গন্তব্য ‘সাকিব আল হাসান’

সাকিব আল হাসান কে বা কী? সে একজন এন্টারটেইনার। হুমায়ূন আহমেদ, জেমস, সালমান শাহ, মোনেম মুন্না, মমতাজ, আসিফ আকবর, এরাও তো এন্টারটেইনার। কিংবা জামাল ভূইয়া, জিমি এদেরও এন্টারটেইনার বলা উচিত।

কিংবা সাকিব আল হাসান যদি আতহার আলি খান বা মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর যুগে ক্রিকেট খেলতেন, তখনো কি এই প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হতো, সাকিব আল হাসান কে?

অন্যান্য এন্টারটেইনার যাদের নাম বললাম তাদের এন্টারটেইনমেন্টের প্রধান সম্ভাবনা এবং সীমাবদ্ধতা উভয়ই ভাষা, নির্দিষ্ট ভাষার জনগোষ্ঠীর বাইরে তাদের আবেদন বা গ্রহণযোগ্যতা সেভাবে তৈরি হয়নি। ফুটবল বা হকির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সাফল্য না থাকায় এমনকি বাংলাদেশেও এই খেলাগুলোর পারফরমাররা সার্বজনীন এন্টারটেইনার হয়ে উঠতে পারেনি।

ক্রিকেট খেলে বলেই সাকিব স্পেশাল এন্টারটেইনার এমনটা বললে তার শ্রম আর সংকল্পের ডায়নামিক্সটা অবোধ্য থেকে যাবে।

সাকিব যখন ক্যারিয়ার শুরু করেছিল তখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট হামাগুড়ি দেয়া দশা পার করছিলো। টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হারা নিয়মিত ঘটনা, ওয়ানডেতে ২০০ করতে পারলেই সমর্থকেরা খুশি ( মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত, শ্রীলংকাকে হারালেও সেগুলো নিছকই বিচ্ছিন্ন ঘটনা); ক্যারিয়ারের দুই-তৃতীয়াংশ পার করার পরে বাংলাদেশ এখন দেশের মাটিতে টেস্টে জিততে শুরু করেছে; ওয়ানডেতে, অস্ট্রেলিয়া বাদে, সব দলকেই একাধিকবার হারিয়েছে বা যে কোনো দলকে হারালেও সেটা অঘটন হিসেবে দেখা হয় না, নব্য সংস্করণ টি-টোয়েন্টিতে এখনো পায়ের নিচে মাটি খুঁজছে। অর্থাৎ হামাগুড়ি থেকে সবে হাঁটতে শুরু করেছে ( তবে খুব ভালোমতো হাঁটা রপ্ত করতে পারেনি, এদিক-সেদিক হলেই হোঁচট খায়)।

তবে একক ক্রিকেটার হিসেবে সাকিব নিজেকে ইতোমধ্যেই গ্রেটদের কাতারে নিয়ে গেছে। পরিসংখ্যান অনেকদিন আগেই গ্রেটনেসের সাক্ষ্য দিলেও বড়ো মঞ্চে পারফরম্যান্সের অভাবে যথাযথ স্বীকৃতির ক্ষেত্রে ক্রিকেট মিডিয়ায় উন্নাসিকতা ছিল, তাকে ছোট দলের ভালো খেলোয়াড় হিসেবেই মূল্যায়ন করা হতো। ২০১৯ বিশ্বকাপের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর সেই উন্নাসিকতাও চলে গেছে।

ফলে কোনো সংশয় ছাড়াই বলা যায় সাকিব বাংলাদেশের একমাত্র গ্লোবাল এন্টারটেইনার। গ্লোবাল পারসোনালিটি বাংলাদেশে অনেকেই আছেন, ভবিষ্যতেও হবেন, কিন্তু এন্টারটেইনার একজনই।

প্রশ্ন হলো সাকিব এমনটা পারলো কীভাবে?

