দহন: একটি মর্মযাতনার আখ্যান

‘দহন’ এর শাব্দিক অর্থ পোড়া বা দগ্ধ হওয়া৷ কেউ দগ্ধ বাহ্যিকভাবে হতে পারে আবার অভ্যন্তরীণভাবেও হতে পারে৷ বস্তুগত দহন দৃষ্টিগোচর হয়, কিন্তু অন্তরের দহন মানে অন্তর্জ্বালা বা মর্মযাতনা থাকে দৃষ্টির অগোচরে৷ সে যাতনার দাহে যে পুড়ে সেই কেবল যন্ত্রণার ভয়ংকর রূপটা ধাবন করতে পারে৷

বাহ্যিক দহন কী করে অন্তর্দহনের কারণ হয়ে যায়, ‘দহন’ সিনেমা সে উপাখ্যানের এক করুণ বর্ণনা৷ সিনেমার প্রধান চরিত্র তুলার কর্মের মাধ্যমে বাহ্যিক দহনের যাত্রা শুরু হয় আর তার মনস্তাপ থেকে শুরু হয় অন্তর্দহের৷ তাই সিনেমার নামকরণ ‘দহন’ যুতসই এবং সার্থক৷

ভিন্ন ধর্ম এবং ভিন্ন সামাজিক অবস্থানের পাঁচটি অণুগল্প মুলগল্পের সাথে এগিয়ে যেতে শুরু করে৷ একজন ভিখারীর ছেলের ঢাকা ভার্সিটিতে চান্স, মায়ের চিকিৎসা করাতে অর্থকষ্টে ভোগা এক ছেলে, নায়িকা হবার স্বপ্নে বিভোর এক মেয়ে, বাবাকে হজ্বে পাঠাতে উদগ্রীব এক ছেলে এবং আধুনিক ক্ষুদ্র পরিবারে বাবা-মার ব্যস্ততার দরুণ স্নেহবঞ্চিত একটি বাচ্চা মেয়ের গল্প৷

প্রতিটি গল্প আমাদের সমাজের একেকটি অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করে৷সিনেমার শুরুতে অণুগল্পগুলো এক সাথে বর্ণনা করায় একটু তালগোল পাকিয়ে যাবার উপক্রম হলেও বিরতি কিছুক্ষণ আগে সরল রৈখিকভাবে চলা গল্পগুলো একটি বিন্দুতে এসে মিলিত হয়৷ পরস্পর বিচ্ছিন্ন গল্পগুলো মিলিত হয়ে একটি নতুন সুত্র তৈরী করে এবং এই সুত্রের উপর ভর করে সিনেমা তার অন্তিম পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়৷

রায়হান রাফি ‘দহন’ এর প্লট নির্বাচনে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন৷ একটি নিটোল প্রেমের গল্পের সিনেমা ‘পোড়ামন ২’ থেকে ঝাঁপ দিয়ে তিনি দহনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে এসেছেন৷ এতে একজন নির্মাতার বৈচিত্রতা প্রকাশ পায়৷ ‘পোড়ামন ২’-এর রাফি থেকে দহনের রাফি আরও পরিপক্ক৷ রিয়েল লোকেশনে তিনি সিনেমার বেশিরভাগ অংশের শুট করেছেন৷

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তা, রাস্তার পাশে চা-সিগারেটের ছোট টংয়ে তিনি তার চরিত্রদের দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন৷ বস্তির দৃশ্যগুলো ধারনেও কৃতিত্ব দেখিয়েছেন৷ ড্রোন শটে শহরের মধ্যে গিজগিজ করা ঘরের চালা গুলো দেখা গিয়েছে৷ ছোটগলি দিয়ে প্রধান চরিত্রের সাথে পুলিশের ধাওয়ার চিত্রগুলো নান্দনিকতা ছড়িয়েছে৷ শট নেবার ক্ষেত্রে রাফির কিছু টেকনিক ভালো লেগেছে৷

