কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া ঢাকার ঈদ

যুগে যুগে এই ঈদ উদযাপনে এসেছে নানান পরিবর্তন। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে এই উৎসবে যোগ হয়েছে নানা আনুষঙ্গিকতা, সেই সাথে কালের গর্ভে হারিয়েছে নানান আনুষ্ঠানিকতা।ব্যতিক্রম ছিলো না আমাদের ঢাকা শহরও।

সময়ের আবর্তনে এই শহর দেখেছে ঈদ উদযাপনের নানান রূপ। ঢাকা শহরে নানান সময়ের ঈদ উদযাপনের নানান উপাখ্যান তুলে ধরা হয়েছে আজকের এই আয়োজনে।

  • বাদশাহি আমলের ঈদ উদযাপন

ঢাকার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় এই ঢাকা শহরের ঈদ উদযাপনের ইতিহাস বহু পুরানো। সেই মোঘলদের আমল থেকে এই শহরে ঈদ উৎসব পালিত হচ্ছে। মোঘলদের আগমনের পূর্বে বাংলায় মুসলিমদের আনাগোনা যথেষ্ট কম ছিলো। কিন্তু ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খানের আমল থেকে এই বাংলায় মুসলমানদের আগমন বাড়তে থাকে।

সুবেদার ইসলাম খান বাংলায় আসার আগে থেকেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সামরিক বাহিনীর লোকজন সহ প্রায় ৫০হাজার মুসলিম নাগরিকের এই বাংলায় আগমন ঘটে। সেই সময় শুধু যে মোঘলরাই এসেছিল তা নয়,তাদের খেদমতের জন্যে বাংলায় এসেছিল আরো প্রায় হাজারখানেক ব্যবসায়ী সহ নানান শ্রেণী পেশার মানুষ।সেই সময় থেকেই আস্তে আস্তে এই ঢাকা শহর মুখরিত হতে থাকে হাজারো মুসলিম বান্দার পদছায়ায়।

তৎকালীন সময়ে ঢাকা শহরের বিস্তৃতি ছিলো বর্তমান ঢাকা কারাগার থেকে পাটুয়াটুলী বা সদরঘাট পর্যন্ত।পেশাজীবীদের আনাগোনা ছিলো তৎকালীন ঢাকা কেল্লা(বর্তমান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন এলাকা) এবং এর আশেপাশের এলাকাজুড়ে।

উনিশ শতকের শুরুর দিকের ছবি। হাতির পিঠে চড়ে নায়েব-নাযিমদের ঈদের মিছিল, শিল্পী আলম মুসাওয়ারের তুলিতে।

সেই সময়ের ঈদ উদযাপনের চিত্র ফুটে উঠেছিলো সুবেদার ইসলাম খানের সেনাপতি মীর্জা নাথানের বর্ণনায়। যদিও সেই সময় তিনি ছিলেন বোকাইনগরে কিন্তু তার বর্ণনা থেকে অনুমান করা যায় সেই সময়কার ঢাকার ঈদ উদযাপন কতোটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিলো।

দিল্লি থেকে আসা মোঘলরা ঈদ উদযাপনকে মোটেও হাল্কা ভাবে নেয়নি। দিল্লি থেকে এতদূর এসেও তারা এই বাংলার মাটিতে ঈদ উৎসবকে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা।

তখন সন্ধ্যে নামলে ঢাকা আলোকিত হত মোমবাতির আলোয়। শেষ রোজার সন্ধ্যাকাশে দেখা যেত একফালি ঈদের চাঁদ।সাথে সাথে খুশির জোয়ারে ভেসে উঠত সমগ্র নগরী। শিবিরে বেজে উঠত রণশিঙা,গোলন্দাজের গোলার মত বর্ষিত হত আতসবাজি। ঘরে ঘরে নেমে আসত এক অন্যরকম খুশির আমেজ। আর এই আমেজের রেশ থাকত মধ্যরাত পর্যন্ত।

