সেই দীপু, এই দীপু

সালটা মনে নেই ঠিক, অনেক ছোট ছিলাম, বাসায় প্রথমবার কম্পিউটার কেনা হলো। আমাদের ক্রয়কৃত কম্পিউটারের দোকানেরই একটি অফার ছিলো সম্ভব। কম্পিউটারের সাথে ডিভিডি ফ্রি। অফারের ন্যায় আমাদেরো একঝাঁক ডিভিড দেওয়া হলো। এর বেশিরভাগই ছিলো বাংলা সিনেমার।

বাংলা সিনেমার গতানুগতিক মারামারি , কোপাকুপি আমার অনেকটা অপছন্দের তালিকায়। সবক’টি সিডির কভার পোস্টারটা দেখেই মোটামুটি সব জায়গাতেই কোপাকোপি কিংবা রক্তের ছড়াছড়ির একটা আভাস পেয়েছিলাম। তবে এসব সিডির ভীড়ে একটি সিডিতে বেশ আলাদাভাবে নজর পড়লো। কভার পোস্টারে একটি স্কুলছাত্রের ছবি। নামটাও অনেকটা ভিন্ন, ‘দীপু নাম্বার টু’।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের উপন্যাস অবম্ববনে মোরশেদুল ইসলামের পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রের পোস্টারেই যা বুঝলাম এখানে হয়তো কোপাকোপির দেখা মিলবে না। সেদিনই যে এটি দেখে একটি দূঃসাহসিক চরিত্রের সাথে পরিচিত হবো তা দেখার আগে অনুমান করিনি অবশ্য। গতানুগতিক মারামারি খুনের দৃশ্যের বিপরীতেও যে সিনেমার আরেকটি জগত আছে সেটিও হয়তো এই সিনেমা না দেখলে বুঝতেই পারতাম না।

একঝাঁক বন্ধুত্বের গল্পে বিজড়িত অ্যাডভেঞ্চারে পরিপূর্ণ একটি স্মৃতির নাম ‘দীপু নাম্বার টু’। এই চলচ্চিত্র দেখতে গিয়ে একজন ব্যাক্তি কতবার যে দীপুর সাথে রাঙামাটিতে ঘুরে এসেছে সাথে দীপুর মতো রোমাঞ্চকর এবং দুঃসাহসিক অভিযানে নিজেকে কল্পনা করতেও যেনো ভুলেনি। করবে বা ই না কেন? এটি শুধুমা্ত্রই একটি সিনেমা?

এতেই যেনো মিশে আছে ছোটবেলার স্কুলের স্মৃতি, বন্ধুদের সাথে যুদ্ধের পরিস্থিতি, দল বেঁধে খেলার আনন্দ, অজেয়কে জয় করার অদম্য চেষ্টা, মা-বাবার ভালবাসাকে একটু গভীরভাবে উপলব্ধসহ আরো কতই না কিছু। সিনেমা তো দূরে, সামান্য ৪০ কিংবা ১ ঘন্টার টেলিফিন্ম দেখার ধৈর্য্যটা কখনোই নিজের মধ্যে আয়ত্তে আনতে পারিনি। তবে ‘দীপু নাম্বার টু’ এর ক্ষেত্রে কেনো জানি ব্যাপারটা পুরোই উল্টো। কম হলেও ১ ডজনবার দেখা হয়েছে। এখনো প্রতিবছর একটি দিন বরাদ্দ রাখি এই সিনেমার জন্য।

খুবই আশ্চর্য্য লাগে নিজেকে, এতোবার দেখেও যেনো মনটা এখনো ভরেনি। এতবার দেখেও মনে হয় প্রথমবার দেখছি, গল্পটা যেনো অচেনা, অজানা। বিরক্ত জিনিসটা এখনো অনুভব হয়নি এই সিনেমা দেখে। ক্লান্তিও আসেনি এখনো। আমার নিয়মমাফিক ‘দীপু নাম্বার টু’ দেখার ২০১৯ পর্বটা অন্যান্যবার থেকে একটু নয় পুরোই যেনো আলাদা। গতবছর উপন্যাস অবল্বনে নির্মিত ‘দীপু নাম্বার টু’ দেখে ঘুমানোর সাথে সাথেই কাকতালীয়ভাবে স্ব্প্নে দেখা হয়ে যায় প্রধান চরিত্রে অভিনীত সেই ছোট্ট দীপুর সাথে।

