আমাদের গোঁজামিলের ফিল্ম ফিলোসফি: সমাধান কী!

দেশের সিনেমা হল মালিকেরা কেন টালিগঞ্জের ছবি আমদানি করছেন, কেন ভারতীয় বাংলা ছবির প্রদর্শন হচ্ছে তা নিয়ে বিতর্ক, চাপা ক্ষোভ- শিল্পী থেকে শুরু করে দর্শক- সব মহলেই অল্পবিস্তর আছে। কারণটা যে সবারই অজানা, তা কিন্ত নয়।

দীর্ঘদিন ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে ভালো কাজের কন্টিনিউটি নাই। ভালো বলতে ননস্টপ ভালো কাজ। ৯৫ ভাগ সাধারণ দর্শক যারা শিল্প বোঝেনা, ১০০% বিনোদন খোঁজে, তারা কী করতে পারে? যদি মাসে ২০০-৩০০ টাকা ডিশ বিল বা ৫০০-১০০০ টাকা ব্রডব্যান্ড বিল দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজারটা ভাল ছবি দেখা যায়, তাহলে সিনেমাহলে যেয়ে লোকে এই যুগে ‘ইয়া টিসুম টিসুম’ আর অতিরিক্ত ভাঁড়ামিতে ভরপুর ত্রুটিপূর্ণ অভিনয়, গোঁজামিলের গল্পই বা দেখবে কেন? সিনেমা হল মালিকদেরওতো পেট আছে। তারা রুটিরুজির জন্য নিশ্চয় সিনেমার পরিবর্তে দেশীয় যাত্রাপালা, নাটক চালাবেনা। আমি নাট্য, যাত্রাশিল্পকে খাঁটো করছিনা। শুধু অ্যাকশনটা পালটে দিচ্ছি।

তাই, ওই ৯৫ ভাগ সাধারণ দর্শক যা খেতে ভালোবাসে, তাই খাওয়াচ্ছে। এই যে আমরা আমাদের তৈরি দর্শক হারালাম, এই দায়টা আসলে কার, কেউ বলতে পারেন? সত্যিকথা বলতে, আশির দশকে এদেশ ভিএইচএস যুগে পদার্পণ করে। মানে ভিসিআর এ মুভি দেখা শুরু হয়। ভারতীয় হলিউড, বলিউড, টালিগঞ্জ- সব মুভি তখন আমাদের হাতের মুঠোয়। এমনকি লেটেস্ট ছবিগুলিও হরদম পাওয়া যেতো। বলাবাহুল্য, সেই সময় সংগীত নির্ভর চলচিত্রে টালিগঞ্জ ও বলিউডের সুদিন।

সেই স্রোত, আমাদের গায়ে এসেও লাগলো। আমরা বিয়ে, জন্মদিনে, পার্টিতে সুপারহিট, হিন্দি লেটেস্ট গানগুলি বাজাতে শুরু করলাম। এমনকি, ব্যান্ড পার্টির বাজনায়ও বলিউডি হিন্দি সুর ঢুকে গেল। কী ঈদ, কী পূজা- হিন্দি গান ছাড়া আনন্দই জমেনা।

এই স্রোতে গা ভাসালো ঢাকাই চলচিত্রও। হিন্দি বা তামিল সিনেমার হুবহু বা আংশিক অনুকরণ শুরু হলো। হিট হলো, ফ্লপ হলো। মধ্য নব্বুইয়ের দশকে সুপার ক্রেইজ সালমান শাহ এঁর মৃত্যুর পর, এক সময় খেই হারিয়ে বাংলাদেশি সিনেমা অন্ধকার যুগে প্রবেশ করলো। শুরু হলো সিনেমার নামে এরোটিক ড্রামা তৈরির যুগ।

এই যে পরাজয়, এর দায় কী শুধুই ওই ভিসিআর যন্ত্রটার অথবা ক্যাবল চ্যানেলের? যদি বলেন হ্যাঁ, তাহলে বলবো, এই যন্ত্র তখন খ্যাতিমান যেসব প্রযোজক, পরিচালকদের সংগ্রহে ছিলো, তারা কি স্পিলবার্গ, জেমস ক্যামেরুনের মুভি সেই আশির দশকে দেখেননি? তাহলে তারা সেখান থেকে ফ্লেভার নিলেন না কেন? আসলে অল্পবিদ্যা সবসময়েই ভয়ংকর।

মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরীরা কিন্তু টিভি অভিনেতা হয়েও, অল্প কয়টি সিনেমা দিয়ে অভিনয়ে তাদের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন। প্রমাণ, অতীতের পাবলিক রিঅ্যাকশনে। কিন্তু আফসোস, আজকে মানুষ মোশাররফ করিমকে নিয়ে তামাশা করে। অথচ তাঁরা গুণী অভিনেতা হয়েও, কেন ধারাবাহিক উপস্থিতি সিনেমায় রাখতে পারলেন না- এই দায় কী সম্পূর্ণই একজন মোশাররফ করিমের?