ঈদ উদযাপনে মোঘল শাসকঘোষ্টীর যথেষ্ট মদদ থাকত। সেই সাথে রাজ্য বিজয় কিংবা যুদ্ধজয় ‘ঈদ’ উদযাপনে অন্যরকম এক মাত্রা যোগ করত। সেই আমলে ঈদ উদযাপন চলত দুই থেকে তিনদিন ধরে। নাচ,গান,বাদ্য আর হরেক রকমের রসনার উপস্থিতি ঈদকে করে তুলত সর্বস্তরের মানুষের প্রাণের উৎসব।

মোঘল কর্মচারী সাদিক ইসফানি তার এক লেখায় বলেছেন ‘সে সময়ে ঢাকায় অভিজাতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ অভিজাতদের পূর্ব পুরুষ এসেছিলেন শিরাজ, তেহরান, ইসফাহান, মাশহাদ, তাবরিজ এবং পোখারা থেকে।’

এ থেকেই বুঝা যায় সেই সময় মোঘলদের ঢাকা কতোটা আভিজাত্যপূর্ণ ছিল।

তবে এই আভিজাত্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল যখন মোঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র শাহ সুজাকে বাংলার সুবেদার তথা বাংলার শাসক করে পাঠান। সময়টা ১৬৩৯ সাল, শিয়া মতানুসারী শাহ সুজা আসলেন বাংলায়,সেই সাথে বাংলায় এলো শিয়া মতানুসারী প্রায় ৩০০ পরিবার। শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক ভাবে যথেষ্ট উন্নত শিয়াদের সংস্পর্শে এসে বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় লেগেছিল নতুন রঙের ছটা।

শাহ সুজা পরবর্তীকালে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে রাজমহলে স্থানান্তর করেন।কিন্তু ঢাকার উন্নয়নে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য তিনি দেখাননি।বড় কাটরা এবং বর্তমান ধানমণ্ডির সাত মসজিদ রোডের ইদগাহ শাহজাদা সুজা উদ্দিনের নির্দেশেই তৈরী হয়।১৬৪০ সালে তৈরী ইদগাহ মাঠে তখন থেকেই ঢাকার অভিজাতশ্রেণির লোকজন ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন।

তবে সাধারন নগরবাসীর এতে প্রবেশের অধিকার ছিলো না। জানিয়ে রাখা ভাল, ১৭২৮ খ্রিষ্টাব্দে, দ্বিতীয় মুর্শিদকুলী খানের আমলে মোঘলরা ত্রিপুরা দখল করে। সেই খুশিতে শাহ সুজার নির্দেশে ঢাকা কেল্লা হতে ইদগাহের রাস্তা প্রায় এক হাজার মুদ্রা দিয়ে সাজানো হয়েছিল।

তৎকালীন সময়ে মোঘলদের ব্যবসাবাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিলো বাদশাহি বাজার(বর্তমান চকবাজার)।বর্তমানে গুলশান বনানীর আলীশান শৌর্যও হার মানতে বাধ্য ছিল এই বাদশাহি বাজারের কাছে।সর্বস্তরের মানুষ এই বাজার থেকে তাদের বাজার সদাই করত।ঈদের মৌসুমে এই বাজারে বেচা কেনা বেড়ে যেত বহুগুন।

উনিশ শতকের শুরুতে, ঢাকার চকবাজারে। শিল্পীর তুলিতে আঁকা।

তবে এই কথা অনস্বীকার্য, সেই সময়কার ঈদ উদযাপনে সাধারণ ঢাকাবাসীর উপস্থিতি নেই বললেই চলত।দিল্লীর মসনদের শাহেনশাহ মোঘলদের জাঁকজমকপূর্ণ ঈদ উদযাপনের পাশে ঢাকার সাধারন জনগনের ‘ঈদ’ উদযাপনে ছিল বিশাল ফারাক।