খুব অল্প সময়ের জন্য নিজের সামনে অবিশ্বাস্যভাবে দেখা পাওয়ার কারণটা হয়তো এই সিনেমার প্রতি আমার অধিক আসক্তিকতা। বিষয়টা কল্পনা থেকে বাস্তবে চিন্তার চেষ্টা করি, ‘আসলেই কোথায় সেই ছোট্ট দীপু? সেকি আদৌ ছোট্ট?’ পত্রপত্রিকায় ফিচার লেখালেখির সুবাদেই মাথায় চেপে বসেছিলো কেমন হয় যদি সেই ছোট্ট দীপুকে আমার ফিচারে হাজির করা যায়। তাৎক্ষণিক কল দিয়ে বসলাম আমার বিভাগীয় সম্পাদক শামীম ভাইকে। তিনিও যেনো বেশ আগ্রহী।

লেখার জন্য দিয়ে দিলেন গ্রিন সিগন্যাল বা সবুজ সংকেত। তবে যত সহজে চিন্তা করলাম তত সহজেই কি তার কাছে আদৌ পৌছাঁনো সম্ভব? সাহায্য নিয়ে হাজির হলাম সবজান্তা খ্যাত গুগলের সামনে। ঘাঁটাঘাঁটি করে বের করলাম এই চলচ্চিত্রের ইতিহাস। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জানা হয়ে গেলো সেই ছোট্ট দীপুর আসল নাম অরুণ, পুরোনাম অরুণ সাহা।

আরো জানলাম এই চলচ্চিত্রের পর দীর্ঘ ২০ বছর ক্যামেরার আসেননি আর। মাঝে ২০১৫ তে দীর্ঘসময়ের ব্যবধানে কাজ করেছিলেন একটি মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপনচিত্রে। সেটিরো পাঁচ বছর ছুঁই প্রায়। বর্তমানে তার নিবাস কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে। আমার অবস্থান চট্টগ্রাম অন্যদিকে কানাডা। কোনো এক অজানা সাহিত্যিক বলেছিলেন, ‘ডিজিটাল যুগে দূরত্ব বলতে কিছুই নেই।’

সেই বাক্যেই হয়তো আশা খুঁজে পেয়েছিলাম। ফেসবুকের সার্চ বক্সে অরুণ সাহা লিখে সার্চ করে বসলাম। ক্ষণিকের মধ্যেই ভেসে ওঠলো হাজারো অরুণ সাহা। এরমধ্যে আমাদের দীপু কোনটি? তাহলে কি সবাইকেই মেসেজ করতে শুরু করবো? এই অসম্ভব চিন্তা থেকে বেড়িয়ে সার্চ দিলাম অরুণ সাহা লিখে আগে পরে জুড়ে দিলাম দীপু নাম্বার টু। এবার বুঝি ঢিলটা ঠিক জায়গাতেই পড়ল ।

পেয়ে গেলাম বহু প্রতীক্ষিত সেই মানুষটিকে। তবে সে আনন্দের স্থায়িত্বকাল বেশিক্ষণ রইল না। টাইমলাইন ঘুরেও বুঝলাম তার ফেসবুকে আনাগোনা নেই বললেই চলে। বছর দু এক অন্তর অন্তর অন্তর স্ট্যাটাস। প্রতিটি স্ট্যাটাসের কমেন্ট চেক করতে গিয়ে বেশ অবাক হচ্ছিলাম রীতিমত। সেই ৬ ৭ বছর আগের স্ট্যাটাসে এখনো মানুষ কমেন্ট করে বেড়াচ্ছেন, কমেন্টে প্রকাশ করছেন প্রিয় মানুষটির প্রতি জন্মানো ভালোবাসা।