সাকিবের ক্রিকেটিয় বিষয়-আশয় নিয়ে বিস্তারিত নিবন্ধ ২ বছর আগেই লিখেছি, তবু সাকিবকেন্দ্রিক আলোচনায় ক্রিকেট না এসে পারে না। তবে এই লেখায় ক্রিকেটের টেকনিকাল প্রসঙ্গ নয়, সাকিবের ‘পেশা ক্রিকেট’টাই প্রাধান্য পাবে। এবং সাকিবের মনোজগত বুঝবার একটি আংশিক চেষ্টা চালানো হতে পারে।

বস্তুজগতে সাকিবের সাথে আমার ৫০ মিটার দূরত্বেও দেখা হয়নি কখনো, কথা হওয়ার প্রসঙ্গ বাতুলতা। সাকিব সংক্রান্ত ইমপ্রেসনের ভিত্তি মাঠে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন সাক্ষাৎকার, সংবাদ, বক্তব্য, ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত কয়েকজন ক্রিকেট সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা এইসব। আমার রিসার্চ পরিচালিত হয় দুটো প্রক্রিয়ার সংযোগে- দীর্ঘমেয়াদী আলাপ এবং পর্যবেক্ষণ। দুটোকে সম্মিলিত করে প্যাটার্ন আবিষ্কার করি।

সাকিবের ক্ষেত্রে একটাও প্রয়োগ করার সুযোগ ঘটেনি, পর্যবেক্ষণের যাবতীয় ইমপ্রেসনাল ডেটা সেকেন্ডারি উৎস থেকে সংগৃহীত। পুরোপুরি অনুমাননির্ভর এই হাইপোথিসিস থেকে যে সাকিব কে প্রতিকৃত করা হবে সেটা মূল সাকিবের চাইতে পুরোপুরি আলাদা কোনো ব্যক্তিসত্তা হয়ে উঠার সম্ভাবনাকে নাকচ করা যাচ্ছে না।

সাকিবের পারসোনালিটি ট্রেইট সম্ভবত INTP(introverted-intuitive- thinking-perceiving; গুগলে INTP লিখে সার্চ দিলে বিস্তারিত জানা যাবে)

এই ট্রেইটের মানুষদের অন্যতম দুর্বলতা আন্তঃমানবিক যোগাযোগ, অর্থাৎ মানুষের অনুভূতিকে তারা বুঝতে চায় না বা পারে না, যে কারণে তাদের কথা বা আচরণে অন্য মানুষেরা আঘাত পাচ্ছে কিনা এটা তাদের বিবেচনায় থাকে না, তারা অনেকটাই সেল্ফ-অবসেসড প্রকৃতির।

পারসোনালিটি ট্রেইটের দোহাই দিয়ে খুব সহজেই সাকিবের চিন্তাপ্রক্রিয়াকে ডিফেন্ড করা যায়, তাই না?

একদমই নয়। একই পারসোনালিটি ট্রেইটের হওয়া সত্ত্বেও দুজন মানুষের চিন্তাপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী হতে পারে, নির্ভর করছে তার বিল্ড আপ প্রসেস এবং জীবনে সে কোন প্রকৃতির মানুষের সংস্পর্শে বেশি এসেছে সেই নিয়ামকের উপর।

সাকিব প্রসঙ্গে আরো কথা হবে, তার পূর্বে অন্য একটি পয়েন্টে কিঞ্চিত শব্দ ব্যয় করি। সেই আলশাহরিয়ার রোকন থেকে শুরু করে সর্বশেষ লিটন দাস পর্যন্ত অজস্র ক্রিকেটার প্রতিভাবান তকমা নিয়ে এসেছে, তারপর হারিয়ে গেছে; তাদের নিয়ে আক্ষেপপূর্ণ লেখা চোখে পড়ে। সাকিব হারালো না কেন?

তথাকথিত প্রতিভাদের হারানোর কারণ দুটো। প্রথমত, ঘরোয়াতে বা বয়সভিত্তিক দলে যে মানের ক্রিকেট খেলে তারা নজর কাড়ে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেটে টিকতে হলে সেই মানকে আরো উপরে উঠানোর চেষ্টা করতে হয়, নইলে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার জন্য মিরাকলের অপেক্ষায় থাকতে হয়। আমাদের অধিকাংশ প্রতিভাবানরা মিরাকলের ভরসায় খেলতে নামে। দ্বিতীয়ত, অল্প বয়সে পাওয়া নাম-যশ এর প্রভাবে অসৎ সঙ্গের প্রাচুর্য দেখা দেয়, যার কারণে ইনজুরি বাড়ে অথবা ফিটনেসে সমস্যা দেখা দেয়।

