নীতু নস্টালজিয়ায় ডুব সাঁতার

তিনি মাদকের চেয়েও বেশি নেশাদায়ী, কোমল পানীয়’র চেয়েও বেশি ঝাঁঝালো, সুর্যোদয়ের আলোর চেয়েও বেশি আলোকিত। ক্লাসরুম থেকে ক্যামেরা – নীতু সিং মানেই আনন্দবহুল, প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এক মুখ। নাটকীয় কোনো নায়িকা নয়, তিনি ছিলেন উদাসীন এক কিশোরীর প্রতিচ্ছবি। বলা ভাল, ব্যক্তিজীবনে তাঁর সারল্যের অতিরিক্ত একটা চিত্রায়ন ঘটতো পর্দায়।

নায়করা তাঁকে পাশে চাইতো, নায়িকারা তাঁকে বন্ধু মানতো। বরাবরই সহজ, সুন্দর, নির্মল একটা অনুভূতি ছড়িয়ে দিতে জানতেন তিনি। ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’-এর আগ পর্যন্ত ‘ক্যাম্পাস ড্রিম’ মানেই ছিল নীতু সিং আর ঋষি কাপুরের জুটি। ঝাঁকুনি দিয়ে নাচ, ফ্যাশনেবল চলন কিংবা কোয়েলের দৃষ্টি – সব কিছুতেই দর্শকরা তালি দিত।

তাঁর প্রজন্মকে তিনি নিয়ে এসেছিলেন ডান্স ফ্লোরে। নীতু সিং ছিলেন পর্দার ‘সিন স্টিলার। ৫০টির মত সিনেমা করেছেন, কোটি কোটি দর্শকের হৃদয় জয় করেছেন। তিনি হলেন গুটি কয়েক শিশু শিল্পীদের একজন যারা পরবর্তীতে প্রমোশন পেয়ে সাফল্য পেয়েছেন যৌবনেও।

তিনি ছিলেন টিন আইকন। ৭০ দশকে সবচেয়ে ভালবাসা পাওয়া নায়িকাদের একজন ছিলেন। আজো যখন বড় পর্দায় অল্প কিছু সময়ের জন্য তাঁকে দেখা যায়, তখন প্রতিটা দর্শক নস্টালজিয়ায় ডুব দেন, ক্ষণস্থায়ী কিন্তু প্রবল এক অনুভূতিতে হৃদয় ভরে ওঠে।

  • সুপারস্টার শিশুশিল্পী

খুব কম মানুষই জানেন যে নীতু সিংয়ের আসল নাম হল হারনিত কউর। দিল্লীর এক জ্যাট শিখ পরিবারে ১৯৫৮ সালের আট জুলাই জন্ম এই সুনয়নার। তিনি ছিরেন রাজি কউর ও দর্শন সিংয়ের একমাত্র মেয়ে। পরিবার বদলী হয়ে চলে আসে মুম্বাইয়ের পেদ্দার রোডে। নীতু ভর্তি হন হিল গ্রেঞ্জ হাই স্কুলে। অল্প বয়সে বাবাকে হারান।

এরপরই শিশু শিল্পী হিসেবে বলিউডে অভিষেক। বেবি সোনিয়া নামে তিনি টি প্রকাশ রাওয়ের রোম্যান্টিক সিনেমা ‘সুরাজ’ (১৯৬৬) এ অভিনয় করেন রাজেন্দ্র কুমার বিজয়ন্তিমালার সাথে। নাদুস নুদুস ‘বেবি সোনিয়া’- নাচের স্কুলে এক নজর দেখেই মনে ধরে যায় বিজয়ন্তির। তিনিই পরিচালকের কাছে নাম সুপারিশ করেন।

দো কালিয়া সিনেমায়

বেবি সোনিয়া এরপর দেবেন্দ্র গোয়েলের ‘দাস লাখ’ (১৯৬৬) সিনেমায় ‘রুপা’ নামের চরিত্র করেন। এরপর ১৯৬৮ সালে মালা সিনহা-বিশ্বজিতের ‘দো কালিয়া’ সিনেমা করে খ্যাতি পান। এখানে তিনি জমজ ভূমিকায় অভিনয় করেন। আর কৃষণান ও এস পাঞ্জুর পরিচালনায় নির্মিত সিনেমাটি ছিল ১৯৬১ সালের তামিল সিনেমা ‘দ্য প্যারেন্ট ট্র্যাপ’-এর রিমেক। সঙ্গীত পরিচালক রবি ও সাহির লুধিয়ানভি’র করা ‘বাচ্চে মান কে সাচ্চে’ গানটা আজো শিশুতোষ অনুষ্ঠানগুলোতে বাজানো হয়।

মজার ব্যাপার হল, কিশোর চিন্টু কাপুর, বড় হয়ে যিনি ঋষি কাপুর রূপে পর্দায় আসেন, স্কুল পালিয়ে ‘দো কালিয়া’ সিনেমাটা দেখেন। শিশু শিল্পী হিসেবে নিতুর অন্যান্য কাজ হল ১৯৬৯ সালের ‘ওয়ারিশ’ ও ১৯৭০ সালের ‘পবিত্র পাপি’।