তারাও আমার মতো এই ব্যাক্তির খোঁজে। ফিচার তো আমি করেই ছাড়বো! ভাবলাম এভাবে হবে না, রীতিমত আত্নীয়স্বজনদেরো ছাড় দিই নি। এতটা মনোযোগ, গবেষণা কোনোদিন পড়ালেখায় দিয়েছি বলে মনে হয়না। এই নিয়ে পরবর্তী পাগলামোগুলো যেনো আর না ই বলি। পুরোটা লেখতে বসলে সম্ভবত এই ইস্যুতেই নিজের নামের পাশে বই লেখকের পরিচয় বসিয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু না।

প্রায় এক মাসের খোঁজাখুঁজির অপারেশন শেষে অবশেষে পাওয়া গেলো নব্বই দশকের প্রতিটি মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়া চলচ্চিত্র জগতের এই তারকাকে। আমার লেখালেখি জগতে এই প্রিয় মানুষটির কাছে পৌছাঁনোর অভিজ্ঞতা অবশ্যই ভুলার মতো নয়। এটাকে আবার লেখালেখি জগতে আমার অর্জন হিসেবেও দেখি। ব্যাক্তি হিসেবেও তিনি অসাধারণ!

প্রথম কথাতে যেনো বোঝা মুশকিল তার সাথে আমার নতুন পরিচয়। ব্যাক্তি হিসেবে মানুষটিকে নিয়ে লেখতে বসলে কয়েক হাজার অক্ষর পার করে দেওয়া যাবে নিন্দেহে। ১৯৯৬ এবং ২০১৯ মাঝে ২৩ টি বছর। কত পরিবর্তনের ছোঁয়া, তবুও যেনো তার মাঝে দীপু চরিত্রটি হারিয়ে যায়নি। তার মুখেই তার গল্প শোনা হবে তা ভাবা হয়নি আগে।

‘দীপু নাম্বার টু’ চলচ্চিত্র পরবর্তী জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার প্রাপ্ত ব্যাক্তিটি চাইলে বিনোদন জগতের একটি বড় অংশজূড়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। সব বির্সজন দিয়েছেন পরিবারের স্বার্থে পরিবারের স্ব্প্ন পূরণে, মন দিয়েছেন পড়ালেখায়। সেন্ট জোসেফ স্কুলে এসএসসি, নটর ডেম কলেজে এইচএসসি, বুয়েট থেকে স্কলারশিপ নিয়ে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে চাকরিসূত্রে ভারত, জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরে কর্মসূত্রে বর্তমান অবস্থান কানাডার ভ্যাংকুভার শহরে।

বর্তমানে যেখানে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যে কাজ করলেই আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিনেতা পরিচয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি সেখানে এই মানুষটি শো অফ তো দূরে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া ভার্চুয়াল জগতে উপস্থিতই হননা। দেশের চলমান চলচ্চিত্র জগতে এই মানুষগুলোকেই যেনো বেশি প্রয়োজন। আশা করি খুব শীঘ্রই আবারো চলচ্চিত্র জগতে এই মানুষটিকে দেখা যাবে আরো দূঃসাহসিক চরিত্রের সাথে।

মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য একটি কাজই যতেষ্ট কথাটি যেনো প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এই মানুষটি। মানুষটিকে নিয়ে আজ এতকিছু লেখলাম বিশেষ কোনো কারণ নেই। স্কুল জীবনের স্মৃতি, স্যারের দেওয়া শাস্তি সবাই মিলে ভাগাভাগি করে নেওয়া, বহু চেনা-অচেনা বন্ধন, দুঃসাহসিক, একতাবদ্ধ অভিযানসহ হাজারো শব্দকে-অনুভূতিকে যদি এক কথায় প্রাকশ করতে বলা হয় এক্ষেত্রে ‘দীপু নাম্বার টু’ ছাড়া আর উপযুক্ত কোনো শব্দ পাওয়া যাবে বলে অন্তত আমার মনে হয়না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।