মুম্বাইয়ের মাফিয়া কুইন সমগ্র

ভারত, মুম্বাই, আন্ডারওয়ার্ল্ড – এই তিনটা শব্দ মনে আসলেই প্রথমেই হয়তো চোখের সামনে ভেসে উঠবে দাউদ ইব্রাহিম কিংবা ছোটা শাকিলের ছবি। একটু জানাশোনাদের ছোটা রাজন, করিম লালা, হাজী মাস্তান বা ভারাদারাজন মুদালিয়ারের কথাও মনে পড়তে পারে। বোঝাই যাচ্ছে, মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড মূলত পুরুষতান্ত্রিক এক অপরাধজগৎ ছিল। তবে, এত পুরুষের ভিড়েও কয়েকজন নারী ‘আলো’ কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন।

  • হাসিনা পার্কার

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের ঘটনা। দাউদ ইব্রাহিম তখন পুলিশের চাপে পড়ে মাত্র ভারত ছেড়ে চলে গেছেন দুবাইয়ে। তখন মুম্বাইয়ে ডি কোম্পানির প্রভাব একটু কম। অরুণ গাওলি তখন একছত্র আধিপত্ত পাওয়ার নেশায় খুন করে দাউদের বোনের স্বামী ইসমাইলকে খুন করে ফেলে। দাউদের সেই বোনটি ছিলেন হাসিনা, হাসিনা পার্কার। তারই প্রতিশোধ হিসেবে দাউদ ও ছোটা শাকিলের লোকজন মুম্বাইয়ের গলিতে গলিতে ‍ঘুরে ফিরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে অরুণের গ্যাঙকে।

সেসব মিশনের খবর রোজ আসতো হাসিনার কাছে। না চাইতেও তখন থেকে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের কাঠামোর মধ্যে চলে এসেছেন। এরপর ১৯৯৩ সালের মুম্বাই ব্লাস্টের পর তো স্রেফ দাউদের বোন হওয়ার কারণে ব্যাপক পুলিশী ঝামেলার মধ্যেও পড়তে হল তাকে। কালক্রমে নিজেকে ভাঙতে বাধ্য হলেন পার্কার।

দাউদের সুবাদে মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ডের ওপর খবরদারী করারও ‍সুযোগ চলে আসলো। এরপর হৃদরোগে মৃত্যুর আগ অবধি নাকি মু্ম্বাইয়ে ডি-কোম্পানির ব্রাঞ্চটাই চালাতেন তিনি। তাঁর নামে ৮৮ টা মামলা ছিল, কিন্তু, আদালতে হাজিরা দিয়েছেন মাত্র একবার!

  • রেশমি মেমন ও শাবানা মেমন

রেশমি হলেন আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন টাইগার মেমনের স্ত্রী। আর টাইগারের ভাই আইয়ুব মেমনের স্ত্রী হলেন শাবানা। এই চারজন মিলেই ১৯৯৩ সালের মুম্বাই বোম ব্লাস্টের পরিকল্পনা করেন। ডি-কোম্পানির সাথে তাঁদের সখ্যতা ছিল। জানা যায়, ব্লাস্টের পর তারা প্রাথমিক ভাবে দুবাই পালিয়ে যান। এরপর আশ্রয় নেন পাকিস্তানের করাচিতে। মুম্বাই পুলিশ ও ইন্টারপোল এখনো এই দুই নারীকে হন্যে হয়ে খুঁজছে।

  • জেনা বাই দারুওয়ালি

তিনি মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় নারী ডনদের একজন। আশির দশকে জেনা বাই নাকি দাউদ ইব্রাহিম, হাজি মাস্তান ও কমির লালাদের সাথে ভাল সম্পর্ক রাখতেন। স্বয়ং হাজী মাস্তান তাঁকে ‘আপা’ বলে ডাকতেন। পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের লোকজনের সাথেও তাঁর বৈঠক হত। একবার নাকি ২২ জন ডনের সাথে এক সাথে বৈঠক করেছিলেন জেনা বাই। এটা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ইতিহাসেই বিরাট একটা ব্যাপার। এখানেই শেষ নয়, জেনা বাই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরাজি দেসাইকে ‘ভাই’ ডেকে রাঁখী বেধে দিয়েছিলেন।