  • ইংরেজ শাসনামলে ঈদ উদযাপন

নবাবী আমলের প্রথম ধাক্কাটা আসে যেদিন ইংরেজরা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজস্ব আদায়ের অনুমতি লাভ করে। এর আগে থেকেই মোঘলদের অবস্থার অবনতি হতে থাকে। দিল্লির দরবারে সিংহাসন আরোহনের কূটচাল, বিদেশি ব্যবসায়ীদের বাড়ন্ত আধিপত্য আস্তে আস্তে মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের নিশানা উড়িয়ে দিয়েছিল।

মোঘলদের এমন খারাপ দিনে তাদের নায়েব-নাযিমদের পৃষ্ঠপোষকতায় ভালোই উৎসাহ উদ্দীপনীয় পালিত হত ‘ঈদ’।কিন্তু রাজস্ব আদায়ের অধিকার হারিয়ে নায়েব-নাযিমেরাও হয়ে উঠে আর্থিকভাবে দুর্বল। এরপরেও ঈদের রেশ খুব একটা কমেনি। ঢাকার নায়েব-নাযিমেরা শিয়া মতানুসারী ছিল বিধায় তখনো অত্যন্ত জাঁকজমক ভাবে মহরমের মিছিল এবং ঈদের মিছিল বের হোত।

বাদ্য,রঙ বেরঙের টুপি কিংবা ছাতা হাতে মিছিলে যোগ দিত নগরবাসী। সাধারণ ঢাকাবাসী এতে অংশগ্রহণ করলেও, অভিজাত শ্রেণীর উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মত। এই মিছিলে মুসলিম সম্প্রদায় ছাড়াও অংশ নিত নানা শ্রেণীপেশার মানুষ,থাকত ইউরোপীয়সহ নানা বিদেশি ব্যবসায়ীরাও। হাকিম হাবিবুর রহমান, প্রখ্যাত নাট্যকার সাঈদ আহমেদ, আশরাফ-উজ-জামানদের স্মৃতিকথায় গত শতকের বিশ-ত্রিশ দশকেও ঢাকায় যে ঈদের মিছিল বের হত তার বিবরণ পাওয়া যায়।

  • দেশভাগ পরবর্তী সময়ে ঢাকার ঈদ উদযাপন

গত শতকের ৪০ এর দশকে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন নতুন রূপ পায়।সেই সাথে ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ নীতির কারনে সৃষ্ট বৈরী হাওয়ায় দাঙা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে ফলস্বরূপ বন্ধ থাকে ঈদ মিছিলের মত নানান আনুষঙ্গিকতা।

পরিবারের সাথে নবাব সলিমুল্লাহর ঈদ

সেই সময় মোঘল মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত ছাড়াও উদ্ভব ঘটে এক নতুন মুসলিম সম্প্রদায়ের। আধুনিক শিক্ষাদীক্ষায় দীক্ষিত এই নব্য মুসলিম সম্প্রদায় কিন্তু ঢাকার অধিবাসী নন। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা বিভিন্ন কারণে এরা বাংলার নানা অঞ্চল থেকে এসে ঢাকায় স্থায়ী হয়েছে। এদের বেশিরভাগই এসেছে পল্লী অঞ্চল থেকে। যার কারণে এদের ‘ঈদ’ উদযাপন ছিলো যথেষ্ট গ্রামীণ। ঈদের দিন পিঠা, পুলি, সেমাইয়ের আয়োজন কিংবা ঢাকার বুকে ঈদ উপলক্ষে মেলা বসা প্রমাণ করে ঢাকায় সেই সময় তাদের কতোটা প্রভাব ছিল।

মুন্সী রহমান আলী তায়েশ তার ‘তাওরারিখে ঢাকা’ বইয়ে লিখেছেন, ‘উনিশ শতকের শেষের দিকে ঢাকার মুসলমানরা (তখন সম্ভবত প্রায় সব শ্রেণির মুসলমান একসঙ্গেই যোগ দিতেন) ধানমন্ডির মোঘল ঈদগাহে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে। যদিও সে ঈদগাহ তখন অযত্ন অবহেলায় জরাজীর্ণ ও জঙ্গলাকীর্ণ।’

