লোল! ক্ষ্যাত বাংলা সিনেমা

১৯৯৬ সাল, কেবল ওয়ান ছেড়ে টু এ উঠেছি। ছোট চাচার বিয়ে হলো। বিয়ের কয়েকদিন পর ট্র্যাডিশন অনুযায়ী বাড়ির সব ছোট-বড়োরা মিলে চাচার সাথে, নাইওর যাওয়া নতুন চাচীকে আনতে গেলাম তাঁর বাপের বাড়ি। চাচীর মামার একটা সিনেমা হল ছিলো। দুপুরে খাবার পর কেউ একজন অফার দিলো, রাতে সেই সিনেমা হলে আমরা সিনেমা দেখতে যাবো সব্বাই মিলে।

সিনেমার নাম ‘তোমাকে চাই’। সালমান শাহ্, শাবনুর। সেকি উত্তেজনা সবার! রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে তৈরি সবাই, রাতের শো দেখতে যাবার জন্য। প্রায় ১৫-২০ জন গেলাম সিনেমা দেখতে। অদ্ভুতভাবে অই সময়ের সব স্মৃতি আমার এখনো স্পষ্ট! মনে আছে, কোণায় বসেছিলাম, চাচীর খালার সাথে। যেই শাবনুর-সালমানের একটু ভাব হয়ে গেলো, ওরা গাইতে শুরু করলো, ‘আমার নাকেরই ফুল বলেরে তুমি যে আমার।’ গোটা হল চিৎকার, পেছনের আর্ট করা ক্যানভাস

তখন, থ্রিডি ইফেক্টকেও হার মানায়। উপর তলা, নিচতলা লোকে টইটুম্বুর! হাউজফুল। আমাদের বাড়ি থেকে মাইলখানেক দূরে, একেবারে মফস্বল শহর; সেখানে একটা সিনেমা হল ছিলো।

বেঞ্চ পাতা নিচ তলায়, উপর তলায় চেয়ার। ফ্যান কম ছিলো, গরমে ঘামতে ঘামতে লোকে সিনেমা দেখতো। ওই হলে বাবা, মা, কাজিনরা মিলে ফার্স্ট দেখেছিলাম, ‘ছুটির ঘন্টা’। লাইনে নাকি কয়েক ঘন্টা দাঁড়িয়ে টিকেট কেটেছিলো, আমাদের এক ভাই। এটা পরে শুনেছিলাম। এর আগে পরে আর কিছু মনে নাই। তবে, ফ্যামিলি আড্ডা বসলে প্রায়ই আহা-উহু করে আমার খালা এক হৃদয়বিদারক গল্প শোনায়, বাচ্চা কেঁদেছিলো বলে, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, পুরোটা না দেখেই তার বের হতে হয়েছিলো হল থেকে। পারলে এখনো সেজন্য গালি খেতে হয় আমার খালাতো ভাইকে। সিনেমা নিয়ে কি এক দূর্দান্ত নস্টালজিয়া!

আমরা অনেকগুলা কাজিন বড়ো হয়েছি একসাথে। কেউ স্কুলে, কেউ হাইস্কুলে, আর কেউ পড়ে কলেজে। আমরা প্রায় প্রতি মাসেই টাকা জমিয়ে সিনেমা দেখতে যেতাম, বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে। স্কুলে যাওয়া আসার পথে, বাসস্ট্যান্ড এর কাছে একটা বিল্ডিং এর উপর বড়ো করে; চলতি আর আগাম সিনেমার পোস্টার লাগানো থাকতো। যে আগে আড়চোখে দেখে নিতো পোস্টারটা, সে এসে বাকি সবাইকে জানাতো, কি সিনেমা চলছে। ২০-৩০ টাকা জমাতে পারলেই হলো, বাদাম খাওয়াসহ সিনেমার টিকেট। আর কয়েকটা মিথ্যা কথা। ব্যাস!

সেইসব দিনে টিকেট পাওয়া দুস্কর ছিলো। কয়দিন আগে টিকেট কেটে রাখতে হতো। আর গাইবান্ধা শহরে ছিলো তিনটা হল। এর মধ্যে একটা আমাদের দূরসম্পর্কের এক খালুর। তাই সেখানে গেলে বাসার সবাই মিলে যেতাম। কেনাকাটা আর সিনেমা দেখা। তিনটা হলে তখন আলাদা আলাদা তিনটা সিনেমা চলতো। হাউজফুল!

