বিশ্বজুড়ে বর্ষবরণ: নানা ঢঙ, নানা রঙ

নিজস্ব সংস্কৃতি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের মানুষের জন্যই খুব আপন। তাই, জর্জিয়ান বর্ষপঞ্জিকা অনুযায়ী অফিস-আদালত চালালেও নিজেদের ক্যালেন্ডারকে মানুষ ভুলে যায় না। নিজেদের বছরের প্রথমদিনটিকে ঘিরে তাঁদের থাকে নানা আয়োজন, নানা রকম জমকালো উদযাপন। সেসব নিয়েই আমাদের এই আয়োজন।

  • চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনা

টানা ১৫ দিন ধরে চীনসহ আরো কয়েকটি এশিয়ান দেশ যেমন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামের শতকোটি মানুষ পালন করে চন্দ্র নববর্ষ। এর নাম ‘বসন্ত উৎসব’। বসন্ত কারণ আগের বছরের শেষ দিনেই আনুষ্ঠানিক ভাবে শীত বিদায় নেয়, শুরু হয় বসন্তকাল।

চীনারা ঐতিহ্যবাহী চাইনিজ চন্দ্রবর্ষপঞ্জিকা মেনে চলে। এটা নির্ভর করে চাদের ঘুর্ণনের ওপর। প্রতিটি বছরের প্রানীর নামে নামকরণ করা হয়।  ২০১৮ সালটা যেমন ছিল ‘কুকুরের বছর’। বছরের প্রথম দিন হয় ২১ জানুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে।

বর্ষবরণের উৎসব শুরু হয় বছরের প্রথমদিনের একদম গোড়া থেকে। চলে প্রথম মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত।

  • রাশিয়া

রাশিয়ানরা মূলত জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিকা মেনে চলেন। ত্রয়োদশ পোপ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন করেন। ১৫৮২ সাল থেকে ক্যাথলিক দেশগুলোতে চালু হয় এই ক্যালেন্ডার। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের সাথে এর পার্থক্য হল ১৩ দিনের। প্রতি ৪০০ বছর পর পর জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে তিন দিন করে যোগ হয়।

সেই হিসেবে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে রাশিয়ানরা নববর্ষ উদযাপন করে। ‘এস নোভিম গডম…’ গানটি গেয়ে তারা নতুন বছরকে স্বাগত জানায়। রাশিয়ানরা এই সময় ছুটিতে নানা জায়গায় বেড়াতে যায়।

মস্কোতে যারা থাকেন তাঁরা এদিন রেড স্কয়ারে জড়ো হন। সেখানে গানবাজনা হয়, কনসার্ট হয়, থাকে আঁতশবাজির ব্যবস্থাও। এদিনে তাঁদের খাবারের তালিকায় থাকে ডার্ক ব্রেড, আচার, মাশরুম ও নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পানীয়। পরিবারের সাথেই সবাই দিনটি কাটাতে পছন্দ করেন।

  • ইরান ও আফগানিস্তান

ইরানের ৭৫ মিলিয়ন ও আফগানিস্তানের ৩০ মিলিয়ন মানুষ এক সাথে উদযাপন করে নিজেদের নতুন বছর ‘নওরুজ’। ‘নওরুজ’ মানে নতুন দিন, বসন্তের সূচনা। টানা ১৩ দিন ধরে চলে এই উৎসব।

এটাকে পার্সিয়ান ক্যালেন্ডারও বলা হয়। এটা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রাচিন বর্ষপঞ্জিকাগুলোর একটি। বয়স প্রায় চার হাজার বছর।

 

এই দিনটাতে মানুষ নতুন করে সূচনা করতে ব্যবহার করে। আক্ষরিক অর্থেই পুরনো বছরের গ্লান মুছতে ঘরদোর ধোয়ামোছা করে সব টিপটপ করে ফেলে। সবার শরীরে থাকে নতুন পোশাক।

  • ভারত

ভারতের সনাতন, শিখ ও জৈন ধর্মাবলম্বিদের পালিত বর্ষবরণের সাথে স্যাটেলাইট টেলিভিশনের কল্যানে আমরা সবাই কমবেশি পরিচিত। এটা হল ‘দিওয়ালি’, যার অর্থ হল আলোর উৎসব। পাঁচদিন ব্যাপী এই আয়োজন সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি – কোনো এক সময় হয়ে থাকে।

একেক ধর্মাবলম্বী মানুষ ভিন্ন ভিন্ন কারণে দিওয়ালি পালন করে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দিনটি রানের রাজ্যে প্রত্যাবর্তনের দিনি। তারা অশুভ শক্তি ছাপিয়ে সত্যের জয় হিসেবে দিনটিকে উৎযাপন করে থাকে।

এই উৎসবে পরিবারগুলোর মধ্যে মিষ্টি ও উপহার আদান প্রদানের রীতি আছে। আর পার্সিয়ান নববর্ষের মত এদিনও ঘরদোর পরিস্কার করে নতুন পোশাক পরেন ভারতীয়রা।

যদিও, গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে অনেক রকম বর্ষপঞ্জিকা আছে। অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বী ‍শ্রী কৃষ্বের মৃত্যুর সময় (খ্রিষ্টপূর্ব ৩১০২) থেকে সাল গণনা করে। কেউ আবার গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর সময় (৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে বছর গণনা করে।

  • ইথিওপিয়া

আফ্রিকান দেশটির বছরের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘এনকুটাটাশ’। নিয়মিত বর্ষপঞ্জিকা থেকে ইথিওপিয়া আট বছর পেছনে। জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের রীতি অনুযায়ী, তাঁদের জন্য বছরের প্রথম দিনটা হল ১১ সেপ্টেম্বর, লিপ ইয়ারের ক্ষেত্রে ১২ সেপ্টেম্বর।

ইথিওপিয়ানরা, বর্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর নতুন ঋতুর প্রথম দিন হিসেবে দিনটিকে উদযাপন করে। গোটা দেশব্যাপী চলে নানা আয়োজন। সবাই এন্তোনো পাহাড়ের গীর্জায় গিয়ে পার্থনা করে। চার্চ থেকে বাড়িতে ফিরে তাঁরা ‘ইনজেরা’ নামক ইথিওপিয়ান এক খাবার খায়।

পড়ন্ত বেলায় নারী-পুরুষরা জমকালো সব পোশাক পরে বের হন। সরিষা ফুলের তোড়া আদান প্রদান ও গান গেয়ে দিনটি পালন করেন। তাঁদের আয়োজনগুলো বিশ্বজুড়ে বেশ বিখ্যাতও বটে।

– গ্রিন গ্লোবাল ট্রাভেল, ব্রাইট সাইড ও ট্রিপস্যাভি অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।