মিউসাইজ: আসুন ভিন্ন চোখে দেখি

২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মিউসাইজ’ সম্ভবত বাংলাদেশি দর্শকদের সবচেয়ে প্রিয় তুর্কী মুভি। ষাটের দশকের এই গল্পে এক শিক্ষক বদলি হয়ে যান তুরস্কের প্রত্যন্ত এক গ্রামে। সেখানে আরো অনেকে সাথে আমরা পরিচিত হয় আজিজ নামের এক হ্যান্ডিক্যাপড মানুষের সাথে। সিনেমার আজিজের গল্পটি একজন সত্যিকারের মানুষের উপরে তৈরী করা। ছবি শেষে সেই আজিজকে দেখানো হয় এবং আমরা জানতে পারি, আজিজ ইস্তাম্বুলে সন্তান ও নাতি নিয়ে সুখী জীবন যাপন করছেন। তবে, মুভিটা দেখার সময় আমার মাথায় একটা ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। আজ সেটা নিয়েই লিখছি।

টার্কি বা তুরস্ক দেশটির ইতিহাস বড় অদ্ভুত। এশিয়া ও ইউরোপের মাঝে পড়ে তারা যেন আইডেন্টিটি ক্রাইসিসে ভুগে। বিভিন্ন শাসক ও ধর্মের প্রভাব দেশটিকে একেকসময় একেকদিকে নিয়ে গিয়েছে। খিলাফত পেরিয়ে কামাল, তারপর সেনা অভ্যুত্থান হয়ে বর্তমানে এরদোয়ানের শাসন। টার্কি যেন টেনিস বলের মতো শুধু সেক্যুলারিজম আর কনসার্ভেটিজমের প্রান্ত বদল করছে। ব্রেক্সিটের কল্যাণে সামনে হয়তো তাদের ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ঢোকার অধরা স্বপ্নটাও পূরণ হবে।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, অনেকে মনে করেন টার্কি দেশটির নামকরণ হয়েছে টার্কি পাখি থেকে। কিন্তু আসলে নামটি এসেছে তুর্ক জাতি থেকে। আর টার্কি পাখিটার নাম যেন ভূগোলের ক্লাস শুরু করে দেয়। কারণ এই পাখিটাকে একেক দেশে ভিন্ন আরেকটি দেশের নামে ডাকা হয়।

ইংরেজিতে এই পাখির নাম টার্কি, পর্তুগিজরা ডাকে পেরু বলে, মিশরীয়রা চেনে গ্রীক বার্ড নামে, গ্রীকরা আবার এই পাখিকে ডাকে ফরাসি পাখি বলে। ওদিকে ফরাসীরা (সেই সাথে পোল্যান্ড, ইজরাইল, কাতালোনিয়া ও রাশিয়া) এই পাখিকে ডাকে ইন্ডিয়ান চিকেন হিসেবে। মালয়েশিয়ানরা একে ডাচ মুরগী বলে। আর ডাচরা (ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, ইন্দোনেশিয়াকে সাথে নিয়ে) পাখিটাকে চেনে কালিকূটের (ভারতের কালিকুট শহর) মুরগি হিসেবে। তুর্কীরা অবশ্য এত ঝামেলায় যায়নি, তারা একে ডাকে হিন্দি।

ছবির কথায় ফিরে আসি। ‘Mucize’ (তুর্কী এই শব্দটির আরবী প্রতিশব্দ হলো মোজেজা আর ইংরেজী অর্থ মিরাকল) আসলে আজিজের রূপান্তরের গল্প। কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, ছবির কাহিনী ও হাস্যরসের আড়ালে এটা যেন সেলিব্রেশন অফ টার্কি। তুরস্কের সত্যিকারের রূপ, অতীত, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে পুরো ছবিজুড়ে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বেশ ন্যাশনালিস্টিক টোন পাওয়া যায়। যেমন : জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে সেটাকে স্যালুট করা। তাই আমার কাছে মনে হয়েছে আজিজ যেন তুরস্কেরই এক প্রতিরূপ।

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তুরস্ক সম্পূর্ণরূপে ধুঁকছিলো। অর্থনীতি, দেশীয় রাজনীতি, ফরেন পলিসি, শিক্ষা সবক্ষেত্রে হ্যান্ডিক্যাপড হয়ে পড়েছিলো। এই রাষ্ট্রটি ছিলো ইউরোপে অবহেলা ও কৌতুকের পাত্র। কিন্তু সেখান থেকে তুরস্ক ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এবং সম্ভবত ভালোবাসাই পারে সব পাল্টে দিতে- হোক সেটা মানুষ কিংবা দেশ।

উপরের কথাগুলো নিছকই থিওরি। যদিও ফিল্ম থিওরি চলচ্চিত্র সমালোচনার অংশ হিসেবে স্বীকৃত, আমি অতটা দূরে যাবোনা। এটা স্রেফ আমার ইন্টারপ্রিটেশন। এর সাথে সহমত পোষণ করতে হবে না কিংবা একে সঠিক বলে মেনে নিতেও জোর করবো না।

পরিচালক কুয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর একটা কথা আমার খুব পছন্দ, ‘১০ লাখ মানুষও যদি আমার ছবি দেখে থাকে, আমি আশা করবো তারা ১০ লাখ ভিন্ন ছবি দেখেছে।’ একটা সিনেমা থেকে আপনি কি নিচ্ছেন (সেটা হতে পারে শিক্ষা, জীবনবোধ কিংবা নিখাদ বিনোদন), সেটাই হলো মূল কথা। লেখা শেষ করছি বিসিএস পরীক্ষার্থীদের জন্য একটা তথ্য দিয়ে। তুরস্ক (তৎকালীন অটোমান এম্পায়ার)-কে একসময় কি নামে ডাকা হতো জানেন কি?  – ‘দ্য সিক ম্যান অফ ইউরোপ’!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।