প্রসঙ্গ: ডেঙ্গু, অডোমস ক্রিম ও আমরা

মাসখানেক আগে আমার মেয়ের ডেঙ্গু হেমোরেজিক হয়েছিলো। এক সপ্তাহ কাটিয়েছি ঢাকা মেডিকেল কলেজের জেনারেল ওয়ার্ডের বেডে। জীবনে যদি কখনো ফ্রাস্টেশন, ডিপ্রেশন আর হা-হুতাশ জাগ্রত হয় তাহলে মোটিভেশনাল স্পিকার না খুঁজে ডিএমসির জেনারেল ওয়ার্ডগুলায় একবার ঘুরে আসা উচিত, অবস্থার ১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন হবে মানিব্যাক গ্যারান্টিড। যদিও বর্তমান অবস্থা আরো ভয়াবহ, আমার দেখা এক মাস আগের কাহিনীই বলি।

শিশু ওয়ার্ডে এক বেডে ৩টি করে বাচ্চা। বরফিকাটা করে বাচ্চা আর বাচ্চার মায়েরা কোনমতে বেডে বসে আছেন। কোন কোন বেডে মায়েরা বসতেও পারছেন না, পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। পুরো ফ্লোর গিজগিজ করছে চাইনিজ তেলাপোকায়। বেডের পায়া কিনারা হাতল বেয়ে সেই তেলাপোকা উঠে নামে খেলা করে। আপনি হেলান দিয়ে থাকলে আপনার গায়েও করে যাবে সৌজন্য ভ্রমণ। প্রচন্ড গরমে ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা আর এত মানুষের নি:শ্বাস আর গায়ের গরমে স্যাঁতস্যাঁতে। আসার দিন এক বেডে এমনকি চারটি শিশুও দেখেছি, বারান্দা-করিডোর ফুল অকুপাইড।

চাইলেই স্কয়ার/এপোলো/ল্যাব এইডে ভর্তি করানোর মত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেন তাহলে স্বেচ্ছায় এই দোজখের আজাব ভোগ করলাম? কারণ বৌ নিজেই ডিএমসির ডাক্তার, আর আমার দেখা এই সাক্ষাৎ দোজখই তার কর্মক্ষেত্র। সেই সুবাদে তার জানা আছে নামভারী এসকল জায়গায় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র কেমন।

ডেঙ্গু ভাইরাস ইভলভড হয়ে এর লক্ষণ- উপসর্গ, রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা সব চেঞ্জ হয়ে গেছে। দ্রুত নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা না পেলে রোগী খুব সহজেই শকে চলে যাচ্ছে, ফুসফুসে পানি জমে যাচ্ছে, হচ্ছে মৃত্যুও। বাহ্যত অবস্থা যতই করুণ মনে হোক না কেন, সেরা ডাক্তার ও সময়মত সেরা চিকিৎসা পাওয়া যায় কেবল সরকারী হাসপাতালগুলোতেই।

প্রতি ঘন্টায় প্রেশার চেকিং ও সে অনুযায়ী ফ্লুয়িড ম্যানেজমেন্ট এডজাস্টমেন্ট, ব্লাড ও অন্যান্য টেস্টের একদম একুরেট রেজাল্ট, সর্বক্ষণ ডাক্তারের উপস্থিতি কেবল এসকল জায়গাতেই এভেইলেবল। প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী হ্যান্ডেল করতে করতে এমনকি এখানকার নার্স/ওয়ার্ড বয়দের অবজার্ভেশন ও হাতযশ চলে গেছে অন্য লেভেলে।

ডাক্তাররা এই মহামারীর আনসাং হিরো। এ পর্যন্ত ১০ জন ডাক্তার মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। তাই বলে সারা দেশে কোথাও চিকিৎসা দেয়া থেমে নেই। বরং এবার ঈদে কোন ডাক্তার ছুটি পাচ্ছেন না। নিজেদের জীবন বিপন্ন করে তারা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আমার বাচ্চার ডেঙ্গু হওয়ার আগে থেকেই আমি বাচ্চাকে প্রতিদিন অডোমস ক্রীম লাগিয়ে রাখতাম, কেননা ঢাকার ৩টি রেড জোনের একটিতে আমার বাস। তবুও ডেঙ্গু হল। যাই হোক, সেসময় ৫০ গ্রামের অডোমস কিনতাম ১৩০-১৪০ টাকা করে, ১০০ গ্রামের দাম ছিলো ২৫০ টাকা।

