অনুরাগনামা

পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের ‘মুক্কাবাজ’ দেখে আমি বেশ ইম্প্রেসড হয়েছিলাম। ভালো লাগে, আজ এত বছর পরেও অনুরাগ নতুন গল্প অ্যাটেম্প করে যাচ্ছেন। মেকিং উনিশ-বিশ হচ্ছে, কিন্তু তার ক্যারেক্টার ডিজাইন এখনও অনন্য রয়ে গিয়েছে। অনুরাগ কাশ্যপ সম্পর্কে আমার প্রাথমিক ইম্প্রেশন খুব খারাপ ছিলো। ২০০৬-০৭ এর সেই সময়ে অনুরাগ নিজেও খুব বাজে সময় কাটাচ্ছেন (পাঁচ মুক্তি পায়নি, ব্ল্যাক ফ্রাইডে আটকে আছে, নো স্মোকিং সুপার ফ্লপ)।

সারাক্ষণ ব্লগে সবার বিরুদ্ধে বিষেদাগার করা ছাড়া তার তখন তেমন কোন কাজ ছিলো না। নো স্মোকিং-এর ট্রেইলার আর গান দেখে খুব বিরক্ত হয়েছিলাম (পরে জেনেছি, অনুরাগ নিজেও খুব বিরক্ত ছিলেন)। ২০০৯ সালে বের হলো দেব ডি। মুক্তির আগেই এই সিনেমার ‘ইমোশনাল অত্যাচার’ গানটা অনেক পপুলারিটি পেয়েছিল। এখনকার খুব পরিচিত মুখ নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী ছিলেন সেই গানে। আমি প্রথমবার দেব ডি দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।

এমন পটভূমিতে এমন গল্প, এমন ন্যারেটিভ, ক্যামেরার এমন কাজ, মিউজিকের এধরণের ব্যবহার হিন্দি মুভিতে আমি আগে দেখিনি। বোল্ড, ফ্রেশ আর ইউনিক একটা ভয়েস ছিলো ঐ মুভির। সেই থেকে সবাইকে ধরে-বেঁধে অনুরাগের মুভি দেখিয়েছি (মোস্ট অফ দেম হেটেড হিজ মুভিজ)। একমাত্র আমার এক বড় ভাই ছাড়া আর কাউকে অনুরাগের ভক্ত বানাতে পারিনি।

এখন সময় পাল্টেছে। অনুরাগ এখন ট্যারান্টিনোর ন্যায় ফ্যানবেইজ পেয়েছেন। তার মুভি নিয়ে নেতিবাচক কিছু বললে আপনার ফিল্মসেন্স, রুচি ও বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হয়। অনুরাগ নিজেও মনে হয় এদের দ্বারা কিছুটা ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে গিয়েছিলেন। কারণ তাঁর ‘আগলি’ পরবর্তী দুটো কাজে ফ্যান সার্ভিসিঙের প্রচুর নমুনা পাওয়া যায়।

তবে তার এই সব ফ্যান যে শুধুমাত্র ঘরে বসে গলা ফাটায়, সেটা অনুরাগ নিজেও বুঝেছেন। বছরখানেক আগে দেওয়া এক মোটিভেশনাল স্পিচের ফাঁকে তিনি বলেন, ‘তার ছবির দর্শকরা হলে যায় না, ল্যাপটপে বসে মুভি দেখে।’ কতটা বেদনা নিয়ে তিনি এ কথা বলেছেন, সেটা নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে।

মুক্কাবাজ ছবির একটা দৃশ্য

আমি খুবই হতাশাবাদী একজন মানুষ। ভালো কাজ একসময় (তা যত দিনই লাগুক না কেন) মানুষের অ্যাপ্রিসিয়েশন পাবে, এমন দিবাস্বপ্নও আমি দেখি না। তারপরও যখন দেখি এমন মুভি মাত্র ১০ কোটি টাকা ব্যবসা করে, ক্রিটিকরা মুভির বক্তব্য, আন্ডারলায়িং টোন বাদ দিয়ে রানিং টাইম নিয়ে পড়ে থাকে, এমনকি মুভি অনলাইনে আসার পরও কোনরকম পাত্তা পায়না, আমার হতাশার সীমা থাকে না।

মুক্কাবাজে স্পোর্টস সেক্টরের দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি তো উঠে এসেছেই। সেই সাথে আরো এসেছে জাতপ্রথা, প্রতি জাতপ্রথা, বিফ পলিটিক্স সর্বোপরি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি। অ্যালজেব্রার সাথে কথোপকথনে অনুরাগ বলেছেন ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভারতে বসে তিনি এই মুহূর্তে যে কোন বক্তব্যের ছবি বানাতে পারবেন না।

এটা নিখুঁত কোন ছবি নয়। কিন্তু এর বক্তব্য এমন কিছু পথ স্পর্শ করে, যেখানে যাওয়ার মতো সাহস খুব কম ফিল্মমেকারের আছে। ছবির শুরুতে দেখা যায় কিছু মুসলমান গরু ব্যবসায়ীকে বেধড়ক পিটুনি দেওয়া হচ্ছে। আর তাঁদের ‘জয় শ্রী রাম’ বলতে বাধ্য করা হচ্ছে (পরে ডাবিং করে সেটা পাল্টানো হয়েছে)।

আর সিনেমার শেষ হয় একটা গান দিয়ে, যার প্রথম দুই লাইন হচ্ছে – ‘অনেক করেছি সম্মান, এখন তুমি গোল্লায় যাও।’ বুদ্ধিমান মানুষমাত্রই ধরতে পারবেন, এই কথাটি কাকে উদ্দেশ্য করে বলা। দেশের ভেতরে বসে, এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে এভাবে কয়জন বলে?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।