গে যুক্ত বলে পুলিশ সন্দেহ করছে। এই হচ্ছে মোটামুটি প্রধান চরিত্রগুলো।

একটু কাটাছেঁড়ায় আসি এবার। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ফ্যানেরা! দয়া করে খিস্তি মারবেন না!

  • গল্প

থ্রিলার গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে খুনের মোটিভ। এই গল্পে সেটা অত্যন্ত জোলো এবং খাজা! অন্তত আমার তাই লেগেছে! গল্পটাই যেখানে জোরালো নয় সেখানে থ্রিলার দাড়ায় না। এই গল্পের মূল ফাঁক হচ্ছে খোকা কেন খুন গুলো করছে বা সে খুনের মোটিভ কতটা পোক্ত। এই প্রশ্নের উত্তর ছবিতে নেই! এক কথায় খুব দূর্বল গল্প!

  • অভিনয়

গল্পের যতগুলো প্রধান চরিত্র রয়েছে তার মধ্যে পরমের অভিনয় তুলনামূলকভাবে অন্যদের থেকে বেশি ভালো লেগেছে। বাকিরা সসম্মানে ছড়িয়েছেন! রাইমার কথাই ধরা যাক প্রথমে। বাইশে শ্রাবণ এও রাইমার বিশেষ কোনো কাজ ছিল না শুধুমাত্র ভাত ডাল আর বিরিয়ানির পার্থক্য টুকু বোঝা ছাড়া!

এই গল্পে সেই কাজটাও নেই! এখন সে পরমব্রতর উপেক্ষিত বউ যার বর পুলিশের কাজে ঘুরে বেড়ায় এবং অ্যানিভার্সারি পালন, একসাথে ডিনার, হাসি ঠাট্টা মজা তামাশা এইসব করতে ভুলে যায় বউ এর সাথে। এবং এর জন্য রাইমার মনে হয় তার বিয়ে নাকি ভেঙে যাচ্ছে! এবং এর জন্য রাইমা তার পুরনো প্রেমিক আবিরের কাছে গিয়ে বলে – ‘আই মিস ইউ’!

এমনকি ম্যারেজ কাউন্সিলারের কাছে পর্যন্ত চলে গিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে আসে তার ভেঙে যাওয়া বিয়ে বাঁচাবার জন্য। যদিও একটা মাত্র গানের মধ্য দিয়ে ফোটানো ছাড়া পরিচালক মহাশয় আর কোনো প্রয়াসই নেননি সম্পর্কটা কিভাবে ভেঙে যাচ্ছে সেটা বোঝাবার। অত্যন্ত ফাঁকিবাজি কাজ হয়েছে।

আবিরের সারা গল্পে দশ বারোটা ডায়লগ যেটা না থাকলেও অসুবিধা ছিল না। বরং অযথা আবিরকে এনে একটা ত্রিকোণ প্রেমের দিক দেখানোর ব্যর্থ প্রয়াস করে পরিচালক আমাদের কনফিউজড করে দিতে চেয়েছেন যেটা সিনেমা দেখলে বোঝা যায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক এবং হাস্যকর।

বাচ্চা ছেলে ঋতব্রত কে দেখে মনে হল বড় বেশি পাকামো করছে ছেলেটা। ওর যতটুকু অভিনয় করার মোটামুটি ভাবে করেছে। কিন্তু ওভার অ্যাক্টিং লেগেছে অনেক সময়েই।

শেষে বলব অনির্বাণের কথা যাকে নিয়ে সিনেমার রিলিজের অনেক আগে থেকে প্রচুর মাতামাতি হচ্ছিল। এই সিনেমায় ওর চরিত্রের নাম খোকা। খোকা নাকি এই সিনেমার এক আবিষ্কার! ফাটিয়ে নাকি কাজ করেছে! ইত্যাদি ইত্যাদি। বিশ্বাস করুন আমার বড় আরোপিত লাগলো! মুখে কালো রং ঘষে, চিবিয়ে চিবিয়ে আস্তে আস্তে হিন্দি তে কথা বলা আর কেত দেখিয়ে ডায়লগ ছুড়ে মারার মধ্যে আদৌ কোনো নৃশংস ব্যাপার নেই। এসব বলিউড অনেক আগেই আমাদের থেকে করে ফেলেছে।

