ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ: ভবিষ্যতের কাণ্ডারী যারা

এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে নবীন যারা, বা যাদের প্রথম দেখেছি, তাদের মধ্যে যাদের খেলা ভালো লেগেছে –

  • হাসান মুরাদ

সবার আগে তার নামটি লিখেছি, কারণ সবচেয়ে বেশি মনে ধরেছে এই বাঁহাতি স্পিনারকেই। প্রিমিয়ার টি-টোয়েন্টিতে প্রথম চোখে পড়ল, এরপর মূল প্রিমিয়ার লিগেও দেখলাম। বিকেএসপির হয়ে ছেলেটি এবার ২২ উইকেট নিয়েছেন প্রিমিয়ারে।

যতটুকু দেখেছি, ভালো জায়গায় ক্রমাগত বল রাখতে পারে। টেম্পারামেন্ট দুর্দান্ত। ব্যাটসম্যানকে পড়ে বোলিং করছে বলে মনে হয়েছে। এক জায়গায় টানা বল করে যাওয়া হয়তো খুব দারুণ কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্ত এই ছেলেটি সেই কাজ করেছে ওভারের পর ওভার, ম্যাচের পর ম্যাচ। আমার কাছে মনে হয়েছে, অসাধারণ সহজাত সামর্থ্য এটি তার। এজন্যই লিগে তার ইকোনোমি রেট ছিল অবিশ্বাস্য, ৩.৭৫!

তার পরও যদি এসবকে স্পেশাল কিছু মনে না হয়, তার বয়সটা জানলে সবকিছুই স্পেশাল মনে হবে। অফিসিয়াল বয়স মোটে ১৭! বয়সের কারণেই তার বোলিং, তার টেম্পারান্টে, তার ধারাবাহিকতা, সবকিছু আরও বাড়তি নম্বর পাচ্ছে। আমি সাধারণত দ্রুত কাউকে নিয়ে মন্তব্য করি না, পর্যন্ত না দেখে ভবিষ্যত নিয়ে বলি না, কিন্তু এই ছেলেটিকে দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি, হি ইজ ওয়ান ফর দা ফিউচার। হয়ত, খুব নিকট ভবিষ্যতই।

  • সাব্বির হোসেন

প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে তার একটি ছক্কা দেখে প্রথমে ভালো করে দেখতে বাধ্য হই। সেদিন আরও দুটি ছক্কায় ৩২ বলে করেছিলেন ৪৭। তার পরও মূল প্রিমিয়ার লিগেও বেশ ভালো করেছেন। ব্যাটিংয়ে জড়তা নেই। শট খেলতে পছন্দ করেন। নিজের জোনে বল পেলে শট খেলতে দ্বিধা করে না। উইকেটে তার অ্যাপ্রোচ, স্বতস্ফূর্ততা, নড়াচড়া, সবই ভালো লেগেছে। অফিসিয়াল বয়স ২২। শাইনপুকুরের হয়ে লিগে ১০ ইনিংসে করেছেন ৩৭৩ রান। বোলিংটাও খারাপ না। নিয়েছেন ১০ উইকেট।

  • আনিসুল ইসলাম ইমন

গাজী গ্রুপের বিপক্ষে ম্যাচে কামরুল ইসলাম রাব্বির বলে দুর্দান্ত দুটি ফ্লিক শটে ছক্কা দেখে মুখ দিয়ে আচমকাই বেরিয়ে এলো, “এই মার্ক ওয়াহটা কে!”

এই রে, মারতে আসবেন না যেন। মার্ক ওয়াহ বানিয়ে ফেলিনি তাকে। স্রেফ স্টাইলিশ শট দেখে হুট করেই বলা। হ্যাঁ, এই ছেলেটির ব্যাটিং বেশ স্টাইলিশ, বিশেষ করে ফ্লিক, কাভার ও স্কয়ার ড্রাইভ নান্দনিক।

সাব্বিরের মতো ইমনের ব্যাটিং অ্যাপ্রোচ, দলের জন্য খেলার তাড়না ভালো লেগেছে। যতক্ষণ উইকেটে থাকেন, দারুণ স্বচ্ছন্দ। মনেই হয় না কোনো সমস্যা হচ্ছে খেলতে। তবে ভালো খেলতে খেলতেই হুট করে আউট হয়ে যান। ১৩ ম্যাচে ৩২.৬১ গড়ে ৪২৪ রান, এই পরিসংখ্যান আরও ভালো হতে পারত টেম্পারামেন্ট আরও ভালো হলে, কিংবা আচমকা মনোযোগ হারিয়ে না ফেললে। অফিসিয়াল বয়স ২১, নিশ্চয়ই এসব আরও শিখবেন সামনে।

