চুরি হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের চিত্রনাট্য!

সত্যজিৎ রায়ের ‘দ্য এলিয়েন’ এর এই ব্যর্থতা বাংলা সিনেমার জগতে একটা কালো দাগ হয়ে থাকবে। আপনারা অনেকেই ১৯৮২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ই.টি. দ্য এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল’ সিনেমার কথা জানেন। স্টিভেন স্পিলবার্গের এই সিনেমাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট অফ আ কাইন্ড’।

কারণ, এর আগের সব এলিয়েন ছবিতে এলিয়েনদেরকে শত্রু হিসেবে দেখানো হতো। কিন্তু ইটি’র মাধ্যমে স্পিলবার্গ নতুন যুগের সূচনা ঘটান। এজন্যই, আমেরিকায় সবচেয়ে জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন মুভি হিসেবে ইটি স্বীকৃতি পায়। এবার ভেবে দেখুন ১৯৬০-এর দশকে সত্যজিৎ এর এলিয়েন মুক্তি পেলে কি হতো।

প্রথম পর্ব

দ্বিতীয় পর্ব

হুম, সত্যজিৎ সিনেমাটা করতে পারলে পরিস্থিতি অন্য রকম হতে পারত। সবাই আধুনিক ইটি-র জন্মদাতা হিসেবে সত্যজিৎকেই জানতো।

স্টিভেন স্পিলবার্গের ইটি বের হওয়ার পর সত্যজিৎ রায় তা দেখে বিস্মিত হয়ে নকলের অভিযোগ আনেন। অভিমানের সুরে বলেছিলেন, ‘স্পিলবার্গের পক্ষে ইটি করা সম্ভব হত না যদি না আমার তৈরি করা দ্য এলিয়েনের স্ক্রিপ্ট এর মাইমোগ্রাফের অনেক গুলো কপি হলিউডে ছড়িয়ে না পরতো। কারণ সত্যজিতের এলিয়েনের ব্যহিক কাঠামো এবং এর ক্ষমতা ইটি’র এলিয়েন কাঠামো এবং ক্ষমতা প্রায় হুবুহু একই রকম।’

সত্যজিতের এলিয়েন ধীর গতিতে তাঁর হাত নাড়াচাড়া করে, ইটি’র এলিয়েনও ধীর গতিতে তার হাত মুভ করে। সত্যজিতের এলিয়েনের হিলিং পাওয়ার আছে, ইটি এর এলিয়েনেরও হিলিং পাওয়ার আছে, সত্যজিৎ এর এলিয়েনের ফুল ফোটানোর ক্ষমতা আছে তেমনি ইটি’র এলিয়েনেরও ফুল ফোটানোর ক্ষমতা আছে। শুধু পার্থক্য হল সত্যজিতের এলিয়েনের হাতের আঙ্গুল তিনটি আর ইটি’র এলিয়েনের আঙুল চারটি।

স্পিলবার্গ অবশ্য বলেছেন, ‘সে সময় আমি ছিলাম বালক। আমার বয়স ছিল ১০-১৫। দি এলিয়েনের কথা আমি জানতাম না। আসলে আমার বাবা মা এর বিচ্ছেদ আমাকে খুব হতাশ করেছিল সেটার উপর কেন্দ্র করে আমি কাল্পনিক ফিল্ম ইটি বানিয়েছিলাম।’

বঙ্কুবাবুর বন্ধু’র ইলাস্ট্রেশন

মানুষের জীবনে স্পর্শকাতর বিষয় থাকতেই পারে সেটা আলাদা বিষয় তবে স্টার উইকেন্ড ম্যাগাজিন স্পিলবার্গের প্রথম মন্তব্যে বিপক্ষে সময় এবং রেকর্ড উল্লেখ করে বলেছিল – ১৯৬৫ সালে স্পিলবার্গ গ্র্যাজুয়েট পাস করে। ১৯৬৮ সালে সত্যজিতের এলিয়েনের সেই সমসাময়িক সময়ে তিনি ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে আন পেইড ইন্টার্ন হিসেবে কাজ শুরু করেন। ওই বছরে তিনি ‘অ্যামব্লিন’ নামে একটি শর্ট ফিল্ম তৈরি করেন যা তার জীবনের প্রথম কাজ। সেই সময়ে তার বয়স প্রায় ২৩। তাহলে সে কিভাবে নিজেকে একজন বালক দাবি করেন?