সাকিবকে বাঁচিয়ে দিয়েছে নির্মোহ আত্মসমালোচনা। সে নিজের সামর্থ্য এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন। প্রথম আলোর এক সাক্ষাৎকারে সে বলেছিল, ‘আমি জানি চাইলেই আজমল বা নারাইনের মতো বোলিং করে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারবো না, তবে চেষ্টা করলে একটা ভালো ওভার করে রান আটকে দিতে পারবো।’ বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের ফিটনেস সমস্যার প্রধান কারণ যে খাদ্যাভ্যাস এটা সে-ই প্রথম বলেছিল, কিন্তু তার কথাগুলোকে মেহনতি জনতা ‘জুস-তত্ত্ব’ বানিয়ে ট্রল করেছিল।।

বুঝলাম সাকিব আত্মসমালোচনা করতে পেরেছে বলে হারিয়ে যায়নি, কিন্তু সারা ক্যারিয়ারেই বড়ো কোনো ব্যাডপ্যাচে পড়লো না কেন?

এর মূল কারণ তার মানসিক গঠন। মিডিয়াতে সে বহুবার বলেছে ১ রানে হার আর ১০০ রানে হার একই কথা, কিংবা এবার বিশ্বকাপ শেষেও সে বলেছে, ‘আমরা ভালো খেলতে নয়, জিততে এসেছিলাম।’

দুটো স্টেটমেন্টই আদতে এক। বাংলাদেশের ক্রিকেট সাংবাদিক এবং দর্শকদের কল্যাণে আমরা আরো একটা শব্দ প্রায়ই শুনি ‘দায়িত্ব নিয়ে খেলা’, এই কথার এন্টারপ্রেটেশন হলো ক্রমাগত সিঙ্গেলস খেলো, উচ্চভিলাষী শট এড়িয়ে চলো। বাংলাদেশের অন্য ব্যাটসম্যানদের এন্টারপ্রেটেশন হলো ক্রমাগত ডট বল খেলা। কিন্তু ১ উইকেট আর ৯ উইকেট পড়ুক, সাকিব তার খেলার স্টাইল কখনোই বদলায় না; দিনের শেষ বলে আউট হওয়ার দৃষ্টান্তও আছে তার, সমালোচিত হতে হয়েছে, মাঝখানে একটা আর্টিকেল ভাইরাল হয়েছিল ‘Who needs this Shakib?’, কিংবা প্রথম আলোতেও প্রাক্তন অধিনায়কদের মতামত ছাপা হয়েছে ‘সাকিবের বিকল্প ভাবার সময় এসেছে’, তবু সে নিজেকে বদলায়নি।

নিজস্বতা বোধ এবং তার প্রতি প্রচণ্ড আস্থা এটাই অন্য যে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটারের চাইতে তাকে ভিন্ন বানিয়েছে। নিজস্বতা বোধের কারণে বহু ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সে আউট হয়ে গিয়েছে, খুব কম ক্ষেত্রেই ম্যাচ শেষ করে আসতে পেরেছে; তাহলে হয়তোবা পরিসংখ্যান আরো সমৃদ্ধ হতে পারতো, কিন্তু পরিসংখ্যান নিয়ে সে ভাবেনি, কিংবা গ্রেট ক্রিকেটারও হয়তোবা হতে চায়নি, সে খেলাটা উপভোগ করতে চেয়েছে মাত্র।

এই জায়গায় সম্ভবত পৃথিবীর অধিকাংশ ক্রিকেটারের চাইতেই সে আলাদা। অন্য ক্রিকেটাররা খেলে দর্শককে আনন্দ দেয়ার জন্য, সে খেলে নিজে আনন্দ পাওয়ার জন্য। বাংলাদেশে সে-ই একমাত্র ক্রিকেটার যে ইনজুরি না থাকলেও নিজ থেকে ছুটি নেয়, কারণ একটানা খেললে সেটা আনন্দের বদলে একঘেয়ে হয়ে উঠে। এবং নিজে না খেললে একটানা টিভির সামনে বসে বাংলাদেশের খেলাও দেখে না সচরাচর।

