খালি বকা আর গালির ওপর রাখবেন, তালি আমি ঠিক থাকব!

সাকিব-তামিমকে ছাড়া বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হারিয়ে দেবে তাদেরই মাঠে, কজন ভাবতে পেরেছিলেন?

এই চোট জর্জর, কঠিন কন্ডিশনে হাঁসফাঁস করতে থাকা দলটি কিভাবে সম্ভব করেছে, তার গল্প বলি। সাকিব যে খেলতে পারছেন না, অধিনায়ক-টিম ম্যানেজমেন্ট জানতে পারে সোমবারই। জানার পর অধিনায়কের মাথায় প্রথম যেটা এসেছে তা হলো, দলকে জানতে দেওয়া যাবে না। জানলেই এটা নিয়ে কথা হবে, চর্চা হবে।

ক্রিকেটাররা নিজেরা ভাববে অনেক, বাইরের কথা তাদের ভাবনায় প্রভাব ফেলবে। সব মিলিয়ে দল ভড়কে যাবে, প্যানিকড হবে। দলের কাছে তাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গোপন রাখা হলো। যারা বেশী কৌতুহলী ছিলেন, তাদেরকে জানানো হলো খেলতে পারে, নাও পারে। দুই সিনিয়র মুশি ও রিয়াদকে অবশ্য মোটামুটি জানিয়ে রাখা হয়েছিল।

ম্যাচের দিন সকালে দলকে জানানো হলো আচমকা। তখন আর বেশি ভাবার সময়ও নেই। তার পরও যেন কারও মাথায় ‘সাকিব নেই’ আতঙ্ক ঢুকতে না পারে, সেটির জন্য অধিনায়ক ঢুকিয়ে দিলেন অন্য ভাবনা। মিটিংয়ে এমন কিছু কথা বললেন যে, রক্তে নাচন লাগল সবার। পারলে তখনই মাঠে নেমে পড়েন!

কি কথা বলেছিলেন অধিনায়ক? ম্যাচ শেষে মুশফিকুর রহিম বলছিলেন সারমর্ম, ‘মাশরাফি ভাই একটি কথাই বলেছিলেন যে, ‘যুদ্ধে নামলে পেছনে তাকিয়ে থাকার সুযোগ নেই। যুদ্ধের ময়দানে গা বাঁচিয়ে চললে চলবে না। কে আছে, কে নাই, ভাবার সময় নাই। হয় মারবো, নয় মরবো।’

হয় মারবো, নয় মরবো – কোনো লড়াইয়ে এর চেয়ে উজ্জীবনী মন্ত্র আর কী আছে? সেনাপতি যখন এই কথা বলেন, ইচ্ছে তো করার কথা তখনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে। সবচেয়ে বড় কথা, পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচের আগে এর চেয়ে আদর্শ মন্ত্র আর কী হতে পারে!

অবশ্যই কালকেও আমাদের সেরা খেলাটা খেলতে পারিনি। তবে এখনও পর্যন্ত দলীয় প্রচেষ্টার সেরা ম্যাচ ছিল। টুকটাক কিছু ভুল বা ব্যতিক্রম বাদে সবাইকে মনে হয়েছে নিজেদের উজার করে দিচ্ছে। মনে হয়েছে টিম স্পিরিটে টইটম্বুর একটি দল। দরকার ছিল সেটিই, একটি বার্তা দেওয়া। সেরা দুইজন ক্রিকেটার না থাকাও আমাদের মনোবল ভাঙে না, বরং প্রতিকূলতা দলকে আরও এককাট্টা করেছে, বলীয়ান করেছে।

মুশি ও রিয়াদের ওপর একটু বাড়তি দায়িত্ব দেওয়া ছিল। তারা সেই ভার সানন্দে তুলে নিয়েছেন। মুশি, আহারে বেচারা! চোটে দল এমন জেরবার, নিজের চোটের কথা বলতেই পারছেন না সেভাবে। পাঁজরে ব্যথা নিয়ে প্রথম ম্যাচে ১৪৪ করেছেন। সেই ব্যথা এখনও সঙ্গী। খেলছেন টেপ পেঁচিয়ে। একটু বেশি এফোর্টে শট খেললেও ব্যথায় মুখ বিকৃত করে ফেলেন। তবু খেলছেন।

শুধু খেলছেন না, জীবনের অন্যতম সেরা ব্যাটিং করছেন। বিপর্যয় থেকে উদ্ধার কিংবা খেলার মোড় বদলে দেওয়া, এসব তো বরাবরই করে আসছেন। ব্যাটসম্যানশিপে এবার নিজের ব্যাটিংকে নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন ও নিচ্ছেন।