  • অমায়িক সহ-শিল্পী

কিশোরী ও তরুণী বয়সের মাঝামাঝি সময়ে, নায়িকা চরিত্রে তাঁর অভিষেক হয় ১৯৭৩ সালে রিকশাওয়ালা সিনেমায়। ১৫ বছর বয়সে তাঁর বিপরীতে ছিলেন ঋষি কাপুরের বড় ভাই রণধীর কাপুর। কে শঙ্করের এই সিনেমা ফ্লপ হলেও নাসির হোসেনের একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘ইয়দো কি বারাত’ সিনেমায় ছোট একটা চরিত্র দিয়ে নজর কাড়েন নীতু। আর ডি বর্মনের ডান্স নাম্বার ‘লেকার হাম দিওয়ানা দিল’ গানে তারিক হুসাইনের সাথে তার পারফরম্যান্স আবেদনময়ী হিসেবে তাঁকে বলিউডে ঠাঁই দেয়।

 

এরপর ভাগ্যই যেন তাঁকে ঋষি কাপুরের দিকে ঠেঁলে দেয়। শোনা যায়, প্রথম জীবনে ঋষির প্রেমিকা ছিলেন ডিম্পল কাপাডিয়া। তবে, তিনি বিয়ে করে ফেলেন আরেক বলিউড তারকা রাজেশ খান্নাকে। ওই সময় ঋষির ব্যক্তিগত ও পেশাদার জীবনটা ক্লান্তিকর ছিল। ডিম্পল যেসব সিনেমায় ঋষির সাথে চুক্তিবদ্ধ হবেন বলে ভাবা হয়েছিল সেগুলাতে ডাক পান নীতু সিং। বদলী থেকে এই নীতু সিংই স্থায়ী হয়ে যান ঋষির জীবনে।

নির্মাতাদের প্রিয় পাত্র ছিলেন নীতু। প্রতিদ্বন্দ্বী অভিনেত্রীদেরও তিনি বন্ধু বানিয়ে ফেলেছিলেন। ওই সময় নীতুর ‘বাডি’ ছিলেন রেখা। শোনা যায় দু’জন নাকি নিজেদের মধ্যে ‘মেক আপ সিক্রেট’ও শেয়ার করতেন।

৭০-এর দশকে নীতু তাঁর হবু ভাসুর রণধীর কাপুরের বিপরীতে ‘হিরালাল’, ‘পান্নালাল’, ‘ভালা মানুষ’, ‘কাসমে ওয়াদে’ ও ‘ঢঙ্গী’ সিনেমা করেন। এমনকি তিনি হবু চাচা শ্বশুর শশী কাপুরের বিপরীতে ‘দিওয়ার’, ‘শঙ্কর দাদা’, ‘এক ওউর এক গ্যায়ারা’ ও ‘কালা পানি’ সিনেমা করেন। রাজেশ খান্নার বিপরীতে তাঁকে দেখা যায় অ্যাকশন-কমেডি সিনেমা ‘মাহা চোর’, থ্রিলার ‘চক্রযুদ্ধ’, পাঞ্জাবী সিনেমা ‘সোয়া লাখ সে এক লাদো’-তে।

এমনকি ঋষির ঘণিষ্ট বন্ধু জিতেন্দ্রর সাথেও স্বাচ্ছন্দে কাজ করেছেন নীতু। এর প্রমাণ হল ‘ধরম বীর’, ‘প্রিয়াত্মা’, ‘চোরনি’র মত সিনেমাগুলো। বিনোদ খান্নার সাথে তিনি ‘দ্য বার্নিং ট্রেইন’ ও ‘রাজমহল’ সিনেমা করেন।  বিগ বি খ্যাত অমিতাভ বচ্চনের সাথে মিউজিক্যাল ‘ইয়ারানা’, সামাজিক ড্রামা ‘আদালত’, থ্রিলার ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’ করেন। কথিত আছে, একবার অমিতাভ তাঁকে মজা করে বলেছিলেন, ‘পর্দায় তুমি প্রায়ই আমাকে ভালবাসি বলো। বোঝো তো এর অর্থ কি!’

  • এক ম্যায় ওউর এক তু

এই জুটি এক সাথে ১২ টা সিনেমা করেছে। ‘জ্যাহরিলা ইনসান’, ‘খেল খেল মেয়’, ‘রাফু চাকার’, ‘কাভি কাভি’, ‘দুসরা আদমি’, ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘ঝুটা কাহি কা’, ‘ধান দৌলত’ – পর্দার এত সব রসায়নই বাস্তবে তাঁদের কাছে নিয়ে আসে।

১৯৭৪ সালে এই জুটির প্রথম সিনেমা ‘জ্যাহেরিলা ইনসান’। দু’জনের মধ্যে খুনসুটি ছিল, ভাল বন্ধু ছিলেন তখন, এর বেশি কিছু নয়। এরপর ১৯৭৬ সালের সিনেমা প্রমোদ চক্রবর্তীর ‘বারুদ’-এর শুটিংয়ের জন্য প্যারিস চলে যান ঋষি। সেখানে বসে তিনি নীতুর অভাব বোধ করতে থাকেন।