বাঙালি বাংলায় থ্রিলার চায়। বাইশে শ্রাবণের মত। রবীন্দ্রনাথের রেফারেন্স টেনে। হিন্দি ফাট বাজি বড়ো খেলো লাগে। পাড়ার রকে বসে যে ছেলেটা কথা বলে দুই বা চার অক্ষরের ব-কার ম-কার ওয়ালা গালাগাল দিতে দিতে, সেই চরিত্র চিত্রায়ন ই পরিচালক করতে চেয়েছেন অনির্বাণের মধ্য দিয়ে। কিন্তু চরিত্র গঠন বা ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের জন্য যতটুকু স্ক্রিন টাইম সময় দেওয়া উচিত পরিচালকের, সেই সময়টুকুই সিজিদ্দা অনির্বাণকে দেননি স্ক্রিপ্ট এর মধ্যে। ফলে শুধুমাত্র কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর চোখা চোখা ডায়লগ এর মাধ্যমে অনির্বাণ খোকা হয়ে উঠতে পারেনি আমার চোখে।

একমাত্র পরম ই এই ছবির অনেকটা প্রায় একা হাতে টেনেছে। পরমের ঘুমের মধ্যে মাঝেমাঝেই বাইশে শ্রাবণ ছবির সেই শেষ দৃশ্য ভেসে ওঠে যেখানে প্রসেনজিৎ ‘হে বন্ধু বিদায়’ বলে নিজের কপালে গুলি করে। সেই স্বপ্নে ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেঙে উঠে বসে পরম। তার বিবাহিত জীবনের দোটানা, তার ভেঙে পড়া, আবার ঘুরে দাঁড়ানো, বন্ধুবিয়োগ এর শোক এগুলো যতটুকু ফুটিয়ে তোলার দরকার, পরম নিজের মতন করে তা অনেকটাই তুলেছেন। বাকি চরিত্ররা তাদের নিজস্ব কাজে যথাযথ। সব মিলিয়ে এই ছবির অভিনয় আহামরি নয়। চলে যায় মাত্র।

  • স্ক্রিপ্ট

এটাও অত্যন্ত সাধারণ মানের। হাততালি কুড়ানোর জন্য সস্তা ডায়ালগ মাঝে মাঝেই ঢোকানো হয়েছে সেটা একটু বুদ্ধি খাটিয়ে দেখলেই বোঝা যায়। বাইশে শ্রাবণ নিয়ে অনেকের অভিযোগ ছিল ছবিটায় বড্ড বেশি গালাগালি ছিল। এই ছবিতে গালাগাল সংখ্যায় কম। শেষের ওই দশ পনের মিনিট ছাড়া। যেখানে ব-কার, ম-কার বা স-কার ওয়ালা দুই অক্ষর এবং চার অক্ষর যথেষ্ট পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে, যা স্বচ্ছন্দে এড়ানো যেত। সস্তা পাবলিসিটি পাওয়ার অত্যন্ত হালকা প্রয়াস এটা।

রাইমা তার পুরনো প্রেমিক আবিরের কাছে গিয়ে তার বর পরম সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলছে আমাদের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, এখন আমি কার কাছে যাব? এই প্রশ্ন যে কত উচ্চমানের সেটা আমি বুঝতে পারিনি! মানে আমার স্বল্প বুদ্ধিতে কুলায়নি! একটি স্বাধীনচেতা মেয়ে বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে বলে অন্য কারো কাছে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করবেই বা কেন!? সে তো আলাদা থাকবে! স্বাধীন থাকবে! কারোর নির্ভরশীলতাতে থাকবে না, এটাই তো কাম্য! সে আবিরের কাছে এসে মরা কান্না গাইছে কেন? এই ধরনের চরিত্র চিত্রায়ন অত্যন্ত স্থূল লেগেছে আমার।