নিজের আনন্দ প্রাধান্য পেলে যেটা হয়, পৃথিবীর অন্য মানুষের ব্যাপারে আগ্রহ বা কৌতূহল জাগে না, যোগাযোগগুলো হয় স্বার্থ কিংবা প্রয়োজনের তাগিদে। যে কারণে সাকিব একজন নির্বান্ধব মানুষ হওয়ার কথা। অনেকের সাথেই হয়তোবা বন্ধুত্ব আছে, ঘনিষ্ঠতাও থাকতে পারে, কিন্তু একেবারে অন্তরাত্মা বলতে যেমনটি বোঝায় সেরকম বন্ধু হয়তোবা একজনও নেই তার।

যেহেতু সে ব্যক্তিগত আনন্দের জন্য খেলে, প্রচুর পরিমাণে প্র্যাঝকটিস করাটা সেই শর্তের মধ্যে পড়ে না। প্র্যাতকটিস মানে রুটিন, অনেকটাই প্রাত্যহিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে যায়। বাংলাদেশ দলে খেলার জন্য সে পর্যাপ্ত চ্যালেঞ্জ বা প্রতিদ্বন্দ্বীতা বোধ করে না। যদি তার প্রজন্মে আরো ১ বা ২ জন তারই মতো ধারাবাহিক হতো, কিংবা গ্লোবালি খেলার সুযোগ পেত, তখন তার মধ্যে নিশ্চিতভাবেই চ্যালেঞ্জ জাগতো। একে আমরা মহাভারতের কর্ণ-অর্জুন কমপ্লেক্স হিসেবে দেখতে পারি।

২০১৫ এর পরে তামিম আর মুশফিক বাংলাদেশের মানদণ্ডে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ক্রিকেটার কে এই প্রশ্নে তারা কখনোই সাকিবের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। এবারের আইপিএল আসরে তাকে যদি প্রায় পুরো সময় বসিয়ে না রাখতো, তার মধ্যে সেই চ্যালেঞ্জহীনতার অভ্যাসটাই রয়ে যেত। কিন্তু সামান্য একটা টি-টোয়েন্টি লিগেও বসে থাকতে হয়, এটা তার অহমে মারাত্মকভাবে আঘাত করেছিল, সেখান থেকেই তার এমন জেগে উঠা।

আপনি সাকিবের ব্যক্তিত্ব নিয়ে প্রশংসা-নিন্দা যা-ই করেন, তার বিশেষ ভাবান্তর ঘটবে না, কারণ আপনাকে সে যথেষ্ট আমলে নেয়ার মতো যোগ্য মনে করে না। এটা আপনার জন্য বিব্রতকর সত্য, সিম্পলি সে আপনাকে নিজের লেভেলের চাইতে অনেক নিচের কেউ হিসেবে দেখে, আপনার সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক। এটা মেনে নেয়া কষ্টকর, কিন্তু না মানলে মুড়ি খাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় অপশনও বরাদ্দ নেই।

কিন্তু যদি যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন সাকিব আসলে অর্ডিনারি ক্রিকেটার, সেটা তাকে তাতিয়ে দিবে। নাও দিতে পারে যদি জানা যায় আপনি ক্রিকেটের বড়ো কোন নাম বা প্রতিষ্ঠান নন।

অর্থাৎ সে এলিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নতা পছন্দ করে, মানুষের ব্যাপারে সিলেক্টিভ, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারো ব্যাপারে উচ্চধারণা পোষণ করে না, মানুষকে নেগেটিভ দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করে। লেখক মার্ক টোয়েন একবার বলেছিলেন, মানুষকে যত দেখি কুকুর তত বেশি প্রিয় হয়ে উঠে আমার। সাকিব অতি অবশ্যই এতোটা সাহিত্যানুরাগী নয় যে মার্ক টোয়েনের উক্তিটা জানা আছে, তবে মানুষের ব্যাপারে তার সামগ্রীক মূল্যায়নের মূল থিম মার্ক টোয়েনের চাইতে খুব গ্রেটার স্কেলে আলাদা কিছু নয় হয়তোবা।

তার বিচ্ছিন্নতাপিয়াসের কারণ কী হতে পারে?

