ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি এখন শুধুই সস্তা ট্রলের বিষয়?

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস ও আবহমানকাল ব্যাপী বয়ে আসা বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস ও গৌরব ঐতিহ্যের এক রঙিন দেয়াল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চমাধ্যমিক স্তর শেষ করার পর দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থী’র স্বপ্ন ও তাদের বাবা-মা তথা অভিভাবকদের  চাহিদা ও আগ্রহের জায়গা এই বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যই নয় এদেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখা প্রতিষ্ঠানও নিঃসন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ। প্রশাসনিক শাসনব্যবস্থার সুবিধার্থে বঙ্গভঙ্গ করা হলেও এর ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয় নবগঠিত পূর্ব বঙ্গ ও আসাম প্রদেশ যার রাজধানী হয় ঢাকা। ঢাকাকে কেন্দ্র করে এদেশের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার বীজ রোপিত হয় এবং ফলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সুযোগ বেড়ে যায়। কিন্তু কায়েমি স্বার্থবাদীরা এ উত্থান মেনে নিতে পারেনি। এর ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা জেরে অবশেষে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।

বঙ্গভঙ্গ রদে ব্রিটিশ সরকারের এ সিদ্ধান্তে এদেশের মানুষের প্রতিবাদের ফসলেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৩ সালের নাথান কমিশনের আলোকেই ১৯২১ সালের ১ জুলাই পথচলা শুরু হয় স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। প্রতিবছর প্রতিষ্ঠার এই দিনটিকেই পালন করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস’। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এদেশের ইতিহাসের এক অনবদ্য অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতিহাস-ঐতিহ্যে এই ক্যাম্পাস এতটাই সমৃদ্ধ যে দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে এই ক্যাম্পাস। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে  উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের দশকের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণাঢ্য অবদান ও গৌরবময় ইতিহাস।

পথচলার পর থেকেই দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের তীর্থস্থানে পরিণত হওয়া এ গৌরবময় প্রতিষ্ঠান মুখরিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, আহমেদ ছফা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁঞা, কাজী মোতাহার হোসেন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, গোবিন্দ চন্দ্র দেব, হুমায়ুন আহমেদ, আনিসুজ্জামান, হুমায়ুন আজাদ, বুদ্ধদেব বসু, জাহানারা ইমাম, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শাহ এ এম এস কিবরিয়া সহ দেশ বরেণ্য অসংখ্য প্রথিতযশা জ্ঞানীগুণ মনীষীর পদচারণায়।

শহিদ মিনার, রাজু ভাস্কর্য, অপরাজেয় বাংলা, টিএসসি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর, কার্জন হল, বাংলা একাডেমীর বইমেলা সহ দেশের বিখ্যাত, ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় জায়গাগুলো অবস্থিত এই ক্যাম্পাসের ভেতরেই। দেশের ৬৪ টি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীর সমাগমে মুখরিত থাকে বলে ঢাবির ক্যাম্পাসকে বলা হয়ে থাকে মিনি বাংলাদেশ। আর শিক্ষার্থীদের আবাসস্থল ঢাবির একেকটা হল বহন একেকটা ইতিহাস ও গৌরবময় ঐতিহ্যের।

শিক্ষার বর্তমান মানদন্ড আর র‍্যাংকিং যেমনই হোক, বাংলাদেশের বাস্তবতা ও পেক্ষাপট বিবেচনায় ইতিহাস ঐতিহ্যের সে জায়গাটা এখনও ধরে রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তাইতো প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিক স্তর পেরোনোর পরে মাত্র সাত হাজার আসনের বিপরীতে ভর্তিযুদ্ধে নামে প্রায় ৩/৪ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী। এই যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে অধিকাংশ সেরাদেরই জায়গা হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

যুদ্ধজয়ের পরে ঢাবিকে আপন করে পাওয়ার পরে এ ভুবনে পথচলা শুরুর পরেই চরম বাস্তবতা মুখোমুখি হয় শিক্ষার্থীরা। এতোদিনে স্বপ্নে দেখে এক বিশ্ববিদ্যালয়কে আর বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায় তার পুরোটাই বিপরীত। হতাশাকে একপাশে নিয়ে মশা আর ছারপোকার সাথে মিলেমিশে বাস করা জীবনের  চরম দৈন্যতা, প্রতিবন্ধকতা, সমস্যা, প্রতিকুলতা প্রভৃতি ও একধরনের মানসিক যন্ত্রনার সাথে পরিচিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুঝতে শেখে স্বপ্ন ও বাস্তবতার সুবিশাল পার্থক্য।