তখন নাকি নীতুকে একটা টেলিগ্রাম পাঠান। তাতে লেখা ছিল – ‘একটা মেয়েকে খুব মিস করছি!’ কথিত আছে, এই বার্তা পেয়ে নীতু এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে কাশ্মীরে ‘কাভি কাভি’র শুটিং চলাকালেই সেটা দেখিয়ে ফেলেন সিনেমাটির নির্মাতা পরিচালক যশ চোপড়া ও তাঁর স্ত্রী পাম্মিকে।

সিনেমাপাড়ায় একটা গল্প প্রচলিত আছে। রাত আটটার পর কোনো শিডিউল রাখতেন না ঋষি। একবার সন্ধ্যার পর ‘কালা পাথর’ (১৯৭৯) সিনেমার ‘ধুম মাচে ধুম’ সিনেমার শুটিং চলছিল। পরিচালক যশ চোপড়া কিংবা অমিতাভ বচ্চন, সবাই খুব তটস্থ ছিলেন যেন কোনো ভাবেই ঋষি-নীতুর ডেট না মিস হয়। প্রেমিককে সামলাতে সেদিন নাকি কস্টিউম না পাল্টেই চলে যান নীতু সিং।

পাঁচ বছর প্রেম করার পার ১৯৭৯ সালে নীতুকে বিয়ের প্রস্তাব দেন ঋষি। অনেক ধুমধামের মধ্য দিয়ে ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন তারা। ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা প্রেম রোগে রাজ কাপুর এই দু’জনের বিয়ের মণ্ডপটাই ব্যবহার করেন।

শৈশব থেকে চুটিয়ে অভিনয় করা নীতু বিয়ের পর থেকে সংসার নিয়েই আছেন। মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি সিনেমার ভূবন থেকে অবসর নেন।

  • বিয়ে এবং অন্যান্য

বিয়ের পর কয়েক বছর রাজ কাপুর ও কৃষ্ণার সাথে চেমবুরে থেকেছেন নীতু-ঋষি। নীতুর মতে সেটা ছিল তাঁর জীবনের সুন্দর সময় গুলোর একটি। শ্বাশুড়ীর সাথে ‍খুব ভাল একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে ঋদ্ধিমা ও রণবীরের জন্ম হয়। এরপর এই দম্পতি বান্দ্রার পালি হিলের একটা বাঙলোতে চলে আসেন।

বাস্তবতা আর প্রেমের মাঝে নাকি বন্ধুত্ব হয় না। তাই, ঋষি-নীতুর সম্পর্কেও টানাপোড়েন এসেছে। নব্বইয়ের দশকে ঋষির অ্যালকোহলে আসক্তি ও উগ্র মেজাজের জন্য ক্ষিপ্ত ছিলেন নীতু। একবার নীতু বলেছিলে, ‘ঋষি একজন দারুণ স্বামী, ভাল একজন বাবাই ছিলেন। কিন্তু, একটা সময় সব হারিয়ে যায়।’

  • দ্বিতীয় ইনিংস

২৬ বছর পর অবশ্য ঋষির বিপরীতেই ‘লাভ আজ কাল’ (২০০৯) সিনেমায় ক্যামিও একটা চরিত্রে হাজির হয়েছেন। এরপর একে একে ‘দো দুনি চার’ (২০১০), ‘জাব তাক হ্যায় জান’ (২০১২) ও ‘বেশরম’ (২০১২) করেছেন। ভক্তদের জন্য এই সিনেমাগুলো ছিল একটু পেছনে ফিরে তাকানোর উপলক্ষ্য, হোক সেটা এই ৬০ ছুঁইছুঁই বয়সেও।

আজো তিনি রোজ ট্রেডমিলে দৌঁড়ান। বয়সটাকে যে ধরে রাখতে হবে। বড় মেয়ে ঋদ্ধিমা কাপুরের বিয়ে হয়েছেন শিল্পপতি ভারত সাহনির সাথে। নাতনি ক্ষুদে সামারাকেও তো সময় দিতে হয়।

ছেলে রণবীর কাপুরের চূড়ান্ত আশ্রয়স্থল তাঁর মা নীতু। আজ যে রণবীরকে কাপুর পরিবারের সর্বকালের সেরা অভিনেতা বলা হয়, তাতে কাপুর পরিবারের যতটা না অবদান তাঁর চেয়ে অবশ্যই অনেক বেশি অবদান নীতু সিংয়ের। এরপর যখনই কোনে পুরস্কার নিতে রণবীর মঞ্চে উঠবেন, সেই পুরস্কারের ভাগিদার একটু হলেও হবেন নীতু সিং। তাই, দর্শক হয়ে যে তালিটা রণবীরের জন্য দেবেন, তাঁর ভাগ পাবেন নীতু সিংও।

– ফিল্মফেয়ার অবলম্বনে

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।