সেতুকে কি মনে আছে?

দুপুরে একসাথে খাবার খাওয়ার জন্য মা ছেলের জন্য অপেক্ষা করে থাকে। ছেলে কখন ম্যাচ শেষ বাড়ি ফিরবে সে আশায় পথ চেয়ে থাকে। সময় নদীর স্রোতের মত পেরিয়ে যাচ্ছে, কতলোক রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে। কিন্তু সেতুর দেখা মিলে না!

‌সবে মাত্র জাতীয় লিগে নিজের ৫০ তম ম্যাচটি খেলে ছেলে বাসায় ফিরেছে। ফিরেই পরেরদিন সকালে স্থানীয় এক ম্যাচ খেলতে বাসা থেকে কিটব্যাগ গুছিয়ে বের হয়ে যান সাজ্জাদুল হাসান সেতু। ম্যাচ শেষে রিকশায় করে বাসার দিকে রওনা হতেই পেছন থেকে একজনের ডাক পড়লো। ঘাড় ঘুরাতেই সেতু দেখল সেলিম!

এই সেলিম হলেন খুলনার মোহাম্মদ সেলিম যিনি বাংলাদেশ দলে উইকেটকিপার হিসেবে টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। খুলনার চুকনগরে আব্বাস নামের একজনের হোটেল খুব জনপ্রিয়। সেখানকার খাসির মাংস খুব বিখ্যাত পুরো এলাকাজুড়ে। সেলিম সেতুকে নিয়ে দুপুরের খাবার সেখানে খেয়ে নিতে চাইলেন।

এদিকে মা হয়ত সেতুর জন্য খাবার নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। তাই সেতুর মন কিছুতেই সায় দিচ্ছে না। সেলিমের সাথে ছিল জাতীয় দলের আরেক ক্রিকেটার ও জাতীয় লিগে খুলনা বিভাগের অধিনায়ক মানজারুল ইসলাম রানা।

সেলিম, রানা ও আরেক ক্রিকেটার শাওনের জোরাজুরিতে অবশ্য শেষ পর্যন্ত তাদেরকে না করতে পারেননি সেতু। কিটব্যাগটা রিকশাচালককে বাসায় পৌঁছে দিতে বললেন এবং বললেন সে যেন মাকে দুপুরের খাবার খেয়ে নিতে বলে। রাতে বাসায় ফিরে মা-ছেলে একসাথে রাতের খাবার খাবে।

সেলিম ও রানার বাইকে চড়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পথ পাড়ি দিচ্ছে রানা ও শাওন। শাওন বাইকের পেছন থেকে খুনসুটি করে বিরক্ত করায় পথিমধ্যে শাওনকে সেলিমের বাইকে পাঠিয়ে দেয় রানা। তাই সেতু চলে আসলো রানার বাইকে।

দুটি বাইক রাস্তায় সমান্তরালভাবে চলছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই রানার বাইকটি দেখতে পাচ্ছে না সেলিম। হয়ত একটু পিছিয়ে পড়েছে কিন্তু দৃষ্টিগোচর হওয়ার মত এত পিছিয়ে পড়ার তো কথা নয়! সেলিম বাইক নিয়ে একটু পেছনে ফিরে গেল। পরক্ষণে যা দেখল তা খুব মর্মান্তিক।

রানার বাইকটি পড়ে আছে রাস্তার পাশে। একটু আগেও যারা চোখের সামনে ছিল সেই রানা ও সেতুর দেহ নিথর হয়ে রাস্তায় পড়ে রয়েছে। তাদের শরীর গড়িয়ে রক্ত রাস্তায় পড়ছে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুজনের।

মানজারুল ইসলাম রানা জাতীয় দলে খেললেও খেলতে পারেননি সাজ্জাদুল হাসান সেতু। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে সেতুর অবাধ বিচরণ ছিল। সেতু ছিলেন টপ অর্ডারের একজন ব্যাটসম্যান। খুলনা বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলতেন সেতু।

মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৫০টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেন তিনি যেখানে তিনটি সেঞ্চুরি ও ১২টি হাফ সেঞ্চুরিতে সংগ্রহ করেছিলেন ২৪৪৩ রান। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে ধানমন্ডি ক্লাব, ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও সিটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন তিনি। একটি সেঞ্চুরি ও দুটি হাফ সেঞ্চুরিতে লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ারে ৩৯ ম্যাচে সেতু সংগ্রহ করেন ৬৮০ রান।

২০০৭ সালের ১৬ মার্চ নিভে যায় সাজ্জাদুল হাসান সেতু ও মানজারুল ইসলাম রানার প্রাণপ্রদীপ। মাত্র ২২ বছর বয়সে রানা ও ২৮ বছর বয়সে সেতুকে ছেড়ে যেতে হয় এই পৃথিবী। খুব সম্ভবত একটি দ্রুতগামী  অ্যাম্বুলেন্স পেছন থেকে রানার বাইককে ধাক্কা দিলে তাদের দুজনের মৃত্যু হয়।

মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও সেতু বলেছিল রাতে বাসায় ফিরে মায়ের সাথে বসে একসাথে খাবার খাবে। কিন্তু সে খাওয়া আর হলো কই! তার আগেই যে মায়ের মমতার মায়া ত্যাগ করে চিরতরে হারিয়ে গেলেন সাজ্জাদুল হাসান সেতু। সেতুর বন্ধু মানজারুল ইসলাম রানার খুব ইচ্ছা ছিল একদিন লাল সবুজের জার্সি গায়ে বিশ্বকাপ খেলতে মাঠে নামার।

আর কয়েকদিন পরে ওয়েস্ট ইন্ডিজে যে বিশ্বকাপ বসতে যাচ্ছিলো সেখানে বাংলাদেশ দলে সুযোগ পায়নি রানা। তবে বন্ধু মাশরাফির আশ্বাসে একদিন না একদিন বিশ্বকাপ খেলার সে স্বপ্ন মুছে ফেলেননি রানা। কিন্তু সে স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত হতে দিল না এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা।

সেতু ও রানা আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ১১ বছর হয়ে গেল। সন্তান হারানোর কষ্টে সেতুর মা এখনো ডুকরে কাঁদেন। সেতুর মৃত্যুর দুই বছর পর নিজের স্বামীকেও হারান সেতুর মা। এতে অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল হয়ে পড়ে সেতুর পরিবার। বড় ছেলে মাসুদুল হাসান মিতু জীবিকা নির্বাহের জন্য থাকেন ইতালিতে।

সেতুর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী আরেকটি বিয়ে করলে সংসারে এক হয়ে যান সেতুর মা। এই দশটি বছর ছোট ছেলের স্মৃতিগুলোকে অবলম্বন করে লড়াই করে যাচ্ছে তিনি। এ লড়াইয়ে সঙ্গী হিসেবে পাননি কাউকে। সেতুর মৃত্যুর পর যে বিভিন্ন অনুদান আসছিলো সেগুলো পেয়েছিল সেতুর স্ত্রী।

বিভিন্ন সময় টিভিতে সেতুর মাকে আক্ষেপ করতে দেখা গেছে। কারণ তাঁর খোজ খবর নিতে যে কেউই আসেনা। জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার আতাহার আলি খান ও হাবিবুল বাশার একসময় সেতুর বাসায় আসতেন, খোজ খবর নিতেন। কিন্তু সেটাও এখন আর হয়ে উঠে না। বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন সাজ্জাদুল হাসান সেতুর মা।

এর আগে ইতালিতে বড় ছেলের কাছে গিয়ে হার্টে অস্ত্রোপচারও করিয়েছেন তিনি।  সেখানে মাকে নিজের কাছে রেখে দিতে চাইলেও থাকেননি সেতুর মা। সেতুর ছবি, পোশাক, ক্রিকেটের ইকুইপমেন্ট সব যে খুলনার বাসায় পড়ে রয়েছে! সেতুর স্মৃতিগুলোকে অবলম্বন করে আজও একাই লড়ে যাচ্ছেন এই নারী। এই স্মৃতিগুলো নিয়েই এখন বাঁচতে চান তিনি, কাটিয়ে দিতে চান বাকি জীবনটা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।