যাই হোক স্পিলবার্গের বন্ধু মানুষ আরেক বিখ্যাত পরিচালক মার্টিন স্করসেস এবং স্পিলবার্গের আরেক কাছের মানুষ অস্কার বিজেতা পরিচালক এবং অভিনেতা স্যার রিচার্ড অ্যাটেনবরো প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘স্পিলবার্গ যা করেছে এটা স্রেফ প্ল্যাগারিজম। এটা ঠিক না।’

ইটি

১৯৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে আর্থার সি. ক্লার্ক সত্যজিৎ রায়কে উপদেশ দিয়েছিলেন স্পিলবার্গকে একটা পোলাইটলি একটা চিঠি লিখে সত্যজিতের অবদান যেন সে স্বীকার করে নেয়। সেই সাথে এও উপদেশ দেন তা না করলে তার বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেয়া হবে। কিন্তু সত্যজিৎ নিপাট ভদ্র লোক একজন মানুষ।

শুরুতে তার রাগ থাকলেও পরে আর এই বিষয়টা টানতে চাননি। কেননা গুণী মানুষ গুণী মানুসের কদর বুঝেন। ততদিনে স্পিলবার্গ এর আরও অনেক ছবি সেসময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে – জওস, ইন্ডিয়ানা জোন্স। সত্যজিৎ এও বলেছেন, ‘প্রত্যেক আর্টিস্টদের নিজেদের একটা টাইম আছে, এখন স্পিলবার্গ এর সময়। সে ভাল পরিচালক, সে ভাল কাজ করছে।’

তাছাড়া বয়েল নামক এক পশ্চিমা লেখক ‘দ্য রেকলিং: দ্য স্টোরি অব সত্যজিৎ রায়’স ইল ফেটেড সাইন্স ফিকশন ফিল্ম প্রোজেক্ট, দ্য এলিয়েন – নামক একটা বই লিখছিলেন যেখানে তিনি স্পিলবার্গকে উদ্দেশে কিছু আক্রমণাত্মক কথা লিকে দেন। পরে অনেকের অনুরোধে তিনি বইটা আর শেষ করেন নি। কারণ, স্পিলবার্গ ততদিনে হলিউডের একজন ধনী এবং ক্ষমতাধর পরিচালক হয়ে উঠেছেন। তার নিজের কিছু হিংস্র ল’ ইয়ার ছিল যারা একটা কেলেঙ্কারি বাধিয়ে দিতে পারতো ওই লেখক এবং সত্যজিৎ রায়ের জীবনের এর উপর। সেটা হলে সিনেমার ইতিহাসে সেটা মোটেই ভাল কিছু বলে বিবেচিত হত না!

পশ্চিমা বিশ্বে স্পিলবার্গ এখন শীর্ষ আয় করা পরিচালক এবং তার প্রভাব অনেক। তার অনেক কাছের মানুষ মনে করেন স্পিলবার্গ এই ব্যাপারটা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও তিনি ভেতরে ভেতরে সত্যজিৎ রায়ের জন্য অনুতপ্ত ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘অ্যাকাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড’ পাওয়ার পেছনে স্পিলবার্গের পরোক্ষ একটা ভুমিকা বা সুপারিশ বা পরামর্শ থাকলেও থাকতে পারে। তিনি অন্যভাবে সত্যজিৎকে পুষিয়ে দিয়েছেন।

স্টিভেন স্পিলবার্গ

স্পিলবার্গ ভুমিকা রাখুক কি রাখুক না বিশ্ব সিনেমার জন্য সত্যজিৎ রায় যে ভুমিকা রেখে গেছেন তার জন্য তিনি অবশ্যই অ্যাকাডেমি অনারারি অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য তা সারা বিশ্ব স্বীকার করে নেবে। তবে, সত্যজিৎ রায় হয়ত এত প্রাপ্তির ভেতরেও মনে মনে তো একটা আক্ষেপ, কিছুটা কষ্ট নিয়ে মারা গেছেন।