অফিসের ভেতর থেকে বাহিরের সংলাপরত চরিত্রের দৃশ্যধারণ, টায়ারের মাঝখানের ছিদ্র দিয়ে বিপরীত পাশের অভিনেতার চিত্রধারণ, বস্তির একটা ঘরের জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্যধারণ, হকার্স মার্কেটে শার্ট কেনার চিত্রধারণ৷ পরিচালক গল্পটা খুব সাধারণভাবে বলে গিয়েছেন৷ এ সাধারনেও রয়েছে অসাধারণত্ব৷ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্পর্শে থাকা ঘটনাগুলোই তিনি তুলে এনেছেন তার সিনেমায়৷ গ্রামের পরিবারেগুলোতে ভাইদের মধ্যে ঝগড়া এবং এতে বউদের ঋণাত্বক ভুমিকার ফলে পরিবারের ভাঙ্গন, ঘরের থালাবাসন ধুয়ে দেয়ার বিনিময়ে ভিখারিনীকে খাবার দেয়া, ব্রেইন ওয়াশ করে অল্প টাকায় কিডনী পাচার করা, বাবা মা উভয়ে চাকুরী করার ফলে স্নেহবঞ্চিত সন্তান, আমাদের আশেপাশের পরিচিত গল্প এসব৷ এটাই পরিচালকের সার্থকতা, চেনা প্লট গুলো সিনেমায় নিয়ে আসা৷ অতিনাটকীয়তা দিয়ে শেষের টুইস্টটি ভিন্ন রকম করার চেষ্টা করেন নি৷ প্লট যা ডিমান্ড করে তিনি সেটাই করেছেন৷

সিনেমার প্রাণ তুলা চরিত্রে অভিনয় করা সিয়াম৷ পুরো সিনেমা তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে৷চরিত্রটি অভিনয়ের অনেক সুযোগ পেয়েছে এবং সিয়াম তা কাজেও লাগিয়েছেন৷সিয়াম তার জীবনের সেরা অভিনয়টা করে গেছেন তুলা চরিত্রে৷ পাড়ার মাস্তানরূপে যেমন ছিলেন রাফ এন্ড টাফ, তেমনি অন্তর্দহে জর্জরিত একজন অনুতাপীর রূপেও ছিলেন সাবলীল৷

ছোট চুলে ভ্রু কেটে কানে রিং লাগিয়ে মাস্তানের ভূমিকায় লিডারের নির্দেশে তিনি যেমন গাড়ি ভাঙচুর করতে ক্ষান্ত হননা, তেমনি প্রেমিকার জন্য নিজের জীবন বিসর্জনের কথা বলতেও কার্পণ্য করেননা৷ বিরতির কিছুক্ষন আগ থেকে একেবারে শেষ পর্যন্ত অনুতাপী সিয়ামের অভিনয় অনেকটা মাইলফলক হয়ে থাকবে তার অভিনয় জীবনে৷ ‘পোড়ামন ২’-এর একজন প্রেমিক পুরুষের এমন রুদ্রমূর্তিতে অভিনয় করে যাওয়াটা সহজ ছিল না তার জন্য এবং সেক্ষেত্রে আমার দৃষ্টিতে তিনি সফল হয়েছেন৷

গার্মেন্টস কণ্যা আশারূপে পুজা ছিলেন স্বভাবজাত৷ বাংলা সিনেমার নায়িকা সংকটের যুগে পুজা চেরী একটি আশীর্বাদের নাম৷ মাস্তানের প্রেমিকা চরিত্রে তিনি ছিলেন সাবলিল অভিনয়ে৷ চরিত্রটির ব্যাপ্তি ছোট৷ তাই তার খুব বেশি কিছু করার সুযোগও ছিল না৷

আশার মা চরিত্রটি দরিদ্রক্লিষ্ট স্বামীহারা মায়েদের প্রধিনিত্ব করে, যিনি সংসার টিকিয়ে রাখতে নিজে সেলাই কাজ করে আর মেয়েকে গার্মেন্টেসে কাজ করান৷ একজন টিপিক্যাল মুসলিম মা মাস্তানের সাথে মেয়ের প্রেম করা মেনে নিতে না পেরে মেয়েকে শাসন করেন আবার পড়শি যখন মেয়েকে নিয়ে কটুমন্তব্য করে তাকে ঝাঁড়ি দিতেও পিছপা হননা৷