এরপর আসলো ‘রাঙ্গা বউ’, ‘মাথা নষ্ট’র যুগ। সে সময় বুঝতে না পেরে পুরনো ঝোঁকে আমরা পাঁচজন কাজিন ঢুকে ছিলাম হলে। সিনেমার নাম সম্ভবত, ‘মগের মুল্লুক’ ছিলো। মৌসুমি পুরনো ক্র‍্যাশ, সেই সুবাদে ডিপজলকে আর চোখে পরেনি আমাদের। সিনেমা শুরুর কিছুক্ষণ পর, পর্দার ভায়োলেন্স এর সাথে মিশে যাচ্ছিলো উপরতলার পুরুষ দর্শকদের কিছু কথার অংশ বিশেষ। সেসব শুনে সিনেমা অর্ধেক হওয়ার আগেই কান গরম করে, আমাদের এক ভাই বললো চল বের হয়ে যাই হল থেকে। আমরা অপরাধীর মতো বের হলাম সিনেমা হল থেকে। তখন সময়ের সাথে পালটে যাচ্ছিলো নস্টালজিয়ার দৃশ্যপট।

এরপর থেকে আমরা পোস্টারের দিকে আড়চোখে তাকাতেও লজ্জা পেতাম। টাকা জমিয়ে কাজিনরা মিলে উৎসবের মতো আর কখনো একসাথে সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি। সিনেমার সাথে মিশতে থাকা আমাদের অদ্ভুত এক কৈশোর হারিয়ে গিয়েছিলো হঠাৎ করেই। তখন সিনেমা হল থেকে কোন মেয়ে বেড় হলে আমাদেরই মনে হতো, ও মাই গড মেয়েটা কি! সিনেমা হলে ঢোকে! তারপরো কলেজ লাইফে দুই একবার পুরনো ফিল পেতে যেতে চেয়েও যাওয়া হয়নি সিনেমা হলে। দূর থেকে দেখতে দেখতেই হলগুলো হাওয়া!

আমাদের মফস্বলের হলটা বন্ধ হয়েছে সেই কবেই। এখন বোধহয় সেটা কারো ধানের আড়ৎ। আর গাইবান্ধায় মরতে মরতে বেঁচে আছে একটা হল। মাঝে ‘মনপুরা’, ‘থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘আয়নাবাজি’ দেখতে যাবার পর, বাসায় যতোবার বলেছি সিনেমা হলে গিয়েছিলাম, বাসার লোক আঁতকে উঠেছে! হোয়াট! যতোই বুঝাই এই সিনেমাগুলো ভালো, ঢাকার অনেক সিনেমা হল আছে পরিবেশ ভালো, কিন্তু বাসার লোক, সিনেমা হলে মেয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা মানতে খুব নারাজ। সিনেপ্লেক্স হলে তাও চুপ থাকে, বাট অন্যকোন হল শুনলেই হুশশসসস।

এই যে সিনেমাহল থেকে মুখ ফেরানো দর্শক, আর মরা সিনেমাহলের মধ্যকার মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং, এর দায় একা বহন করে ফাঁকা সিটেরা আর তাদের আর্তনাদ। আমাদের বিনোদনের অবকাশ কমতে কমতে গিয়ে পৌঁছেছে দাদাদের সোপ অপেরার ভাড়ারে। যেখানে ভাঁড়ামি ছাড়া আর কিছু মেলে না। আর বাংলা সিনেমা সেই যে হাটু ভাঙ্গা ‘দ’ হয়ে গেলো, সেখান থেকে আর কেউই টেনে তুলতে পারলো না সেটাকে। কেউ অবশ্য চাইলোও না বোধহয়। যে যার মতো করে ‘আপন প্রাণ বাঁচা’ স্ট্রাটেজিতে ঢুকে, নিজের বিজনেসটুকু নিয়ে থলের বিড়াল হয়ে ঘোরে। তারপর যে যাই বলুক ভাঙ্গা ঢোলের আওয়াজ, দর্শকের কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি, পৌঁছালেও বিরক্তিকর লেগেছে।

এই যে সিনেমা হলে যাওয়া দর্শকের সিনেমা হলের রাস্তাকে, হোল ভেবে দূরে সরে যাওয়া; এটা একদিনে, একটা সিনেমায় হয় নাই। যৌথ প্রযোজনায়, দর্শক হটাও প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তাই সেই বিপুল দর্শককে হলে ফেরাতে এখন বিশাল এক মুভমেন্ট তৈরি করা দরকার। দরকার ‘নিউ ওয়েভ’। কিন্তু কে করবে সেটা! যে যে, যার যার মতো পথ গুছায়। আর নাকউঁচু উচ্চমার্গীয় ইংরেজিপ্রেমি, আমার না, বাংলাটা ঠিক আসেনা, লোল বাংলা সিনেমা বলা দর্শকের কাছে আটকে যায় ছোট ছোট মুভমেন্টগুলো, ওয়েভগুলো।

পেছনে তলিয়ে যায় ভিসিআর-ভিসিপির গুনগুন রাতগুলো, দমবন্ধ সেইসব সিনেমাহলগুলো, সালমান শাহ, স্বপ্নের পৃথিবী, দেনমোহর ব্লা ব্লা। তারপর তালা ঝুলিয়ে সিনেমা হল মালিকেরা কেউ হয় দেউলিয়া, কেউ মুদি দোকানি, কেউ দেশছাড়া। হারিয়ে যায় সিনেমা হলের মিষ্টি মিষ্টি নামগুলো। শুধু আমার মতো মধ্যবিত্ত দর্শক অতীত ঘেটে, ভালো একটা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে করতে রাত জেগে অনলাইনে মুভি দেখে। ভাবে সবাই পারলে, আমরা পারি না কেনো! একদিন নিশ্চই পারবে কেউ না কেউ!

হয়তো পারবে, হয়তো পারবে না। তবু জয়তু বাংলা সিনেমা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।