সত্তায় যার সিনেমা

ক’দিন আগেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার’। আমাদের দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এবং আলোচিত এই পুরস্কার শিল্পী এবং কলাকুশলীদের কাছে বেশ আকাংখিত। এখানে ২০১৭ সালের সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকের পুরস্কার পেলেন হাসিবুর রেজা কল্লোল।

কাজের স্বীকৃতি পেতে সবারই ভালো লাগে, নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা এবং কাজের প্রতি ভালোবাসাই একজন মানুষকে তার স্বপ্নের কাছে পৌছে দেয়। তাই নিজের পরিচালিত দ্বিতীয় সিনেমার জন্য এই প্রাপ্তিতে স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত এবং উচ্ছ্বসিত আমাদের দেশের এই গুনী পরিচালক। উল্লেখ্য সোহানি হোসেনের ‘মা’ গল্প অবলম্বনে ‘সত্তা’ সিনেমাটি নির্মাণ করেছেন হাসিবুর রেজা কল্লোল। এই সিনেমাটিই তাঁকে এনে দিয়েছে অভাবনীয় পুরস্কার।

হাসিবুর রেজা কল্লোলের শুরুটা ছবি আঁকা এবং ছবি তোলা থেকে। ছোটবেলা কেটেছে যশোরে। সেখানেই তির্যক যশোর নামের একটি নাটকের দলের সাথে যুক্ত হওয়ার পর কৈশোরেই সিনেমা দেখা এবং পরবর্তীতে সিনেমা নির্মানে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। সেই কৈশোরকালে দেখা স্বপ্ন আস্তে আস্তে একদিন সত্যি করে দেখিয়েছেন তিনি। তবে তার জন্য পাড়ি দিতে হয়েছে লম্বা অনেকটা পথ। ফটোগ্রাফি করার সময় থেকেই ক্যামেরা এবং সাবজেক্টের মধ্যকার নানা বিষয় নিয়ে কাজ করতে করতেই সিনেমা বানানোর ইচ্ছাটা আরো প্রবল হয়েছিল। পরে অবশ্য বেসরকারি টেলিভিশনের নিউজ প্রযোজনা থেকে চলচ্চিত্র নির্মান করতে এসেছেন তিনি।

তার পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র অন্ধ নিরাঙ্গম। ২০১০ সালে এটি মুক্তি পায়। উল্লেখ্য একুশে টেলিভিশন প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র এটি। এই চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ভারতের কলকাতা থেকে ২০১৫ সালে ১৪ তম টেলিসিনে পুরস্কার পান। একজন বাংলাদেশী হিসেবে এটা অবশ্যই আনন্দের এবং গর্বের। প্রথম সিনেমাতেই তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, তিনি কাজটা ভালোবাসেন এবং সামনে তার পরিপক্কতা বা নির্মানের কৌশল নিয়ে আরো ভালো কিছু উপহার দিবেন। হতাশ করেননি কল্লোল।

২০১৭ সালে সোহানি হোসেনের ‘মা’ গল্প অবলম্বনে ‘সত্তা’ সিনেমাটি নির্মাণ করেন তিনি। এই সিনেমায় বাংলাদেশের সুপারস্টার শাকিব খান এবং ভারতের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী পাওলী দাম কে মূল চরিত্রে অভিনয় করান। ‘সত্তা’ সুস্থধারার বাংলা চলচ্চিত্রে একটি অনবদ্য নাম। সিনেমাটি ব্যবসায়িক ভাবেও সফলতা লাভ করে। সিনেমার গল্প, দক্ষ পরিচালনা, অভিনয় শিল্পীদের নজর কাড়া অভিনয় এবং সুমধুর গানের কারণে মন জয় করে সকলের। বাচসাস পুরস্কারে ২০১৭ সালের ছয়টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে নিয়েছে সত্তা। তাই খুশির মাত্রাও অনেক বেশি পুরো টিমের। এবং ক্যাপ্টেন অব দ্যা শীপের দায়িত্ব পালন করা কল্লোলের খুশির মাত্রা একটু বেশি।

এই সিনেমা নিয়ে তার অভিজ্ঞতা এবং পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সত্তা সিনেমাটি খারাপ-ভালো মিলিয়ে আমার কাছে অভিজ্ঞতা অর্জনের একটা বড় জায়গা। কারন এই সিনেমার মধ্য দিয়ে পরিচালক হিসেবে নিজের সীমাবদ্ধতা বা নিজের পজিটিভ অনেক কিছুই আমার পক্ষে বোঝা সহজ হয়েছে।’