এই চরিত্রটির বলিষ্ট অভিনয়গুণ পর্দায় তার উপস্থিতির সময় চোখ অন্যত্র ফেরাতে দেয়নি৷ মেয়ের যন্ত্রনা দেখে সহ্য করতে না পেরে ‘আল্লাহ আমার মেয়েরে তুমি উঠায়া নাও’ সংলাপে বেদনার্ত মায়ের করুণ আর্তি ফুটে উঠে৷

‘লিডার, দুই লাখে তো আজকাল ব্রেকিং নিউজ হয়না’ বলা একজন ধুরন্ধর নেতা চরিত্রে ফজলুল রহমান বাবু ছিলেন একজন সুবিধাভোগী, যিনি তার লিডার থেকে দুইলাখ টাকা নিয়ে তার অধঃস্তন মাস্তানদের পাঁচ হাজার টাকা দিয়েই কাজ সারেন৷

চরিত্রটির ব্যাপ্তি অল্প হলেও প্লটের গতিপথ নির্ধারণের তার ভূমিকা ব্যাপক৷ রাশভারী কণ্ঠে বাবুর সংলাপ ডেলিভারী ভারিক্কি ভাব এনেছে চরিত্রে৷ চোখে সুরমা লাগিয়ে,পাঞ্জাবী পরে তার সাগরেদদের মগজ ধোলাইয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের সমাজের নেতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠে৷ একজন সাংবাদিক চরিত্রে মম ভালো অভিনয় করলেও তাকে পর্দায় আরও বেশি দেখানো দরকার ছিল এবং চরিত্রটি দিয়ে অারেকটু এক্সপেরিমেন্ট করতে পারতেন পরিচালক৷

‘কীরে টিকটিকির বাচ্চা, মেলাক্ষণ ধরে দেখছি ঘুর ঘুর করতেছোস’- সংলাপ মর্গের পাহাড়াদার চরিত্রটির৷ খুব অল্প সময়ের মধ্যে অভিনেতার জাত চিনিয়েছেন তিনি৷ পুলিশের ইনফরমার চরিত্রে জামিল ভালো অভিনয় করেছেন৷ যতটুকু সময় স্ক্রিনে ছিলেন ততোটুকুই ফাটিয়ে অভিনয় করেছেন৷ জামিলের জন্য আফসোস হয় তাকে দিয়ে আরও ভালো কিছু চরিত্র করানো দরকার৷

বাবা-মাকে পর্যাপ্ত সময় কাছে না পাওয়ার আক্ষেপ ফুটে উঠে স্কুলগামী ছোট বাচ্চাটির চরিত্রের মাধ্যমে৷ সে খুব সাবলিল অভিনয় করেছে৷ এই বাচ্চাটিই হয়তো হয়ে যেতে পারে নেক্সট পুজা যদি তাকে পর্যাপ্ত পরিচর্চা করা হয়৷

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সিনেমার শক্তিশালী দিকের একটি৷ ব্লাস্টের পরে ভিএফএক্সের মধ্যদিয়ে যখন ব্লাস্টের শিকার প্রতিটি চরিত্রের অবস্থান দেখানো হচ্ছিলো তখনকার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক মনকে সিক্ত করে তুলে৷ ‘আল্লাহু আল্লাহু’ এবং ‘খাঁচার পাখি’ গান দুটোর ব্যবহার পরিচালকের দক্ষতার পরিচয় বহন করে৷

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার বাতাসে লাশের গন্ধ কবিতাটা যেন পুরো সিনেমার গল্পকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়৷ হঠাৎ করে কবিতাটির আবৃতি একেবারে ভিতরে গিয়ে ধাক্কা দেয়৷ সেজন্য পরিচালকের ধন্যবাদ প্রাপ্য৷

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।