উল্লেখ্য, সত্যজিতের দি এলিয়েন মুক্তি পেলে এবং সেই নামের কপিরাইট হলে ১৯৭৯ সালে রিডলি স্কটও তার সিনেমার নাম ‘এলিয়েন’ রাখতে পারতেন না। যদিও সেই এলিয়েনের কাহিনি ভিন্ন। তারপরও নামের একটা ব্যাপার আছে। এই নামে রিডলি স্কট এতদিনে অনেক গুলা সিরিজ করে ফেলেছেন। যার একটা পরিচালনা করেছেন জেমস ক্যামেরন আরেকটা ডেভিড ফিঞ্চার বাকি গুলো রিডলি স্কট। তেমনি দ্য এলিয়েনের নাম অবতার নামেও যদিও সত্যজিৎ রাখতেন তাহলে জেমস ক্যামেরন তাঁর বক্স অফিস রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়া মুভি ‘অ্যাভাটার’ নামে রাখতে পারতেন না।

দ্য এলিয়েনের জন্য করা ইলাস্ট্রেশন

২০০৩ সালে বলিউডের রাকেশ রোশন ‘কোয়ি মিল গায়া’ ছবি মুক্তি দেন। যেটা সবাই ইটি’র অনুরুপ মনে করলেও তিনি তার মুভিকে তার নিজ দেশের নির্মাতা সত্যজিতের দি এলিয়েন এর উপর বেস করে তৈরি করেছেন বলে দাবি করেন। কারণ, সত্যজিতের এলিয়েন এর হিলিং পাওয়ার, নির্জীব কোষ পুনর্জীবিত করে ফুল ফোটানো থিমটা কাজে লাগিয়ে তিনি শারীরিক ভাবে অক্ষম দুর্বল, প্রতিবন্ধি কৃষ্ণা বা কৃষকে সুপারহিরোতে পরিণত করেন। যদিও তার কৃষ্ণা যে জগা খিচুরি এক সুপার হিরো যা সচেতন দর্শকের নিকট বিরক্তিকর, হাসির পাত্রে পরিনত করেছে। কম বাজেটের দুর্বল ভিজুয়াল গ্রাফিক্স এবং এফেক্ট দিয়ে বানালে যা হয় আর কি!

আর, সত্যজিৎ অবশ্যই রাকেশ রোশান না। তিনি অবশ্যই বিগ বাজেটে ভাল টিম দিয়ে ছবি বানাতে চেয়েছিলেন। সব রেডিই ছিল। কতিপয় প্রতারকদের জন্য পারলেন না। নাহলে অন্য রকম কিছু হতে পারত। একটা বিষয় ভেবে বিস্মিত হই, হলিউডে যে ধারা এসেছে ৮০’র দশকে, সত্যজিৎ ষাটের দশকেই তার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সাধে কি আর তাকে গুরু মানতে হয়?

সেই নব্বই দশকের শুরুতে ভিডিও ক্যাসেটে যেমন সত্যজিৎ রায়ের গুপি গায়েন বাঘা বায়েন, হীরক রাজার দেশে, সোনার কেল্লা দেখে আমার সিনেমা জগতে প্রবেশ শুরু হয়েছিল, তেমনি স্পিলবার্গ এর ইটি, জওস, ইন্ডিয়ানা জোন্স, জুরাসিক পার্ক দেখে তার ফ্যান হয়েও গিয়েছিলাম সেই একই সময়। দু’জনই আমাদের প্রিয়। তবে যা বিতর্কিত বিতর্কিতই তা স্বীকার করতেই হবে।

রাকেশ রোশানের ‘কোয়ি মিল গ্যায়া’

আরও কত কিছু হতে পারতো। সত্যজিৎ এমনিতেই সর্বকালের সেরা ১০০ চলচ্চিত্র পরিচালকের তালিকায় আছেন। দ্য এলিয়েন করতে পারলে হয়তো পরিচিতি আরও বাড়তো। শুধু সত্যজিতের না, এর সাথে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রসারও বাড়তো। হিন্দি ছবির সাথে পাল্লা দিয়ে বাংলা ছবিকেও ব্যবসায়িক সাফল্যের পথে নিয়ে যাওয়া যেতো।

সত্যজিৎ সারা জীবন আক্ষেপ করেছেন, ‘হিন্দি সিনেমা দর্শকদের রুচি নষ্ট করে দেয়। এজন্যই এদেশে ভালো সিনেমা অতো বাজার পায় না।’ সেই পাল্লা দেওয়া আর হলো না। কি আর করার। তবে আমাদের চিন্তা নেই। সত্যজিৎ যা করেছেন তাতেই বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার নাম টিকে থাকবে। ভারতবর্ষে তার সমমানের কোন পরিচালক অতীতে ছিল না, বর্তমানেও নেই। ভবিষ্যতে আসবে কি-না তা সময় বলে দিবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।