  • স্বপ্না দিদি

আন্ডারওয়ার্ল্ডের রমরমা যুগে দাউদকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল। বিরল সেই মানুষদের একজন হলেন স্বপ্না দিদি। তাঁর মূল নাম হল আশরাফ খান। তাঁর স্বামী মেহমুদ কালিয়া এক সময় দাউদের সাথে কাজ করতেন। একবার দাউদের মদদেই পুলিশ এনকাউন্টারে মারা যায় কালিয়া। প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন আশরাফ। সেই থেকে তাঁর নাম হয় স্বপ্না। সহচররা ডাকতো স্বপ্না দিদি নামে।

স্বপ্না দাউদকে হত্যার ছক কষেছিলেন। এর জন্য তিনি নিজে অস্ত্রচালনাও শিখেন। পরিকল্পনা ছিল শারজাহ গিয়ে শেষ করে দেবেন দাউদকে। কিন্তু এর আগে নিজের দলেরই একজনের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রাণ হারান স্বপ্না। ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাগপাড়ায় নিজের বাড়িতেই স্বপ্নার স্বপ্ন বিসর্জন দেওয়া হয়।

  • নীতা নায়েক

অরুণ গাওলির শ্যুটারদের হামলায় গ্যাঙস্টার অমর নায়েক পঙ্গু হয়ে হুইলচেয়ারে বসে পরতে বাধ্য হন। ভাই অশ্বিন নায়েক তখন গ্যাঙয়ের দায়িত্ব নেন। তখনই দৃশ্যপটে আসেন অশ্বিনের স্ত্রী নীতা নায়েক। তিনিও স্বামীর ‘ব্যবসা’ চালাতে কোনো কার্পণ্য করেননি। যদিও, তিনি একটা সময়ে রাজনীতি যোগ দিয়েছিলেন। অশ্বিনের অনেক নিষেধ করার পরও নীতা শিব সেনার একজন সক্রীয় কর্মী ছিলেন। পরে নাকি স্বামীর নির্দেশেই তাকে গুলি করে মারা হয়েছিল।

  • বেলা আন্টি

জেনা বাইয়ের আগেই মদের ব্যবসার সম্রাজ্ঞী বনেছিলেন বেলা আন্টি। সেটা ৭০-এর দশকের কথা। এমনকি ডন ভারাদারাজন মুদালিয়ারের হুমকির পরও তিনি ডরভিতে ব্যবসা চালিয়ে যান। বেলা আন্টি পুলিশ বাহিনীকে হাতের মুঠোয় রেখেছিলেন। নিয়মিত নাকি তাদের ঘুষ দিতেন, মদের কেস পাঠাতেন। ফলে, কোনোভাবেই কেউ তাঁর ব্যবসা বন্ধ করতে পারেনি।

  • সামাইরা জুমানি

গ্যাঙস্টার আবু সালেমের সাবেক স্ত্রী। আবু সালেম যখন সামাইরাকে বিয়ে করেন, তখন তিনি জোগেশ্বরীর সামান্য এক কলেজ ছাত্রী ছিলেন। স্বামীর সাহচর্যে তিনি ডি-কোম্পানির সাথে যুক্ত হন। ডি-কোম্পানির ইতিহাসে এমন নৃশংস নারী নাকি আগে কোনোদিনও আসেননি। চাঁদাবাজি, বোম ব্লাস্ট ও প্রতারণা-সহ নানারকম অপরাধে তাঁর জড়িত থাকার প্রমাণ করা যায়। তিনি বিশ্বজুড়ে মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকাভূক্ত অপরাধীদের একজন। গুঞ্জন আছে এখন তিনি আমেরিকায় পালিয়ে আছেন।

  • রুবিনা সিরাজ সাইদ

রুবিনার গল্পটা বলিউডের সিনেমাকেও যেন হার মানায়। ডি-কোম্পানির গোপন অস্ত্র ছিলেন তিনি। দাউদ ইব্রাহিমের সহচর ছোটা শাকিল যখন জেলে তখন এই রুবিনাই নাকি খবর আদান প্রদানের কাজ করতেন। জেলে খাবার, টাকা এমনকি মাদক ও অস্ত্র সরবরাহ করতেন তিনি। ডি-কোম্পানিতে তিনি হিরোইন নামে পরিচিত। কারণ, নিজের রুপকে কাজে লাগিয়েই নাকি এসব করতেন রুবিনা। যদিও, এখন বাইকুলা কারাগারে যাবজ্জীবন কারাভোগ করছেন তিনি।

– স্কুপহুপ, ইনউথ ও ম্যানস ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।