দুবাইয়ের বিলাসবহুল জীবন: মিথ বনাম বাস্তবতা

সংযুক্ত আরব আমিরাতের অন্যতম জনপ্রিয় শহর দুবাইয়ের কথা আমরা কে না শুনেছি। বৈশ্বিক এবং বাণিজ্যিক শহর হিসেবে ইতোমধ্যে এর সুনাম ছড়িয়েছে পৃথিবীজোড়া। কিন্তু এই শহরের আসল রূপ অনেকটাই ফিকে হয়েছে শহরটির নামে ছড়ানো কিছু গুজবের কারণে।

গৎবাঁধা কিছু গুজব যেমন প্রচুর সংখ্যক শেখ ধনকুবের, স্তুপ করা সোনা হিরে জহরত, বিলাসবহুল প্রমোদতরী, বিড়ালের পরিবর্তে চিতা বাঘ পোষ মানানো কিংবা সবার উঠোনে ন্যূনতম একটি তেলের কুয়ো সেই সাথে প্রতি কিলোমিটারে শত শত হারেম বা অন্তঃপুর আসলেই আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তাই আজকের আয়োজনে এই বিলাসবহুল মহানগরীর এমনকিছু কানাঘুষো কথাবার্তা তুলে ধরা হয়েছে যা হয়ত প্রমাণ করবে যা রটে তার শুধু কিছুটাই বটে পুরোটা নয়।

  • দুবাই-বিলিওনিয়ারদের রাজধানী!

অনেকে শুনে অবাক হলেও, দুবাইকে নিয়ে এই গুজব চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু কথা কি আদৌ সত্যি? উত্তর হবে অবশ্যই না। বলা হয়, পুরো পৃথিবীজুড়ে বিলিওনিয়ারের সংখ্যা প্রায় ৫০০০ যার মধ্যে মাত্র ২০জন হল দুবাইয়ের। এমনকি সবচেয়ে বেশি বিলিওনিয়ারের তালিকায় থাকা প্রথম ও দ্বিতীয় শহর দুইটি হল যথাক্রমে বেইজিং এবং নিউইয়র্ক।

  • দুবাইতে কোন দারিদ্রতা নেই

বলা হয় দুবাইতে নাকি কোন দারিদ্র্যতা নেই। এই শহরের আলো ঝলকানো রুপ সজ্জা এই কথাকে বিশ্বাস করানোর ক্ষেত্রে অনেক বড় একটি প্রভাবক হিসেবে কাজ করলেও বাস্তবতা বলছে অন্য কথা।

এই শহরে গড়পড়তা একজন শ্রমিকের মাসিক বেতন মাত্র ২০০-৩০০ ইউএস ডলার এবং একটি মোবাইল সংযোগের সর্বনিম্ন খরচ ধরা হয় প্রায় ৩০ইউএস ডলার। এথেকে এই কথা স্পষ্ট যে জীবন যাপন এইখানে সত্যিই অনেক কঠিন। ব্যয়বহুল এই শহরে একটি ছোট্ট রুমে গাদাগাদি করে থাকে প্রায় ৫ জন লোক। এই শহরের চাকচিক্য দেখে যারা ভেবেছেন এই শহর শুধু বড়লোকেদের তাদের আশায় গুড়েবালি।

  • সন্তান প্রতিপালনের জন্য দুবাই আদর্শ শহর

একদমই সত্যি নয় কথাটি। এই শহরে জীবিকার তাগিদে আসা বেশিরভাগ অভিবাসী তাদের সন্তানদের রেখে আসে তাদের নিজ দেশে। একটি সাধারন সরকারি স্কুলে ১১বছরের শিক্ষা-জীবনে আপনার সন্তানের পিছনে আপনাকে ব্যয় করতে হবে প্রায় ১০০,০০০ইউএস ডলার যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৮০,০০,০০০ টাকার সমান। আর এই অনুপাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীর জন্য গাঁটেরপয়সা কতটা ঢালতে হবে তার অনুমান নিশ্চয় আমরা করতেই পারছি। সেই সাথে এই শহরের অসম্ভব গরম এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্লাশরুম শিশুর মানসিক বিকাশের পক্ষেও উপযোগী নয়।

  • দুবাই একটি দেশ!