শিল্পী হিসেবে পাওলি ও সাকিবের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘পাওলি-শাকিব তাঁদের সেরা কাজটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আমি পরিচালক হিসাবে পাওলি ও শাকিব খানের যে সহযোগিতা পেয়েছি সেটিই ছিল সত্তার মূল কথা। আর প্রযোজকের কাছ থেকেও আমি যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। পুরস্কার প্রাপ্তি অবশ্যই আনন্দের। আর আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অংগনে এটা আরো একটু বেশি আনন্দের। কারন আমরা যে সেক্টরে কাজ করি- সেখানে প্রতিনিয়ত তিরস্কার হওয়াটাকেই নিয়তি মেনে নিয়েই কাজটা করতে হয়। পুরস্কার প্রাপ্তিকে তাই অর্জন হিসেবে দেখি। ধন্যবাদ তাদেরকে যারা আমাকে এই সম্মান পাবার যোগ্য মনে করেছেন।’

বাংলাদেশের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি এখন এক দুঃসময় পার করছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হল, কমছে সিনেমা নির্মান, বাড়ছে এফডিসির দলাদলি। এমন সময়ে এই মাধ্যমের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বা একজন ইন্ডাস্ট্রির একজন মানুষ হিসেবে আপনার মতামত কি? – জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটা একদিনে যেমন হয়নি তেমনি হঠাৎ রাতারাতি সব ঠিক হবে তেমন নয়। আমরা ভাষা এবং স্বাধীনতার জন্য রক্ত দেয়া জাতি। আমাদের সাহিত্য অনেক শক্তিশালী। প্রত্যেকেরই উচিত নিজ অবস্থান থেকে দেশকে ভালোবাসা এবং ধারণ করা। চলচ্চিত্র অনেক শক্তিশালী মাধ্যম। এর মাধ্যমে সমাজকে ভাবানো-বদলানো সম্ভব। আমরা যেন ইতিবাচক বোধ ধারণ করে কাজ করি তাহলে হয়তো খারাপ সময়টা কেটে যাবে। মন থেকে চাই এই সময়টা যেন বিদায় নেয়, চলচ্চিত্র যেন ফিরে পায় তার সোনালী দিন।’

হাসিবুর রেজা কল্লোলের যাত্রা শুরু হয়েছিল লালনের আখড়া নিয়ে অন্ধনিরাঙ্গম  সিনেমাটি দিয়ে। তার পরিচালিত দ্বিতীয় সিনেমা সত্তার বাণিজ্যিক সাফল্য সাথে নিয়েই তিনি এই সময়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তার তৃতীয় সিনেমা নিয়ে। কল্লোলের পরের চলচ্চিত্রের নাম ‘মন্দছবি’। এইমূহুর্তে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন এই সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখছেন। তাই স্ক্রিপ্টিং এবং কাস্টিং ভাবনা একসাথে চলছে। যদিও কোনোকিছু চূড়ান্ত হয়নি এখনো তবে এই সিনেমাটি নিয়েও আশাবাদী তিনি। সিনেমার গল্প এবং অভিনেতা- অভিনেত্রীদের অভিনয় দিয়ে এই সিনেমাটিও দর্শকদের মন ছুয়ে যাবে বলেই বিশ্বাস করেন তিনি।

চলচ্চিত্রকে সাথে নিয়েই পথ চলছেন এই গুণী নির্মাতা। ভবিষ্যৎ ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে ভবিষ্যৎ নিয়ে সেভাবে বলা তো যায়না। তবে আমি কাজ করে যেতে চাই সবসময়। ভালো ভালো চলচ্চিত্র নির্মান করতে চাই। দেশের মুখ উজ্জল হবে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্মানিত হবে এমন চলচ্চিত্র নির্মান করতে চাই। কতটুকু পারবো সেটা তো বলতে পারিনা কিন্তু আমার সবটুকু দিয়েই সেই চেস্টা করে যাবো এটুকু বলতে পারি।’

চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে একজন হাসিবুর রেজা কল্লোলের স্বপ্নগুলো সত্যি হোক সেটাই আমাদের কামনা। সিনেমাকে ভালোবেসে নিরলসভাবে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে যাওয়া এই দক্ষ এবং মেধাবী পরিচালক তাঁর ভিন্নধর্মী কাজ দিয়ে পৌছে যান সফলতার শিখরে – এটাই দর্শক ও সমালোচকদের প্রত্যাশা।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।