এর সঙ্গে নার্সিসিজম এবং এম্বিশনের যৌথ যোগাযোগ থাকতে পারে।সে যেখানে বড়ো হয়েছে সেখানে তার চিন্তাধারার কাউকে পায়নি, যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে সেটা নেহায়েতই সামাজিকতার সূত্রে এবং তারা যে যোগ্যতায় তার চাইতে পিছিয়ে সেটা সচেতনভাবে মাথায় রেখেই। যে কারণে একাকীত্ব তার ব্যক্তিত্বেরই অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। একাকীত্ব মানুষের মধ্যে নানা ধরনের রোমান্টিসিজমের জন্ম দেয়, অসংখ্য ফ্যান্টাসিরও সৃষ্টি করে। ফলে সাকিবের যদি সেলফ-কনভারসেশনের অভ্যাস থাকে তাতে অবাক হবো না।

সাকিবদের বয়সভিত্তিক দলের কোচ ছিলেন রিচার্ড ম্যাকিন্স। অবচেতনভাবেই সেই ভদ্রলোক সাকিবের মনোজগতে প্রভাব ফেলেছে হয়তো। সাকিব যখন তার সংস্পর্শে আসে তার বয়স ছিল ১৬-১৭, দৃষ্টির সীমা তখনো প্রসারিত হয়নি, অস্ট্রেলিয়া তখন ক্রিকেটের একচ্ছত্র অধিপতি, সেখানকার একজন মানুষের সান্নিধ্য – ডটগুলো যোগ করলে সাকিবের মানসিক গঠনের রূপান্তরক্রম বুঝতে পারার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

কিশোর সাকিব তখন বাংলাদেশ নয়, অস্ট্রেলিয়ার অবসেসনে ঢুকে পড়েছিলো, যেটা তার আচরণে ঢুকে পড়ে একসময়। জেমি সিডন্স যখন কোচ হয়ে আসেন, তার বয়স ২৫ এর নিচে, জাতীয় দলে অভিষেক হয়ে গেছে, পারফরম্যান্সেও ধারাবাহিকতা চলছে। ম্যাকিন্সের মতো সিডন্স তাকে অত বেশি প্রভাবিত করতে পেরেছে কিনা অনুমান করা যাচ্ছে না, তবে তার অস্ট্রেলিয়ান ব্যাকগ্রাউন্ড সাকিবকে কালচারাল মিসম্যাচ অনুভূতির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। সে চিন্তা করছে অস্ট্রেলিয়ান প্যাটার্নে, কিন্তু শারীরিকভাবে বিচরণ করছে বাংলাদেশে; এখান থেকে তার মধ্যে কনফ্লিক্ট তৈরি করে থাকতে পারে। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সম্ভবত সে জাতীয় দলে ঢোকার পর থেকেই আর গোনায় ধরেনি, অস্ট্রেলিয়ান রোমান্টিসিজমে সে নিজেকে তাদের মানদণ্ডে দেখতে চেয়েছে।

তামিম বা মুশফিকের মধ্যে সেই রোমান্টিসিজম কেন গড়ে উঠলো না, বা রকিবুল, জুনায়েদ সিদ্দিকীদের কেন প্রভাবিত করলো না?

এর অন্যতম কারণ তারা ইউনিকনেস ইলিউশনে ভুগেনি, চারপাশে যা দেখছে তার সাথে অ্যাডজাস্ট করে নিতে বা সামান্য ভালো থাকতে পেরেই খুশি হয়েছে।

ইউনিকনেস ইলিউশনে ভোগার ক্ষেত্রে অ্যারোগেন্স এবং জিদ এই দুটো বৈশিষ্ট্য লাগে। আমাদের সমাজে এরোগেন্স আর অহংকারকে গুলিয়ে ফেলা হয়। অহংকার হলো কোনো গুণ বা বৈশিষ্ট্যের কারণে ‘I’m better than you attitude’, পক্ষান্তরে অ্যারোগেন্সের বাংলা ঔদ্ধত্য, যার মানে হলো আপনি আমার বড়ো-ছোট-মুরুব্বি যে-ই হোন, আপনি কিছু বললেই তা বেদবাক্য হিসেবে মেনে নিবো না যদি তা আমাকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হয়।