তারপরেও তায়েশের বর্ণনার উল্লেখযোগ্য অংশটি হচ্ছে, ‘ঈদ উপলক্ষে এখানে মেলা হত, সেখানে যোগ দিতেন ঢাকা ও আশপাশের এলাকার লোকজন।’

এই থেকে প্রমাণিত হয় সেই সময় এই মেলার বিস্তৃতি শুধু ঢাকার চকবাজারের আশে পাশেই সীমাবদ্ধ ছিলো না ছড়িয়ে পড়েছিল ঢাকার আশেপাশের এলাকাজুড়েও।

এতো গেলো ঢাকার সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঈদ উদযাপন। সেই সময়কার অভিজাতশ্রেণীর ঢাকাবাসীর ঈদ উদযাপনে এসেছিল আমূল পরিবর্তন। মোঘল ঐতিহ্যকে ধারন করা এই অভিজাতশ্রেনির ঈদ উদযাপনে ছিল কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিক। আশির দশকে সেলাই মেশিনের প্রচলন শুরু হলেও তারা হাতে সেলাইয়ের কাপড়কেই বেশি প্রাধান্য দিত। ঈদ উৎসবে তাদের ঘরে পরিবেশিত হত তোরাবন্দি খাবার। সর্বমোট চল্লিশ রকমের খাবার থাকত এই তোরাবন্দিতে। অর্থনৈতিক কারণে এ তোরাবন্দি খাবার কালক্রমে ‘নিম তোরাবন্দি’ বা ‘অর্ধেক তোরাবন্দি’তে পরিণত হয়ে গত শতাব্দীর বিশ দশকের দিকে এসে বিলুপ্ত হয়ে যায়

ঢাকার নবাব বাড়িতেও ঈদ উদযাপনে তখনো আভিজাতিকচিহ্ন ভালোই বজায় ছিল। সন্ধ্যাবেলায় নাচ গানের আসর বসাতো হিজরার দল। আলোক সজ্জায় আলোকিত হত পুরো আহসান মঞ্জিল।

নিমতলী প্রাসাদ থেকে বের হয়ে ঈদ মিছিলে অংশ নেওয়া মানুষ।

গত ত্রিশ দশকে ঢাকা শহরে ঈদ উদযাপনে এসেছে যথেষ্ট পরিবর্তন। ঢাকায় জাদুঘর হল,রমনা পার্ক কিংবা জিয়া শিশুউদ্যোন এর উদ্ভব হল। মোড়ে মোড়ে সিনেমা হলের রূপালী পর্দায় রাজ্জাক শাবানার রাজত্ব করতে শুরু করল। আর এইসব কিছুই ঈদ উদযাপনে যুক্ত করল নিত্য নতুন আনুষঙ্গিকতা। ঈদ উপলক্ষে গ্রাম থেকে মানুষ ঢাকায় বেড়াতে আসতে লাগল। সদরঘাটের কালু খাঁ কামান, হোসনি দালান, ফরাশগঞ্জের লোহারপুল, হাতিরপুল, রমনার রেসকোর্স, লালবাগের কেল্লা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা এইসব জায়গা হয়ে উঠল তাদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ঈদ মানে আনন্দ, এ আনন্দ বিশ্বাসের, এ আনন্দ তাকওয়া অর্জনের এবং ইহলৌকিক ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি ও পারলৌকিক মুক্তির। সুতরাং ঈদকে ঘিরে সকল উৎসবকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে,পরিবর্তনকে মেনে নিতে হব্রম্ল আবহমানকাল থেকে হয়ে আসা চিত্ররূপ হিসেবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ঈদ উদযাপনের চিত্র আজো নদীর গতিপথের মত চির পরিবর্তনশীল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।