  • সুমন খান

তাকেও প্রথম দেখেছি প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টিতে। সেরা উদীয়মান ক্রিকেটারের পুরস্কার জিতেছিলেন এই পেসার। এরপর মূল প্রিমিয়ার লিগে ১১ ম্যাচে নিয়েছেন ১৫ উইকেট। যতটুকু দেখেছি, গতি শুরুতে ভালোই থাকে। লেংথে খুব ধারাবাহিক নন, তবে আচমকা অস্বস্তিকর লেংথ থেকে বল তুলে ব্যাটসম্যানকে বিপাকে ফেলে দেন। টেম্পারামেন্ট ততটা পোক্ত নয়, তবে কিছু কিছু বোলারের উইকেট শিকারের প্রবণতা থাকে, তাকেও তেমন মনে হয়েছে। তিনিও বিকেএসপির, বয়স ১৯।

  • মুকিদুল ইসলাম

এইচএসসি পরীক্ষার কারণে খুব বেশি মাচ খেলতে পারেননি। তবে যতটুকু খেলেছেন, নজর কাড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল সেটুকুই। মূল কারণ, তার উচ্চতা, গতি ও আগ্রাসী বোলিং। ৬ ফুটের বেশি লম্বা। ১৮ বছর বয়স বিবেচনায় গতিও বেশ। অ্যাপ্রোচে বেশ আক্রমণাত্মক। নিজেকে দেখিয়ে দেওয়া, প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার একটা তাড়না দেখা যায় বোলিংয়ের ধরণে। তাকে নিয়ে আলাদা করে ভালো লাগার কথা বলেছেন জাতীয় নির্বাচকেরা, বর্তমান-সাবেক বেশ কজন ক্রিকেটার। দারুণ সম্ভাবনাময় একজন, যাকে খুব যত্ন করে গড়ে তোলার দরকার।

  • অনারেবল মেনশনস

তানজিদ হাসান তামিম (উত্তরা স্পোর্টিং ক্লাব, বাংলাদেশ অ-১৯ দলের ওপনার)

আমিনুল ইসলাম (বিকেএসপি, ব্যাটসম্যান, বয়স ১৯)

মানিক খান (প্রাইম দোলেম্বর, পেসার, বয়স ২২)

তানজিদ হাসান তামিম

গত মৌসুমে অভিষিক্ত নবীনের ধারাবাহিকতা

  • মোহাম্মদ নাঈম

কয়েকদিন আগের আরেকটি লেখায় উল্লেখ করেছি নাঈমের কথা। গত মৌসুমে প্রিমিয়ারে অভিষেকে ৫৫৬ রান করেছিলেন। সেঞ্চুরি ছিল না, ফিফটি ছিল চারটি। এবার ৩ সেঞ্চুরি, ৫ ফিফটিতে করেছেন লিগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮০৭ রান।

সহজাত স্ট্রোকমেকার, হ্যান্ড আই কো-অর্ডিনেশন ভালো, ন্যাচারাল টাইমার। গতবারের চেয়ে তার রান ক্ষুধা বেড়েছে। শটের রেঞ্জ বেড়েছে। বড় ইনিংস খেলার তাড়না বেড়েছে। সবই দারুণ ব্যাপার। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোয় রান করেছেন, দলের ত্রাতা হয়েছেন। তার মানে টেম্পারামেন্ট ভালো হচ্ছে। তবে অফ স্টাম্পের বাইরে আরও আঁটসাঁট হতে হবে, খুব গভীরভাবে কাজ করতে হবে এখানে। ফুট ওয়ার্ক ভালো করতে হবে আরও। বাউন্ডারি শটের বাইরে তার অন্য শটের অনেকগুলো সোজা ফিল্ডারের হাতে যায়, গ্যাপে বা আলতো খেলে এক-দুই বের করায় উন্নতি করতে হবে। ফিটনেস আরও ভালো করতে হবে।

জানি, একজন ১৯ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানের হয়তো খুব বেশিই দাবি করে ফেলছি। তবে দাকে দারুণভাবে মনে ধরেছে বলেই এত কিছু। সহজাত সামর্থ্যের সঙ্গে এসব ঘষামাজা করতে পারলে লম্বা দৌড়ের ঘোড়া হবেন।

  • রবিউল হক

গত মৌসুমে প্রিমিয়ারে অভিষেকে নিয়েছিলেন ১৪ ম্যাচে ২৭ উইকেট। এবার ১১ ম্যাচে ২২ উইকেট।

উইকেট শিকারের প্রবণতার কথা বলছিলাম। রবিউলের এটি বেশ ভালো আছে। এমনিতে খুব বিপজ্জনক কিছু মনে হবে না, কিন্তু আচমকাই উইকেট নেওয়ার মতো ডেলিভারি করে বসবেন। একটু রিদম বোলার, কখনও ছন্দ পেয়ে গেলে উইকেট শিকারি ডেলিভারি নিয়মিতই করতে থাকেন। এজন্যই ২৫ ম্যাচে ৪৯ উইকেট হয়ে গেছে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে, দুই মৌসুমে ৩ বার ৫ উইকেট নিয়ে ফেলেছেন।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।