ইউনিকনেস ইলিউশনের সাথে অ্যাম্বিশন যুক্ত হলে সেই মানুষ তার সময়কে জয় বা অতিক্রম করবেই। এম্বিশন মানুষকে একই সাথে বেপরোয়া, ফোকাসড এবং স্বার্থপর বানিয়ে তোলে। যার এম্বিশন যত বড়ো মানুষ হিসেবে সে তত নিঃসঙ্গ এবং প্রতিক্রিয়াশীল। এধরনের মানুষ নিজের মনমতো কিছু না হলে, প্রত্যাশা থেকে সামান্য বিচ্যুতিতেও ভয়ানক প্রতিক্রিয়া দেখায়। তাই অধিনায়ক সাকিব যখন সহখেলোয়াড়ের মিসফিল্ডিংয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ করে বা আউট হলে ব্যাট দিয়ে স্ট্যাম্পে আঘাত করে, বা আম্পায়ারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে দলের ব্যাটসম্যানকে মাঠ থেকে উঠে আসতে বলে, এম্বিশন তত্ত্ব দিয়ে তাকে খুব সহজে ব্যাখ্যা করা যায়।

কিংবা নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারটিকেও এম্বিশনের প্রতিফলন হিসেবেই দেখতে পারি। এমন একজনকে বাছাই করেছে যে আমেরিকান নাগরিকত্ব প্রাপ্ত। ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার স্বল্পসময়ের সেই বোধ তার ভালোমতোই কাজ করে, ফর্ম পড়ে গেলে আরো আগেই ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে; তারপরে কী?

সেই ‘কী’ এর উত্তর হিসেবেই কখনো রেস্টুরেন্ট চালু করে, কখনোবা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানী খুলে, এবং বাংলাদেশ যেরকম রাজনৈতিকভাবে আস্থিতিশীল একটি দেশ, ইমিগ্রেশনের সুযোগটা অপশন হিসেবে রাখা যেতেই পারে।

এবং অ্যাম্বিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ক্ষমতা। মাশরাফির সাথে সাথে সেও যে নির্বাচনে আগ্রহী ছিল তা প্রমাণিত ফ্যাক্ট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পিএসের আসন এবং এখনো ক্যারিয়ার বেশ খানিকটা বাকি আছে, দুটো ফ্যাক্টর মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাকে নমিনেশন না দেয়ার কারণেই মূলত ক্ষমতার ভাগবন্টন থেকে তার সরে পড়া। তবে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী ৪ বছরেও যদি একই রকম থাকে, ২০২৩-২৪ এর নির্বাচনে সাকিবকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে দেখার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, যদি ইত্যবসরে ইনজুরি বা ফর্মহীনতার কারণে সে খেলা থেকে ছিটকে না পড়ে।

তবে এম্বিশন প্রশ্নে সাকিবকে ক্রিটিকালি দেখলেও প্রফেশনালিজমের প্রশ্নে তার ধারেকাছে আসার মতো ক্রিকেটার বাংলাদেশে কখনোই আসেনি। তার পেশাদারিত্ব বাংলাদেশের কালচারে কিছুটা মিসফিটের মতো। পেশাদারিত্বের সংজ্ঞা হলো, আপনি যে কাজটি করছেন তার প্রতি শতভাগ কমিটেড থাকবেন, কাজটির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, কোয়ালিটি ইমপ্রুভে সচেষ্ট থাকবেন এবং অতি অবশ্যই তার একটি বিনিময়মূল্য রাখবেন।

যেখানে বিনিময়মূল্য নেই সেটা চ্যারিটি অথবা অ্যামেচার কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতিতেই, বিনামূল্যে কাজ করাটাকে প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখা হয়। এর একটি ব্যক্তিগত এন্টারপ্রেটেশন আছে আমার। আমরা যারা উপার্জন করি তাদের উল্লেখযোগ্য অংশের উপার্জনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা কিছুটা হলেও প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, বিনামূল্যে কাজ করাটা প্রশ্নমুক্তির একটি দাওয়াই হয় অনেক সময়।

সাকিবকে মাঠে কখনো ক্যাজুয়াল দেখবেন না আপনি, সে ক্যাচ মিস বা মিস ফিল্ডিং করলে নিজের প্রতি যে ক্ষোভটা প্রদর্শন করে সেটা প্রফেশনালিজম থেকে আসে। এবং সে যে টাকা ছাড়া কোনো কাজ করে না বলে অভিযোগ শুনি সেটাও পেশাদারিত্বেরই পরাকাষ্ঠা, কারণ যতদিন দলে আছে, ফর্ম আছে, ডিমান্ড আছে; ফর্ম ফুরিয়ে গেলে সে নিজে দারে দারে ঘুরেও তো কাজ ম্যানেজ করতে পারবে না। এই বোধ তার অন্যদের চাইতে বেশি সক্রিয়।