আমরা অনেকেই এই ভুলটা করে থাকি। আমরা ভাবি দুবাই একটি দেশ। কিন্তু কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দুবাই হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি শহর মাত্র।

  • দুবাই একটি অ্যালকোহল মু্ক্ত শহর

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সেই সাথে ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাসী এই শহরে অমুসলিমদের জন্য সুরা পান বৈধ। সব ধরনের হোটেল,বার এবং নাইটক্লাবে সুরা তথা মদ যথেষ্ট সহজলভ্য। তবে এই শহরে মদ পানের জন্য একধরনের বিশেষ কার্ড দেখাতে হয় অথবা মদ গ্রহণকারীকে অবশ্যই টুরিস্ট ভিসা প্রদর্শন করতে হবে।

  • দুবাইতে চাকরি-বাকরির কোন অভাব নেই

দুবাইতে কাজ করতে ইচ্ছুক সকলেই এই কথাটা শুনে থাকে। কিন্তু যৌক্তিক ভাবে এই কথা সঠিক নয়। কারণ এই শহরে প্রবাসীদের সঠিক এবং যথোপযুক্ত ওয়ার্কিং ভিসা ছাড়া ৩০দিনের মধ্যেই দেশে ফেরত পাঠানো হয়। সেই সাথে দুবাইয়ের স্থানীয়দের মত প্রবাসীরা চাকরী বা কার্যস্থান সহজে পরিবর্তন করতে পারে না এবং এই সংক্রান্ত বেশ কিছু বিধি নিষেধও কর্তৃপক্ষ প্রবাসীদের উপর জারি করে রেখেছে।

  • দুবাই খুব পরিষ্কার এক শহর

দুবাই ট্যুরিজম এর মনভোলানো ভিডিও দেখে আমরা অনেকেই হয়ত ভাবি দুবাই আসলে খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি শহর। আসল চিত্র কিন্তু অনেকটায় ভিন্ন। এই শহরের বাড়ন্ত জনসংখ্যা, অসম্পূর্ণ নির্মাণকাজ, অবকাঠামোগত উন্নয়নের স্বার্থে প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যের পরিবর্তন, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মত বিষয়গুলো এই শহরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় অন্যতম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • দুবাই শহরের আবহাওয়া খুব ভাল

বসন্তে এবং গ্রীষ্মে এই শহরের তাপমাত্রা প্রায় ৪৮ ডিগ্রি ছুঁয়ে থাকে। সেই সাথে প্রচণ্ড আর্দ্রতা এবং অভ্যন্তরীণ সূর্যালোক গরমের মাত্রাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। সেই সাথে অত্যধিক পরিমাণ ধুলাবালি এই শহরের আকাশকে পর্যন্ত ধূসর করে দিয়েছে। মরুভূমি সংলগ্ন এই অঞ্চল থেকে মনে হয় না এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা উচিত।

  • বর্তমান অবস্থায় আসতে দুবাইয়ের অনেকদিন সময় লেগেছে

দুবাই ফেরত অনেকের মুখে আমরা এইকথা প্রায়ই শুনে থাকি। কিন্তু আসলেই কি দুবাইয়ের বর্তমান অবস্থা তাদের বহুদিনের কঠোর কর্মযজ্ঞের ফল? উত্তর অবশ্যই না। কারণ, ১৯৭১ সালে বেশকিছু আমিরাত বা স্টেট নিয়ে গঠিত হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। আর এই অল্পদিনের ব্যবধানে অন্যতম নবীন শহর দুবাই আমাদের মুগ্ধ করেছে তাদের নিত্যনতুন আবিষ্কার, অর্জন, প্রযুক্তি, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দিয়ে।

  • দুবাইয়ের পুলিশ শুধু বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে

ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা সবাই দুবাইয়ের পুলিশের বহরে যুক্ত হওয়া ল্যাম্বরগিনি কিংবা বেন্টলি কোম্পানির বিলাসবহুল গাড়ি গুলোর সাথে পরিচিত। কিন্তু আসলেই কি দুবাই পুলিশ শুধু এই সকল বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করে?

অবশ্যই না, তাদের বহরে শালীন মডেলের বিএমডব্লিইউ, অডি থেকে সাধারণ মডেলের টয়োটাও আছে। দুবাইয়ের নাগরিকদের বিলাসবহুল স্পোর্টস কারেগুলোকে ধাওয়া করার জন্য দুবাই পুলিশ তাদের বহরের বেশ কিছু উচ্চ গতিসম্পন্ন বিলাসবহুল গাড়ি রেখেছে মাত্র।

