ডায়ানা-চার্লস: একটি ভঙ্গুর ও বিশ্বাসহীন সম্পর্ক

সংসারে যে গোপন একটা স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল সেটা কখনো প্রিন্সেস ডায়ানা ও প্রিন্স চার্লস বন্ধ দরজায় আড়াল করে রাখতে পারেননি।

১৯৮০-এর দশকে অনেকেই এই দম্পতিকে রূপকথার গল্প থেকে উঠে আসা কোনো জুটি বলে ভাবতেই পছন্দ করতো। বিশেষ করে সেই প্রকোপটা আরো বাড়ে ১৯৮১ সালে তাঁদের বিখ্যাত ও জাকজমকপূর্ণ সেই বিয়ের পর।

বিশেষ করে ব্রিটিশ মিডিয়া এতটাই অতিরঞ্জিত করে ফেলেছিল যে, তখন সকলের মুখেই এই জুটির চর্চা হত বেশি।  সকলের মুখেই ঘুরে ফিরে আসতো এই জুটির কথা। এমনই কালক্রমে ডায়ানার সবচেয়ে বেশি ক্যামেরায় ধরা পরা বা সবচেয়ে আলোচিত চরিত্রে পরিণত হয়েছিলেন। হ্যাঁ, তাঁর জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে গিয়েছিল খোদ রাজ পরিবারকেও।

নব্বইয়ের দশকে, মিডিয়া চার্লস ও ডায়ানাকে এমন ভাবে ফোকাস করেছিল, যেটা আগে আর কারো ক্ষেত্রেই হয়ান। এমননি ব্রিটিশ পার্লামেন্টও যুক্তরাজ্যের খবরের কাগজের সম্পাদকদের ডেকে পাঠিয়ে জানতে চেয়েছিল, কারো ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ভাঙার কোনো অধিকার তাঁদের আদৌ আছে কি না!

আর এটা করতে করতেই, একটা সময় বিশ্ব কেঁপে ওঠে, তাঁদের লেখালিখি একটা সময় গিয়ে ডায়ানা ও চার্লসের বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়।

প্রথমটা ১৯৯২ সালে অ্যান্ড্রু মর্টনের বিখ্যাত বই ‘ডায়ানা: হার ট্রু স্টোরি’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে হয়। সেখানে ডায়ানার ব্যক্তিগত আক্ষেপ, সাবেক জীবনের পারিবারিক কষ্ট ও আত্মহত্যার চেষ্টার কথা প্রথমবারের মত জনসম্মুখে আসে।

তখন সাধারণ মানুষের এই ব্যাপারে খুব সামান্যই ধারণা ছিল। যদিও, এটাও ঠিক যে, মর্টনকে কলামিস্ট বন্ধু জেমস কলথ্রাস্টের মাধ্যমে সাক্ষাৎকারগুলো ডায়ানা নিজেই দিয়েছিলেন। যদিও, খবরটা খুব বিস্ময়কর ছিল, তারপরও এই বইটি ডায়নার প্রতি মানুষের বাড়তি সহমর্মীতা এনে দেয়। ডায়নার সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গী ভিভিয়েন পেরি যেমন বলেছিলেন, ‘ওটাই ওকে খাঁটি করে তুলেছিল’

রাজ পরিবারের জীবনী লেখক স্যালি বেড্যাল স্মিথ দু’পর্বের টেলিভিশন শো ‘পিপল অ্যান্ড এবিসি’-তে গিয়ে বলেছিলেন, ‘মর্টনের বই রীতিমত রাজ পরিবারকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল।’

আর এটা ছিল স্রেফ সূচনা।

এরপর চার্লস ও ক্যামিলা পার্কার-বোওলেস এমনকি ডায়ানার তৎকালীন প্রেমিক জেমস গিলবির মধ্যকার ফোনে কথা চালাচালি ফাঁস হয়ে যায় গণমাধ্যমে, সেটা ১৯৯২ সালের ঘটনা। সে বছরের শেষেই চার্লস ও ডায়ানার বিচ্ছেদের নোটিস দাখিল হয়। পার্লামেন্টে সেই বিচ্ছেদ ঘোষণা করেন খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী  জন মেজর।

১৯৯৪ সালে এক ডকুমেন্টারি সাক্ষাৎকারে চার্লস বলেছিলেন, ডায়ানার সাথে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কটা মোটেই সুখকর ছিল না। তিনি এটাও স্বীকার করে দিয়েছিলেন তিনি ডায়ানার আস্থাভাজন হওয়া তো দূরের কথা, স্ত্রীর বিশ্বাসও ভঙ্গ করেছিলেন। সম্পর্কটাকে তিনি ‘অবিশ্বাস্যরকমের ভঙ্গুর’ ছিল মন্তব্য করেন।

বিচ্ছেদে না হলেও অন্তত ‘সাবেক স্ত্রী’র মৃত্যুতে চার্লস বেশ শোকস্তব্ধ ছিলেন। বিশেষ করে দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়ামস ও প্রিন্স হ্যারির জন্য হলেও তিনি রানী এলিজাবেথের সাথে অনেকটা ঝগড়া করে হলেও ডায়ানার শেষকৃত্যটা রাষ্ট্রীয় মর্যাদাতেই করার ব্যবস্থা করেন। হয়তো খানিকটা পাপবোধও ছিল তাঁর মনে।