কথা বা গল্প করার জন্য সাকিব অত্যন্ত ভয়ানক ব্যক্তিত্ব হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আপনি তার প্রতি প্রচণ্ড ফ্যাসিনেটেড, তার সাথে দেখা করতে গেছেন খুব যত্ন করে কেনা উপহার নিয়ে; সে আপনার উপহারটি হয়তোবা খুলেও দেখবে না, এবং ২-৩ মিনিট কথা বলে ঝট করে আপনাকে বিদায়ও করে দিতে পারে। কিংবা আপনার কথা বা আচরণে বিরক্ত লাগলে মুখের ওপর কটূ কথাও শুনিয়ে দিতে পারে।

আপনি তাতে প্রচণ্ড মর্মাহত হবেন, কিন্তু সাকিবের পয়েন্ট অব ভিউতে আপনি একজন ন্যাকা প্রকৃতির মানুষ, যিনি তার সাথে দেখা করতে গেছেন পরিচিত পরিমণ্ডলে গল্প করার উদ্দেশ্যে, এবং ২ ম্যাচে খারাপ খেললে এই আপনিই সর্বপ্রথমে তাকে গালি দিবেন। মানুষের হিপোক্রেসির লেভেল নিয়ে তার পর্যাপ্ত গবেষণা রয়েছে।

সাকিব কি মুগ্ধ হয় না?

যখন দেখে কেউ তাকে পারফরম্যান্স দিয়ে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তার চাইতেও কেউ ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে। কিংবা ক্রিকেটের বাইরের জীবনে তার কোনো প্রয়োজন কেউ পূরণ করে দিচ্ছে সেটা হয়তোবা তাকে মুগ্ধ করে।

মানুষকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার প্যারামিটার মাত্র দুটো- প্রথমত, মেধা বা যোগ্যতা। দ্বিতীয়ত, নৈপুণ্য। এর বাইরে আবেগ, অনুভূতি, যোগাযোগ সবকিছুই গড়পড়তা মানুষের বৈশিষ্ট্য।

মাশরাফি যতোটা মিডিয়াবান্ধব, সাকিব ততটাই মিডিয়াবিমুখ। দুজনের উদ্দেশ্য এক, কেবল প্রসেস ভিন্ন। মাশরাফির মতে, মিডিয়াই পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি করে, সুতরাং এর সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

সাকিবের মতে, ক্রিকেটার আছে বলেই মিডিয়া কিছু করে খাচ্ছে। মিডিয়াকে যত বেশি এড়ানো যাবে তারা তত বেশি পিছু পিছু ঘুরবে, এটাও একধরনের গল্প তৈরি করবে। পারফরম্যান্স যতদিন আছে, পাবলিক সেন্টিমেন্ট এমনিতেই থাকবে, মিডিয়ার গল্প বরং সেন্টিমেন্টে ভিন্ন ডাইমেনশন যোগ করবে।

দুটোই আমার অনুমান। তবে সাকিব আর মাশরাফি আদতে মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, এটাই উপরোক্ত হাইপোথিসিসের মূল প্রতিপাদ্য।

কেবলমাত্র এম্বিশন দিয়ে একজন ক্রিকেটার ব্যাটিং-বোলিং কোনোটাতেই তেমন এক্সিলেন্স/এলিগ্যান্স না থাকার পরও ধারাবাহিকতা ধরে রাখলো, কথাটা অবাস্তব শোনাচ্ছে না?

মানুষ যতই বলুক প্রতিভা বলতে কিছু নেই, অধ্যবসায়ই সব; ন্যুনতম মানের প্রতিভাযোগ না ঘটলে অধ্যবসায়, সংকল্প, ডেডিকেশন যা-ই থাকুক, লেভেল অব এক্সিলেন্সে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।

সাকিব তার ফ্যান্টাসির তীব্রতার সাথে প্রতিভার সংযোগ ঘটিয়ে পারফরম্যান্সকে অভ্যাসে রূপান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছে। এবং যখনই অভ্যাসে বিচ্যুতি দেখা দিবে, সে নিজেকে গুটিয়ে নিবে। আগামী ৩ বছরের মধ্যে সে ক্রিকেটের কোনো এক ফরম্যাট থেকে অবসর নিয়ে নিতে পারে এই অভ্যাসের বিচ্যুতি ইস্যুতেই। ক্রিকেটটা সে কল্পনা দিয়ে খেলে, শরীর দিয়ে নয়।

কল্পনা কী রকম?