২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইংরেজি বিভাগে ভর্তির মনোনয়ন লাভের মাধ্যমে স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় আমার দীর্ঘ লালিত স্বপ্নের মুখর পদচারণা। কিন্তু কিংবদন্তিদের রেখে যাওয়া এ ঐতিহাসিক লীলাভূমিতে পথচলার শুরু পর স্বপ্নগুলো বাস্তবতার মুখোমুখিতে শুধু তীব্র হতাশই হয়েছি। দেশের আঞ্চলিক ও ভৌগলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখা এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত ইতিহাস, গৌরব, ঐতিহ্য আজ সীমাবদ্ধ ইতিহাসের কালো অক্ষরেই।

দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ও প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে অভিহিত এ বিশ্ববিদ্যালয় আজ বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে একহাজার আর এশিয়ার র‌্যাংকিংয়ে একশর বাইরে। এ থেকেই পরিষ্কার বিশ্বায়নের যুগে যুগের চাহিদা মেনে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা কতদূর এগোতে পেরেছি! অযোগ্য-অকর্মণ্য প্রশাসন, শিক্ষার্থীদের আবাসনের তীব্র-কৃত্রিম সংকট, শিক্ষার মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা, শিক্ষার পরিবেশের সংকট সবমিলিয়ে একটা শিক্ষার্থী যখন শিক্ষার উচ্চমাধ্যমিক স্তর শেষ করে অনেক বড় স্বপ্ন ও অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নিয়ে এসে এসব সমস্যার বাস্তব মুখোমুখি তখন তার হতাশার জায়গাটা আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে।

পড়াশোনা শেষ করেও সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বই ভাগ শিক্ষার্থীই হতাশার চরম শিকার। সম্প্রতি এক সপ্তাহের ব্যাবধানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবরেও খুব বেশি অবাক হইনি।  ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য ও সম্প্রতি নবীন শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়া নিয়ে উপাচার্য মহোদয়ের হাস্যকর বক্তব্যে অবাক হয়েছি, হতাশ হয়েছি, সবেগে স্তম্ভিত হয়েছি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া উপাচার্য মহোদয়ের ৪৭ সেকেন্ডের আলোচিত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্যের বর্ণনায় উঠে এসেছে দশ টাকার চা, সমুচা, চপ, সিঙ্গারায় টিএসসি’র ঐতিহ্যের কথা! যে ছেলেটি বা মেয়েটির কখনো ঢাবির কোন একটি হলের বারান্দা দিয়ে হাটার সৌভাগ্যও হয়নি সেও আজকে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠকে নিয়ে ট্রল করছে এ লজ্জা কোথায় কিভাবে লুকাবে বাংলাদেশ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানের উপাচার্যের চেয়ারে সমাসীন হয়ে ইতিহাস ও সংস্কৃতির অধ্যাপক সম্মানিত স্যার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে  কিভাবে দশ টাকার চা, সমুচা, চপ, সিঙ্গারাকে গিনেজ বুক অফ ওয়াল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতির হাস্যকর কথাবার্তা বলেন তা আমাদের মতো ক্ষুদ্র মস্কিষ্কে কোনভাবেই বোধগম্য হওয়ার কথা নয়। নবীনদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে গিয়ে স্যার কি ভুলে গেছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীতের সমৃদ্ধ, সোনালী ইতিহাস?

নাকি গর্ব করার মতো সবকিছু আমাদের ফুরিযে গিয়েছে যে এখন গর্ব করার জন্য দশ টাকার চা, সমুচা, চপ, সিঙ্গারাকে গিনেজ বুক অফ ওয়াল্ড রেকর্ডসে অন্তর্ভুক্তির দাবি তুলবো? এসব বলতে গিয়ে সম্মানিত স্যার কিভাবে ভুলে গেলেন যে এসব যত সামান্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নবাগত শিক্ষার্থীদের সামনে, দেশের মানুষের কাছে উপাচার্যের চেয়ারে বসা নিজেকে হাস্যরসাত্মক বস্তুকে পরিণত করছেন?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন হাস্যরসের বিষয়বস্তু আখতারুজ্জামান তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত উপাচার্য তথা স্বয়ং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এক আখতারুজ্জামানকে নিয়ে ট্রল হলে আমাদের কিছুই আসবে যাবেনা কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চায়ের টং দোকানের প্রতিটি বেঞ্চিতে যখন একজন আখতারুজ্জামানের আড়ালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের গৌরবময় চেয়ারটি কলঙ্কিত হয়,  প্রিয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন হাস্যরসের বস্তুতে পরিণত হয় তখন সে দুঃখ, আফসোস, হতাশা আর বেদনা আমরা কোথায় রাখি? এতো এতো ইতিহাস আর ঐতিহ্যের আড়ালে এ মর্মবেদনা লুকানোর জায়গা কি আমাদের সত্যিই আছে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।