নির্মাতা, শিল্পী-কুশলীরা যদি আজকে এফডিসির রাজনীতি বাদ দিয়ে, নবীন প্রবীনদের সমন্বয় করে একটার পর একটা সুপার হিট মুভি দিতে পারতেন, নবীন ও শিক্ষিত তরুণদের অরাজনৈতিক, অহিংস মনে বেশি করে কাজের সুযোগ দিয়ে, সত্যিকারের শিল্পী মনের উদারতা দেখাতেন, যোগ্য লোককে সময়মত যোগ্য যায়গায় রাখতেন, যোগ্য গুরুর কাছে কাজ শিখে কাজে নামতেন- তাহলে আজকে আমাদের এই দিন দেখতে হতোনা।

কেউ বলতে পারবেন আজকের এফডিসি কী একটি স্বাধীন ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান? বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়, এর ভিতরে যতগুলো সমিতি আছে, রাজনৈতিক কোন্দল আছে- তা এই ধরণের একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিরল।

ফিরে আসি সিনেমার প্রসঙ্গে। কিছু অভ্যাসের পরিত্যাগ ও কিছু অভ্যাস নতুন করে যুক্ত করার সময় এসেছে।

. সিনেমা ভালো হোক বা কম ভালো, প্রযোজকের ভূমিকা সবকালেই অপরিসীম। সুতরাং, প্রযোজকের টাকা মেরে নিম্নমানের কাজ করার মনোভাব বন্ধ করতে হবে।

. কাজের প্রতি সততা ও দেশপ্রেম থাকতে হবে। ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে ডেডিকেশন বাড়াতে হবে। তাহলে নতুন নতুন মেধাবী মুখের দ্রুত আবির্ভাব হবে। যেটা বলিউডে হয়। হলিউডে হয়।

. নিজেদের ইন্ডাস্ট্রির স্বার্থে বিখ্যাত, অখ্যাত, সিনিয়র, জুনিয়র- সকলেই একজোট। প্রমাণ মেলে বিদেশী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তাদের টিভি নাটকে, সিনেমার বাজারে ভিড়তে দেওয়ার উদারতা দেখে। বলিউডের প্রিয়াঙ্কা চোপড়ারা চুটিয়ে কাজ করছেন হলিউডে। এমনকি আমাদের বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন গুণী অভিনেতা অভিনেত্রী, এডিটর, টেকনিশিয়ান, মেকআপ আর্টিস্ট, কস্টিউম ডিজাইনার সুনামের সাথে টালিগঞ্জ ও বলিউডের ক্লাসিক, কমার্শিয়াল ও হাইটেক চলচিত্রে নিয়মিত কাজ করার সুযোগ, তাদের মেধা দিয়ে আদায় করেছেন। বাংলাদেশের ছেলে, যে একজন এনিমেটর, সে হলিউডে এনিমেটেড মুভি তৈরিতে যুক্ত হচ্ছে।

. এই বিষয়গুলিকে গুলিকে সমালোচনা নয়, বরং ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে নেওয়ার মানসিকতা নিজেদের মধ্যে তৈরি করতে হবে।

. ব্যবসা বুঝতে হলে, প্রযুক্তি বুঝতে চাইলে এইটুকু উদারতা যদি আমরাও দেখাতে শিখি, সেটা কী নিন্দনীয় হবে? আমাদেরতো আজও কোন পরিপূর্ণ ফিল্ম ইন্সটিটিউট নেই যেখানে তরুণরা কাজ শিখতে পারে।

. যেখানে জ্যাকি চ্যানের মতো হলিউড জয়ী মানুষ ভারতে এসে ছবি বানাচ্ছেন, ব্যবসার স্বার্থে বলিউড থেকে আর্টিস্টও (মেইন কাস্ট) নিচ্ছেন, তাহলে আমাদের মনের পর্দাটা একটু সরাতে দোষ কোথায়?

অনেক ভেবেছি এসব নিয়ে। শেষে দেখতে পেলাম আমাদের দর্শনেই ভুল। শিল্পী, শিল্প, সিনেমা শিল্প- তিনটিতেই দর্শনে ঘাটতি রয়ে গেছে। চলচিত্র নির্মাণের পিছনে আমাদের ফিলোসফি কী? জানা নেই। তাই মৌলিক ও ভালো কিছু করার প্রয়াসও সীমিত। যারা পারেন, পারতেন তাদের অনেকেই বড় অসময়ে চলে গেছেন। আর যারা আছেন, তারা চলছেন গা বাঁচিয়ে।

কিন্তু, গাছ লাগালেই ফলের আশা করা অমূলক। গাছটি না কেটে, বরং আরও গাছ রোপণ করলে তার মধ্যে কিছু গাছ ফলদায়ক হবেই। সিনেমা নির্মাণের ধারাবাহিকতা, অদম্য স্পৃহাকে বাঁচিয়ে রাখাটাকেই এখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ার সময়।

মনে অনেক দুঃখ নিয়ে বলছি। আমাদের সিনেমার রঙিন দিনগুলি দেখেছি। শহরের পাঁচটি সিনেমা হলের মধ্যে একজোড়া সিনেমাহল বাড়ির পাশে। একটি বন্ধ হয়ে গেছে বোমা হামলার পরে। সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেই আগেকার জৌলুশ কল্পনায় ভেসে উঠে। হলের গেটের সামনে বেদম ভিড়। ফুচকাওয়ালার প্লেটের শব্দ, হকারদের হাঁকাহাঁকি, উচ্চশব্দে সুপারহিট গানের সাথে অভিজাত আলোক সজ্জা। সেসব দিন কী আর ফিরে পাবো?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।