ম্যাচের আগের দিন বিকেলের দিকে আড্ডা হচ্ছিল অধিনায়কের সঙ্গে। টিম হোটেল থেকে বেরিয়ে পাশেই একটা মলের ফুড কোর্টের দিকে হাঁটছিলাম। অধিনায়ক হাঁটছিলেন একটু খুড়িয়ে। ঘটনা কি? ‘ও আল্লাহ, জানেন না? পায়ের তলা থে নিয়ে মাথা পর্যন্ত সারা শরীরে ব্যথা।’

অথচ এই লোকটিই পরদিন অবিশ্বাস্য ক্ষীপ্রতায় বাতাসে ভেসে অতিমানবীয় ক্যাচ নেন! ক্যাচটা নেওয়ার সময় বল লেগে ডান হাতের কনিষ্ঠার হাড় নড়ে (ডিসলোকেটেড) গিয়েছিল, এক টানে আবার সোজা করে দেন। কেটে রক্ত পড়ছে, বাইরে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে একটু পরই ফেরেন। সেই আঙুল নিয়েই আবার দিগ্বিদিক ঝাঁপান।

আঙুলে ব্যান্ডেজ এখনও আছে। ব্যথা আছে। ফিজিওর ধারণা, হালকা ফ্র্যাকচারও থাকতে পারে। তবে আজ ভোর পর্যন্তও যখন কথা হয়েছে, অধিনায়ক আঙুল নিয়ে ভাবছেন না। স্ক্যানই করাতে চান না। কারণ ফ্র্যাকচার ধরা পড়লেই, ‘অযথা টেনশন।’ ফ্র্যাকচার থাকলেও খেলবেন। বললাম, ফ্র্যাকচার থাকলে সেটা নিয়ে খেলা ঠিক হবে? সে স্রেফ উড়িয়ে দিল, ‘আরে ভাই, সাকিব ভাঙা আঙুল নিয়া এতগুলা ম্যাচ খেলে গেল, আমি একটা পারুম না!’

বুঝতে পারছেন তো, এই দলটার শক্তি কোথায়? ক্রিকেট স্কিলে যতটা, তার চেয়ে বেশি হয়ত কলিজায়।

ম্যাচের আগের দিন আড্ডায় রিয়াদ বলছিলেন গরমের কথা। মাঠে কিছুক্ষণ কাটানোর পর নাকি নরকযন্ত্রণা শুরু হয় গরমে। লিটার লিটার ঘাম বেরিয়ে যায়। গ্যালন গ্যালন পানি পান করেও নাকি একটু পরই শূন্য লাগে। পানিই বা কত পান করা যায়! আফগানিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটার কথা বলছিলেন রিয়াদ, ৩০-৩৫ রান পর থেকেই তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল গরমে।

তবু দাঁতে দাঁত চেপে দলকে শ্বাস নেওয়ার মতো জায়গায় নিয়ে গিয়েছিলেন। ক্র্যাস্প তো আছেই। গোটা দলই কাহিল। অধিনায়ক ও রিয়াদ, দুজনই একমত হলেন যে ফিজিক্যালি এত কঠিন টেস্টে আগে কখনোই বাংলাদেশকে পড়তে হয়নি। জীবনীশক্তি শেষ প্রায়। অথচ সেই দলই পরদিন মাঠে প্রাণশক্তিতে ভরপুর!

মুস্তাকে এদিন নতুন বলে এনেছিলেন অধিনায়ক। বলটা দিয়ে বলেছিলেন, ‘যা ইচ্ছা কর, কিন্তু আমার উইকেট লাগবে শুরুতে, লাগবেই।’ মুস্তার বোলিং দেখেছেন? অভিষেকের পর ওর সেরা সময়টার মূল বিশেষত্ব ছিল গতি। সেই গতিটা থাকলে কাটার ও স্লোয়ারও বেশি কার্যকর হয়। কালকে গতি যেন সেই সেরা সময়কে ছুঁতে চাইছিল। মুস্তা প্রথম স্পেলে আগুণ না ঝরালে আমরা জিততাম না।

মিরাজ, গত কয়েক মাসে রঙিন পোশাকে আমাদের সবচেয়ে উন্নতি করা ক্রিকেটার। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে থেকে ওয়ানডেতে যে বোলিংটা করছে, এক কথায় অবিশ্বাস্য। শুধু কি বোলিং, মাঠে কী দারুণ প্রাণবন্ত উপস্থিতি! সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেন। অধিনায়ক, সাকিবদের গিয়ে বলেন, ‘আমাকে খালি বলবেন কি করতে হবে। খালি বকা আর গালির ওপর রাখবেন, তালি আমি ঠিক থাকব!’