ক্যামিলা পার্কারের সাথে পরকীয়ার সম্পর্কটাই তো তাঁকে ডায়ানার থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময় ক্যামিলার সাথে চার্লসের পরিচয় হয়। দু’জন ভাল বন্ধু ছিলেন। পরিণয় ছিল, যদিও ১৯৭৩ সালে তার অবসান হয়।

বিয়ের দিন, ক্যামিলা ও চার্লস

ওই সময় ক্যামিলা বিয়ে করেন অ্যান্ড্রু পার্কার বোওলেসকে। কেন চার্লস ও ক্যামিলার সম্পর্কে ফাঁটল ধরে? অনেক ধারণার মধ্যে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হল, রানী এলিজাবেথের এই সম্পর্কে অমত ছিল। ২০০৮ সালে রবার্ট ল্যাকে তাঁর ‘রয়্যাল: হার ম্যাজেস্টি কুইন এলিজাবেথ টু’ বইয়ে লিখেছেন, চার্লস ও ক্যামিলার খুব অল্প বয়সে পরিচয় হয়।

চার্লস ক্যামিলাকে অপেক্ষা করতে বলেছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন ৩০ বছর বয়সে গিয়ে বিয়ে করকে। কারণ, রাজ পরিবারের নিয়ম অনুসারে তাকে সামরিক কিছু দায়িত্ব এই সময়ে পালন করতে হবে। তবে, ক্যামিলা রাজি ছিলেন না। আর পার্কার বোওলেসের সাথে ষাটের দশক থেকে পরিচয় ছিল ক্যামিলার। তাঁকে বিয়ে করাই সঠিক মনে করেছিলেন তিনি।

যদিও ক্যামিলা-চার্লসের বন্ধুত্ব ছিল। আশি পেড়িয়ে নব্বইয়ের তাঁরা প্রেমিক-প্রেমিকা ‍জুটির মত ঘুরে বেড়িয়েছেন। এমনকি ক্যামিলার স্বামী পার্কারও অন্য মেয়েদের দেখেছেন। ‘ক্যমেলাগেট স্ক্যান্ডাল’ ১৯৯৩ সালে ফাঁস হয়। স্বামীর এই গোপন প্রেমের খবর ডায়ানা টের পেয়ে যান। চার্লসকে প্রশ্ন করেন, জবাব পাননি। বরং রাজ পরিবারের হাজারো নিয়ম আর প্রটোকলে তাঁর জীবন খুব একাকী আর অতিষ্ট হয়ে ওঠে। তিনিও পাখির মত মুক্ত আকাশে বিচরণের সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

বিচ্ছেদের প্যানারোমায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে রীতিমত বোমা ফাঁটান ডায়ানা। ১৯৯৫ সালে মার্টিন বশিরের সাথে সেই আলাপচারিতায় ডায়ানা তাঁর সাবেক স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতা, ক্যামিলার সাথে গোপন অভিসার, নিজের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। তিনি এটাও জানালেন প্রাসাদে, রাজ পরিবারে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসতো।

ক্যামিলা-চার্লসের সম্পর্ক নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেন, তাতে রীতিমত গোটা বিশ্ব এক মুহূর্তে কেপে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আসলে বিয়েটা ছিল তিনজনের, একটু বেশিই ভিড়ের, তাই না!’

তাঁর ছোট ভাই চার্লস স্পেনসার বলেছিলেন, ‘ও যখন এটা বলতে পারলো, তখন বুঝতে হবে ওকে কোন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। হয়তো বা ওর সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল, হয়তো বা ভুল তবে, ও যে খুব আড়ষ্ট একটা পরিবেশে ছিল সেটা না বলে।’

এই ঘটনার পর আসলে রানী এলিজাবেথের হাতে আর কোনো রাস্তা খোলা ছিল না এই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখার। মাসখানেক পর তিনি চার্লস ও ডায়ানাকে বিচ্ছেদে উৎসাহিত করে এক চিঠি লেখেন। আদালতে ১৯৯৬ সালে তাঁদের ডিভোর্স অনুমোদন পায়। এর ঠিক পরের বছরই জীবন নদীর ওপারে চলে যান ডায়ানা, বিতর্কিত এক সড়ক দুর্ঘটনায়।

১৯৯৫ সালে পার্কারের সাথে বিচ্ছেদ হয় ক্যামিলার। তিনি চার্লসকে বিয়ে করে ফেলেন ২০০৫ সালে। এখন তিনি দ্য ডাচেস অব কর্নওয়াল। চার্লস-ডায়ানার বড় ছেলে উইলিয়ামসের বিয়ে হয়ে গেছে। বিয়ের অপেক্ষায় আছেন ছোট ছেলে হ্যারিও। সবই ঠিক আছে। ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদ আজো আলো ঝলমল করে ওঠে। এত জমকালোতার ভিড়েও কখনো সখনো কোনো তীব্র যন্ত্রনার একটা আক্ষেপের সুর বেজে ওঠে। সেই সুরের নাম – ‘ডায়ানা, প্রিন্সেস ডায়ানা!’

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।