  • এই শহরে সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়

প্রযুক্তি এই শহরের সব আনাচে কানাচেই রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস স্টপেজ থেকে এটিএম বুথ। স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তারক্ষী কিংবা বিমানবন্দরে ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে সবকিছুই স্বয়ংক্রিয়। কিন্তু এত স্বয়ংক্রিয়তার মাঝেও কিছু কিছু এলাকায় সাধারন জলনিষ্কাশন ব্যবস্থা-ই অনুপস্থিত। যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সেই সকল শহরের চলচ্ছক্তি লোপ পায়। এমনকি কিছু কিছু এলাকায় এখনো পর্যন্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভালো মত গঠন করা হয়নি।

  • দুবাইয়ে লোকে চিতা, সিংহ পোষে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যানে দুবাই শহরে চিতা কিংবা সিংহ পালনের বেশকিছু ছবি আমরা সবাই কম বেশি দেখেছি। সেই সকল ছবি হয়ত আমাদের অনেকের মনে এই ধারনা বদ্ধমূল করেছে যে দুবাইয়ের মানুষজন পোষা প্রাণী হিসেবে কুকুর বিড়ালের পরিবর্তে চিতা কিংবা সিংহের মত হিংস্র, বন্য প্রানীকে বেশি পছন্দ করে। কিন্তু পর্দার অন্তরালের ঘটনা বলছে অন্য কথা।

দুবাইয়ে বহিরাগত বন্য প্রানীকে পোষা প্রাণী হিসেবে অথবা সংরক্ষনের নিমিত্তে নিজের কাছে রাখা আইনত দণ্ডনীয়। কেউ যদি চিতা কিংবা সিংহের মত বন্য প্রাণীকে নিয়ে দুবাইয়ে ভ্রমনে বের হয় তবে কর্তৃপক্ষ সেই ব্যক্তিকে ছয় মাসের জেল এবং ২৭০০ থেকে ১৩৮,০০০ ইউএস ডলার পর্যন্ত জরিমানা করতে পারে।

দুবাইয়ের বেশিরভাগ স্থানীয় লোকজন পোষ্য প্রানী হিসেবে কুকুরের চেয়ে বিড়ালকেই বেশি পছন্দ করে।

  • দুবাই-গগনচুম্বী অট্টালিকার শহর

এই শহরে ১৬৩ তলা গগনচুম্বী অট্টালিকার পাশাপাশি বহুতল বাগান বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট-বিল্ডিং এবং একতলা বাড়ির উপস্থিতি ভালোই চোখে পড়ে। তবে স্থানীয় লোকজন নিজেদের নিজস্ব বাগানবাড়িতে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে যেখানে তাদের আশেপাশে সাধারণত কোন প্রতিবেশী থাকে না।

  • দুবাইয়ে শুধু অ্যারাবিক এবং স্থানীয় লোকজন থাকে

সমীক্ষা বলছে, দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যার ২৫% ভারতীয় আর মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯% লোক স্থানীয়। ভারতীয়দের পরে দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ দখল করে রেখেছে পাকিস্তানি এবং বাংলাদেশি অভিবাসীরা, যারা মূলত নির্মাণকাজ কিংবা কল-কারখানায় কাজের উদ্দেশে এসে থাকে।

বলা হয়, দুবাইয়ের মোট জনসংখ্যার ৯১% মানুষ অভিবাসী। তাই বলা।যায় দুবাই শুধু আরবের লোকেদের জন্যই নয়, এই শহর সারা বহিঃবিশ্বের মানুষের।

  • দুবাইয়ের সম্পদের প্রাচুর্য এসেছে তেলের আশীর্বাদে

বহু বছর আগে দুবাইয়ের অধিবাসীরা তেল উত্তোলনের পূর্বে মূলত মুক্তো আহরণ করে জীবিকা নির্বাহ করত এবং এই ব্যবসায় তারা যথেষ্ট সফল ছিল। পারস্য উপসাগর থেকে উত্তোলিত মুক্তোর অলংকার সমূহ তৎকালীন সময়ে বিশ্বজোড়া সমাদৃত ছিল এবং মহামূল্যবান হিসেবে পরিচিত ছিল। যার কারনে দুবাইয়ের সকল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং জাদুঘরে মুক্তোর ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে অত্যন্ত সুচারুভাবে।

তবে আজো দুবাই তার আকর্ষণীয় জীবনযাত্রা এবং অর্থের শক্তিশালী ছায়া নিয়ে আমাদেরকে চমৎকৃত করে বারবার। এই শহরের অসাধারণ এবং নিত্যনতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং আধুনিক নগরায়ন, শহরটিকে পর্যটকদের নিকট অন্যতম পছন্দের স্থান হিসেবে ঠাঁই দিয়েছে।

– ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।