কিছু ডায়লগ বেশ মনোরম বিশেষ করে পরম যখন হাউ হাউ করে কাঁদে তখন। বা যখন গৌরব আর পরমের মধ্যে দাম্পত্য জীবন নিয়ে কথা হয় তখন। মোটের ওপর চিত্রনাট্য সাধারণ মানের।

  • গান

একটা গান ও আমার পদের লাগেনি। ওই ‘যে কটা দিন’ ভাঙিয়ে এই সিনেমাতে অনুপম ভুলভাল কিছু শব্দ বা সুর একসাথে লাগিয়ে গান গেয়ে গেল। কোন মাথামুণ্ডু খুঁজে পেলাম না গানের কথার সঙ্গে স্ক্রিনে যা হচ্ছে তার। এক কথায় খাজা গান।

  • অন্যান্য

আর্ট বা সেট ডিজাইন ভালোই লেগেছে। ক্যামেরার ব্যবহার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যা প্রয়োজন ছিল তাই করা হয়েছে। বাড়াবাড়ি বিশেষ লাগেনি। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বেশ সুন্দর। গল্পটা যদি দুরন্ত হতো আর অভিনয় যদি ফাটানো হত এই ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের সঙ্গে জাস্ট জমে যেত। কোন গানের দরকার হতো না। যদিও যা গান ছিল সেগুলো দিয়েও আহামরি কিছুই হয়নি। এডিট আরো একটু টান টান হওয়া দরকার ছিল বলে আমার মনে হয়েছে। এক্সপ্রেশন শট বড় বেশি সময় ধরে নেওয়া হয়েছে যা প্রয়োজনের অতিরিক্ত। যদিও ছবি দু’ঘণ্টার একটু বেশি সময়ের, কিন্তু এটা যে গল্প সেটা অনায়াসে পৌনে দু’ঘণ্টার মধ্যে গুটিয়ে ফেলা যেত।

আর একটা বিশেষ দিক বলবো যেটা হলো রাইমার চেহারা। বিয়ের অনেক বছর হয়ে যাওয়ার পর সে যথেষ্ট মুটিয়ে গেছে। পরিচালক এমনই কিছু একটা দেখাতে চেয়েছেন। কিন্তু স্ক্রিনে রাইমার ওই ভারিক্কি চেহারা ব্যক্তিগতভাবে আমার চোখে বড় বেমানান ও কটু লেগেছে দেখতে।

  • পরিচালনা

স্পষ্ট বুঝতে পারছি সিজিদ্দা এক একটা সিনেমা এক একটা প্রোজেক্ট হিসাবে নিচ্ছেন। এত ডিটেলিং এ ফাঁক, এত কন্টিনিউইটি এর অভাব, এত ক্যারেক্টার ডেভলপমেন্টের কার্পণ্য, এত স্ক্রিপ্ট তৈরিতে অনীহা, ফাঁকি না মারলে হয়না! অনেকেই বলছে শেষ দশ মিনিটে দুরন্ত টুইস্ট আছি নাকি। ওই শেষ দশ মিনিটে যে টুইস্ট আছে সেটা দেখলে আপনি হয় তো যারপরনাই বিরক্ত হবেন! অত্যন্ত ফালতু টুইস্ট! বাস্তবে এরকম হয় কিনা আমার জানা নেই!

মোটের ওপর সবমিলিয়ে ফার্স্ট ডে সেকেন্ড শো প্রায় জলে গেল আমার! সিনেমা হিট কি ফ্লপ জানিনা। আমার জানার দরকার ও নেই। আমার রেটিং দশে পাঁচ!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।