কাল অধিনায়ক যখন আঙুলের চোটে বাইরে গেলেন, রুবেলের ওভারের ৫ বল মাঠে ছিলেন না ৫ সিনিয়রের কেউ। ওভার শেষে রিয়াদ মাঠে ঢুকে দায়িত্ব নেন। ৫ বল এমন কিছু নয়, বোলার-ফিল্ড সব সেট করা ছিল বলে কাউকে দায়িত্ব নিতে হয়নি। কিন্ত কেন জানি ভাবতে ইচ্ছে করে, ওই ৫ বলে ৫ বছর পরের ছবিটা আঁকা শুরু করেছেন মিরাজ। শিখতে থাকুক, অধিনায়ককে কিভাবে নেতা ও অভিভাবক হতে হয়।

দু’টি ম্যাচ হারার পর নিউজ ফিডে নিজেদের দলকে নিয়ে তাচ্ছিল্য কম দেখিনি। পারিপার্শ্বিকতা, বাস্তবতা কেউ মনে রাখেনি। দল ভাঙাচোরা। কন্ডিশন অনেক কঠিন। আফগানদের এটা হোম ছিল, এখানেই বরাবর ট্রেনিং করেছে। পাকিদের তো হোমই। এই কন্ডিশন, এই গরম বাতাসে ওরা অভ্যস্ত। কারও ডিহাইড্রেশন হয় না।

আমাদের কারও হওয়ার বাদ নেই। ভারতকে ট্রাভেল করতে হয়নি। আমাদের দল দুবাই থেকে আবু ধাবি, দেড় ও দেড়, ৩ ঘণ্টা আসা যাওয়া করে খেলেছে। সেই বাসের সিটগুলো আবার সুবিধার না। মুস্তার পিঠে ব্যথা, মাশরাফির কোমরে। সিটের সাইজ এমন যে বসলে আরও বেকায়দায়, ব্যথা বাড়ে। তারা তাই বাধ্য হয়ে বাসের মাঝে যে হাঁটার জায়গা, সেখানে শুয়ে আবু ধাবি যাওয়া-আসা করেছে। এখনকার গরম বিকট হলেও রাস্তা দারুণ। বাসের ফ্লোরে শুয়ে গেলেও ঝাঁকি লাগে না!

যাই হোক, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, দল কিন্তু কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ নিতে পিছপা হয়নি। একটু সময় লেগেছে, কিন্তু হাল ছাড়েনি। কিন্তু এই দলের ভক্ত-সমর্থক বলে দাবি করা অনেকে হাল ছেড়ে ঝাল মিটিয়েছিল আগেই। এখন জয়ের স্বাদ তাদের কাছেও মধূর লাগছে। সমস্যা নেই তাতে। দলটা তাদের স্বাদ পরিবর্তনের এই কাজ তো বরাবরই করে আসছে।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে কার্ডিফে রান তাড়ায় যখন ৪ উইকেট পড়ে গিয়েছিল, বিসিবির উঁচুতলার কর্মকর্তারা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন দল হারছেই ধরে নিয়ে। পরে যখন স্মরণীয় জয়ের পথে দল, তাদের হাহুতাশ ভারী করেছে কার্ডিফের বাতাস। দলের কিছু হয়নি। তারা তাদের কাজ করেছে। করেই যাবে। সাফল্য আসবে, ব্যর্থতাও। দু’টির সুযোগ যারা নিতে চায় নেবেই। ফাইনালে ভারতের কাছে হারলে আবার সূচবিদ্ধ করলেই হবে। সমস্যা নেই। ক্রিকেট বুঝতে হবে, এই দাবি তো দল করেই না, কখনও বাস্তবতা বোঝার দরকার নেই। দল সব কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

এশিয়া কাপের সূচি হওয়ার পর থেকেই একটা ছবি স্পষ্ট ছিল, ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সিরিজ যেহেতু হয় না, এই এশিয়া কাপ আসলে তিন ম্যাচের পাক-ভারত সিরিজের আয়োজন। বাকিরা দুধভাত টাইপ। এখানে আসার পরও একই হাইপ দেখছিলাম। বাংলাদেশ সেই বাড়া ভাতে ছাই দিলো, প্রাপ্তি যথেষ্ট হয়ে গেছে।

আমার প্রাপ্তি অবশ্য অন্য জায়গায়। আবু ধাবি থেকে দুবাইয়ে হোটেলে ফেরার পর রাত তিনটার দিকে ফোনের অপর প্রান্তে একজনের কণ্ঠে শুনলাম, ‘কিরে, দেখলি তো, রিয়াদ আর সৌম্যর বোলিং দিয়াই পাকি খানসেনাদের খতম করে দিলাম!’ মজা করেই বলেছেন, কিন্তু আমার পাওয়া হয়ে গেছে।

আমার চাওয়া ক্ষুদ্র। এইটুকু পেয়েছি, এই টুর্নামেন্ট থেকে আর চাওয়ার কিছু নাই।

– ফেসবুক ওয়াল থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।