বোলার যখন বল হাতে নেয় সে কল্পনা করে বলটা কোথায় পিচ করবে, কী ধরনের শট খেলবে। একারণে যত দ্রুতগতির পেসারই হোক বা সুইংগিং বোলার হোক, সে কল্পনা দিয়ে উতরে যায়। স্পিন বলে রান আপ কম থাকে বলে কল্পনার সময় কম পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে গোলযোগ ঘটে। স্পিন বল সে পেসের তুলনায় ভালো খেলে, কল্পনার ব্যাপারটা হাস্যকর লাগতে পারে। কিংবা সে যখন বোলিং করে একটা লেন্থ কল্পনা করে নেয় বা ব্যাটসম্যানের সম্ভাব্য মুভমেন্ট কল্পনা করে সেই অনুসারে বল ডেলিভারি দেয়। যে কারণে বোলিংয়ে বিশেষত্ব কম থাকা সত্ত্বেও ব্যাটসম্যানকে সে ভোগাতে পারে।

কল্পনার উৎস কী?

অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিকতা এবং আত্মনিমগ্নতা। আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে সে সামাজিক জীবনে অজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, আত্মনিমগ্নতা তাকে কর্মক্ষেত্রে ইউনিকনেস প্রদান করে।

আত্মনিমগ্ন হওয়ার উপায় কী?

‘ডোন্ট কেয়ার অ্যাটিচুড’ রপ্ত করা। যখন আপনি পরিণতির ব্যাপারে উদাসীন হবেন, এবং নিজের ভালো লাগার জন্য সবরকম স্যাক্রিফাইস করতে পারবেন, এবং সমাজ আর লৌকিকতার মানদণ্ডে অপছন্দনীয় মানুষ হওয়াকেও স্পোর্টিংলি নিতে পারবেন, একমাত্র তখনই আপনি নিয়তির চাইতে বড়ো হয়ে উঠবার চ্যালেঞ্জ নিতে পারবেন।

মানুষ কি নিয়তির চাইতেও বড়ো হতে পারে? তা পারে না, কিন্তু চ্যালেঞ্জ জানাতেই পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্রিকেট যদি বাংলাদেশের জনপ্রিয় খেলা না হতো, তাহলে কেমন হতো সাকিব আল হাসানের মনস্তত্ত্ব? আপনি কি জাহিদ হোসেন এমিলি নামের কোনো খেলোয়াড়কে চেনেন, তার মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহ আছে? ইনোভেশন মানে স্ক্র্যাচ থেকে কিছু তৈরি করা নয়, বরং তৈরিকৃত সিস্টেমেই কতটা ভিন্নতা আনতে পারেন সেই দক্ষতা। ক্রিকেটই যদি না থাকে তবে মাগুড়ার কোথাকার কোন্ সাকিবকে নিয়ে আপনি, আমি কেউই কি ভাবতাম? আমরা যারা ঢাকার লোকাল বাসে চলাচল করি, পাশের সিটে বসা মানুষটিকেও কি কখনো খেয়াল করি? কিংবা খোখো দলের অধিনায়ক আপনার সামনে দিয়ে ১০ বার হাঁটা-চলা করলেও কি জিজ্ঞেস করবেন, ভাই কেমন আছেন?

বরং প্রশ্ন করুন, আর কোনো দ্বিতীয় সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটে এলো না কেন, বা আসার সম্ভাবনা আছে কিনা। সাকিবের মনস্তত্ত্ব খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা করে অনুর্ধ্ব ১৫ দলের ক্রিকেটারদের উপর প্রয়োগ করলে আগামী ৭-৮ বছরের মধ্যে তার পারসোনালিটি টাইপের ক্রিকেটার পেতেও পারি, তবে ক্যালিবারে তার কাছাকাছি হবে কিনা সেই নিশ্চয়তা দেয়ার সাধ্য নেই, কারণ ল্যাবরেটরিতে যদি আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় তৈরি করা না যায়, অথচ সাকিব তৈরি করা যাবে, এতোটাই কি সস্তা সে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।