ডেঙ্গু মহামারী রূপ নেয়ার সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই অডোমস মার্কেট আউট হয়ে গেল। হঠাত যে এই অবস্থা এত ভয়াবহ হয়ে যাবে তা কেউই আন্দাজ করতে পারে নাই। ব্যবসায়ীদের কাছেও স্টকে এত ছিলো না। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভারতের মার্কেট টান দিয়ে এমনকি কলকাতায়ও অডোমস মার্কেট আউট।

যোগানের চেয়ে যদি চাহিদা হঠাত বেড়ে যায়, তাহলে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এটা স্বাভাবিক এবং অর্থনীতির একটা বেসিক সূত্র। এই একই সূত্রে ঈদের সময় পরিবহণ টিকেট মূল্য বেড়ে যায়, প্রতি রোজায় চিনি আর কুরবানির সময় গরম মসলার দাম বাড়ে। চাহিদা যদি অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে, তাহলে মূল্যবৃদ্ধিও অস্বাভাবিকভাবেই হবে। তাহলে এই হঠাত মূল্যবৃদ্ধি সামাল দেয়ার উপায় কি?

খুবই সহজ , সাপ্লাই বাড়াতে হবে। চাহিদার সমান্তরালে সাপ্লাই বাড়লে দাম স্থিতিশীল থাকবে। এক্ষেত্রে সবচে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হল সরকারের, কেননা আমদানীনির্ভর পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক/ট্যাক্স একটা বড় ব্যাপার। কিন্তু আমরা হইলাম বাঙ্গালী। এইসব অর্থনৈতিক তত্ত্ববুলি অথবা মার্কেট ডাইনামিক্স বোঝার টাইম আমাদের কই? আমরা সিচুয়েশনও পরোয়া না।

১৩০ টাকার অডোমস ৩০০ টাকা হলো কেন? নিশ্চই দুষ্টু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে অধিক লাভ করার জন্য দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ঠুকো অভিযোগ ভোক্তা অধিদপ্তরে। তো সম্প্রতি ভোক্তা অধিদপ্তরের জনৈক বাহাদুর কর্মকর্তা তিনটি ফার্মেসিতে গিয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে বন্ধ করে দিয়ে এসেছেন। ফলাফল? ফার্মেসিগুলাতে এখন কাগজ সাঁটানো- ‘এখানে অডোমস বিক্রি করা হয় না।’ মরলে মরেন আপনি, আপনার বাচ্চাও মরুক, উই ডোন্ট কেয়ার। দুই চার হাজার টাকার জন্য ব্য্বসা রিস্ক নিবো নাকি?

এখন আমার প্রশ্ন হইলো, নীতি-নির্ধারণী মহল এখানে কি ভূমিকা পালন করছে? তারা কি যাবতীয় মসকুইটো রিপেলেন্ট প্রোডাক্টের আমদানী শুল্কমুক্ত ঘোষণা করেছে? – না। লাগেজে/কুরিয়ারে যতই মসকুইটো রিপেলেন্ট প্রোডাক্ট আসুক না কেন, ভ্যাট দিতে হবে না/ কমার্শিয়ালি বিবেচনা করা হবে না এই মর্মে কোন ঘোষণা দিয়েছে? – না। বাজারে এই যে মশক দমনের সকল প্রোডাক্টের এই সংকট, তা নিরসনে কোন প্রকার পদক্ষেপ নিয়েছে? – না।

সিটি কর্পোরেশন কি প্রতিদিন/নিয়মিত মশার ওষুধ দিয়ে যাচ্ছে? – আর ইউ কিডিং মি? আমার এলাকায় গত দুই মাসে মাত্র দুইবার আসছে। আর আসলেই কি, যে ওষুধ দেয় সেটা তো মেয়াদউত্তীর্ণ/ অকার্যকর।

কাজের কাজ করছেন টা কি তাহলে? ঝাড়ু হাতে বাতিল অচল নায়িকাদের সাথে ফটোসেশন করছেন। উত্তরের মশা দক্ষিণে আর দক্ষিণের মশা উত্তরে পাঠাইছেন। ওষুধ কে কিনবে এই নিয়া নিজেদের মধ্যে পিলো পাসিং খেলছেন। মার্কেট কিভাবে কাজ করে তা না বুইঝা ফেসবুক লাইভে চিপ লাইক আর ফেম কামানোর ধান্দায় ফার্মেসি বন্ধ কইরা মানুষ যাও কিছু অডোমস পাইতেছিলো সেই রাস্তাও বন্ধ করছেন। খালি ব্যবসায়ীদের দোষ দিয়াই খালাস! আমাকে কি কেউ উত্তর দিবেন এই মহামারী রোধে, মার্কেটের এই অচলবস্থা নিরসনে নীতি-নির্ধারণী মহলের আদৌ কোন ভূমিকা ছিলো/আছে কি না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।