ডোয়াইন ‘দ্য রক’ জনসন: কখনো হাল না ছাড়ার গল্প

কোনো এক থ্যাঙসগিভিং অনুষ্ঠানের দিন। অথচ, বাড়িতে ডিনারের জন্য কিছু নেই বললেই চলে। পরিবারটা মনে প্রাণে সৃষ্টিকর্তার কাছে পার্থনা করতে থাকলো, অন্তত থ্যাঙসগিভিং উপলক্ষ্যে্ও এই রাতে কেউ ডিনারের দাওয়াত দেয়।

এই পরিবারটা হল ডোয়াইন জনসনের। দ্য রক খ্যাত ডোয়াইন জনসন। পুরো নাম ডোয়াইন ডগলাস জনসন। ১৯৭২ সালের দুই মে তাঁর জন্ম হয় ক্যালিফোর্নিয়ার হ্যাওয়ার্ডে। ওপরের গল্পটা শুনে নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, শৈশবে তাঁর পরিবারে সুখ ছিল না বললেই চলে।

মায়ের পরিবারের সাথে থাকতেন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার আগে তার প্রাথমিক শিক্ষা হয় রিচমন্ড রোড প্রাইমারি স্কুলে। এরপর চলে আসেন আমেরিকায়। টেন গ্রেড অবধি পড়াশোনা করেন হাওয়াইয়ের হনোলুলুতে। বাবার চাকরীর সুবাদে এরপর চলে আসেন পেনিসিলভানিয়াতে।

ভেবেছিলেন আমেরিকান ফুটবলার হবে। স্কুলে থাকতে ভালই খেলতেন। স্থানীয় লিগ থেকে প্রস্তাবও পেতেন। কিন্তু ও পথে যাওয়া হয়নি। কারণ, মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্কলারশিপ পেয়ে যান ভাল গ্রেড থাকার সুবাদে। ১৯৯৩ সালে অবশ্য মিয়ামি হারিকেন্স ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

 

১৯৯৫ সালে তিনি ক্রিমিনোলজি ও ফিজিওলজি থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর কানাডিয়ান ফুটবল লিগের একটা ক্লাবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু, মাত্র দু’মাস পরই বাদ পড়েন।

আয় না থাকায় ওই সময়টায় একদমই ভেঙে পড়েছিলেন জনসন। পকেটে সম্বল মোটে সাত ডলার। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়টা কাটাচ্ছিলেন। মায়ের কাছে গেলেন, অনেক কান্নাকাটি করলেন। ভবিষ্যতে কি হবে, এই ভেবে নিজেকে অসহায় ভাবতে শুরু করেছিলেন।

তবে, শরীরে যে তাঁর লড়াকুর রক্ত। বাবা ছিলেন পেশাদার রেসলার, দাদাও তাই।

তাঁর বাবার বাবার রেসলিংয়ে তখন পয়সাকড়ি ছিল না বললেই চলে। একদিন বাড়ি ফিরে দেখেন দরজায় তালা। বাড়িতে ঝুলতে উচ্ছেদের নোটিশ। মা চিৎকার করে বললেন, ‘এখন আমরা কোথায় যাবো?’। অভাব-অনটনে এক পর্যায়ে বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল।

তাই, বাবা-দাদাকে নিজের হিরো মানলেও কখনোই রেসলার হতে চাইতেন না দ্য রক। অর্থাভাবে সেই না চাওয়া পথেই হাঁটা শুরু করলেন। বাবার কাছে গেলেন। বাবা প্রথমে ছেলের রেসলার হওয়ার ইচ্ছায় সায় দিলেন না। কারণ, তিনি নিজেই জানেন এই জীবনে কি আছে, আর কি নেই।

বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হলেন জনসন। বলা ভাল, ছেলের আগ্রহ দেখে রাজি হতে বাধ্য হলেন বাবা। বাবার কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করলেন। বাবার নাম ছিল রকি জনসন, সেখান থেকেই রক নিজের নামকরণ করেন।

এরপরও বাঁধা এসেছে। রেসলিংয়ের সরঞ্জাম কেনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না তাঁর হাতে। বাধ্য হয়ে ভলিভলের নি-প্যাড কিনলেন, এক চাচার কাছ থেকে শর্টস ধার করলেন। রেসলিংয়ে নিজের অভিষেকের দিন প্রায় এক হাজার মাইল গাড়ি চালিয়ে আসেন।

পৌঁছানো মাত্রই সঞ্চালক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আগে কখনো রেসলিং করেছো?’ ডোয়াইন জনসন ঠোঁটে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে গর্বের সাথে জবাব দিলেন, ‘রেসলিংটা আমার রক্তেই আছে।’ ঠিক, এরপর রেসলিংয়ের সাতটি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে নেন দ্য রক।

রেসলিংয়ে যখন সুসময়ে ছিলেন, তখন ক্যারিয়ারে নাটকীয় এক মোড় আসলো। ডোয়াইন জনসন নাম লেখালেন সিনেমায়, কাজ করা শুরু করলেন হলিউডে। শুরুটা হয় ২০০১ সালের ‘দ্য মামি রিটার্নস’ দিয়ে।  সেই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন ডলার। গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস বলছে এর আগে আর কোনো অভিনেতাই নিজের অভিষেক সিনেমার জন্য এত পারিশ্রমিক নেননি।

এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক ছবি করে চলেছেন। জিতেছেন একগাদা পুরস্কার। শোনা যাচ্ছে, অভিনয় ক্যারিয়ার শুরু করে একটা সময় তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও করবেন।

নিজের ক্যারিয়ারের সাফল্য নিয়ে জনসনের মূল্যায়ন খুব সাদামাটা। তিনি বলেন, ‘সাফল্যকে সব সময় গ্রেটনেস নিয়ে মাপা যায় না। এটা ধারাবাহিকতার একটা ব্যাপার। আপনাকে ধারাবাহিক ভাবে কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে, গ্রেটনেস আসতে বাধ্য।’

এজন্যই তো লোকে বলে, কখনো হাল ছেড়ো না বন্ধু!

– গোলকাস্ট ও বুমসবিট অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।