পিরিচে ঢেলে চা পান করার রীতি’র পেছনের ঘটনা

আমরা শৈশবে দেখতাম একটু বয়স্ক লোকেরা কাপ থেকে পিরিচে ঢেলে চা বা কফি পান করতেন। আজো অনেকেই করেন। তবে,  এই চল এখন বেশি চোখে পড়ে না। তবে এর ইতিহাস বেশ পুরোনো।

সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, কাপ থেকে পিরিচে ঢেলে চা/কফি পান করার এ রীতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংসদের উচ্চকক্ষ বা সিনেট ধারণার জন্ম হয়েছে! এটাকে যদি বাড়িলে বলা মনে হয়, তাহলে অন্তত এটুকু নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সিনেট গঠনের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন স্বয়ং কাপ-পিরিচ প্রসঙ্গ টেনেছেন। ইউএস সিনেটের ওয়েবসাইটে এই ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে।

পিরিচে ঢেলে চা পান করার রীতি কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসছে। কাপের গরম চা ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগে। কিন্তু, পিরিচে ঢেলে নিলে চায়ের লেয়ার পাতলা হওয়ায় তা তুলনামূলক দ্রুত ঠাণ্ডা হয়। এতে আরাম করে চা পান করা যায় এবং জিহবা পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

সম্ভবত সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ কিংবা অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে এ রীতির প্রচলন হয়। উনবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্বব্যাপী এটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এতটাই জনপ্রিয়তা পায় যে, স্বয়ং জর্জ ওয়াশিংটন মার্কিন সংবিধান প্রণয়নের সময় এটিকে মেটাফোর হিসেবে ব্যবহার করেছেন।

জর্জ ওয়াশিংটন প্রথম দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট কংগ্রেসের প্রস্তাব দেন। কনভেনশনাল ডেলিগেটরা তার প্রস্তাবে সম্মত হন এবং সিনেট গঠন করেন। থমাস জেফারসন তখন একটি সাংবিধানিক কনভেনশানে যোগ দিতে ফা্রন্সে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে তিনি জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে সিনেট গঠনের ব্যাখ্যা জানতে চান।

ওয়াশিংটন তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কাপ থাকা সত্বেও আমরা কেন পিরিচে ঢেলে কফি পান করি?’, জেফারসন জবাব দেন, ‘ঠান্ডা করার জন্য’। ওয়াশিয়ংটন তখন বলেন, ‘এখানেও একই উদ্দেশ্য। আমরা আইনপ্রণেতাদের (নিম্নকক্ষ) প্রণীত আইন আরও ঠাণ্ডা (অধিক বিবেচনা) করার জন্য সিনেটে (উচ্চকক্ষ) ঢালবো।’

১৯ শতক জুড়ে পিরিচে করে চা বা কফি খাওয়ার বেশ চল ছিল। এর ছোয়া লেগেছিল উপমহাদেশেও। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পিরিচে করে চা খেতেন। এই সংক্রান্ত একটা ঘটনার কথা ভারতের আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী চিন্ময় নিজের বইয়ে লিখেছেন।

সেটা ১৯১৬ কি ১৯১৭। জাপান ও আমেরিকায় লম্বা একটা সাহিত্য সফরে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এর বছর তিনেক আগে জিতেছেন নোবেল পুরস্কার। ফলে, তখন তিনি বিশ্বজুড়ে বেশ পরিচিত।

তো, একদিন কোনো একটা জাপানি বাড়িতে চায়ের দাওয়াত পেলেন রবীন্দ্রনাথ। সবাই যখন কাপে চা খাচ্ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ পিরিচে ঢেলে খাচ্ছিলেন। সেটা দেখে জাপানিরাও একই কাজ শুরু করলো।

একজন বাধ্য হয়ে রবীন্দ্রনাথকে জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘আপনি এভাবে খাচ্ছেন কেন?’

রবীন্দ্রনাথের জবাব, ‘এটাই আমাদের রীতি। কিন্তু, আপনারা কেন আমাকে অনুসরণ করছেন?

পাল্টা জবাব আসলো, ‘কারণ আপনি খুবই মহান একজন মানুষ!’

যদিও, ইতিহাস বলে – পিরিচে ঢেলে চা খাওয়াটা মোটেই উপমহাদেশীয় রীতি নয়!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।