দেবী কি প্রত্যাশা মেটাতে পারলো?

১.

মিসির আলীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯২ সালে ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়। শুরুটা হয়েছিল ‘বিপদ’ বইটার মাধ্যমে। একটা সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গ্রুপ স্কুলে গিয়ে গিয়ে বই বিলি করতেন ছেলেমেয়েদের ভেতর গল্পের বই পড়ার আগ্রহ জাগিয়ে তোলার জন্য। সেই কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই বইটা পড়া। ক্লাস সিক্সে পড়া একটা ছেলের হুমায়ুন আহমেদ সম্পর্কে ভালোভাবে না জানাটা দোষের কিছু নয়।

একই সাথে মিসির আলী যে একটা আলাদা বিশেষ চরিত্র সেটাও ধরতে পারিনি। হুমায়ুন আহমেদ যে একজন বিশেষ কিছু সেটা সর্বপ্রথম বুঝতে পারলাম ক্লাস এইটে পড়ার সময় ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের মাধ্যমে। এস.এস.সি পরীক্ষার পর অবসর সময় কাটানোর জন্য মার্কেটে গিয়েছিলাম বই কিনতে। একসাথে হুমায়ুন আহমেদের ৫ টা বই কিনে আনলাম। সেই শুরু।

ইন্টার লাইফের প্রথম চারমাসে হুমায়ুন শেষ করে ফেললাম। হুমায়ুন আহমেদের সৃষ্টি গুলোর মাঝে মিসির আলী একটা বিশেষ চরিত্র। যদিও হুমায়ুনের সৃষ্টির মাঝে আমার নিজের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র হচ্ছে ফিহা। যাকগে, সেটা আরেক প্রসঙ্গ। মিসির আলী সবচেয়ে প্রিয় না হলেও অন্যতম প্রিয় তো বটেই। সেই মিসির আলীকে নিয়ে সিনেমা হচ্ছে জেনে আনন্দিত হবার সাথে সাথে শিহরিতও হয়েছিলাম। অপেক্ষায় ছিলাম কবে বড় পর্দায় সিনেমাটা দেখবো।

২.

সাহিত্য থেকে সিনেমা সৃষ্টি করার কয়েকটা সমস্যা থাকে। একটা হচ্ছে কাহিনীটা মোটামুটি অনেকেরই জানা থাকে। জানা কাহিনী দেখতে যাওয়ার আগ্রহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই থাকে না। আরেকটা হচ্ছে বেশির ভাগ মানুষের মনেই চরিত্র গুলো নিয়ে একটা ইমেজ দাঁড় হয়ে যায়। দর্শক যখন সিনেমা দেখতে যান তখন নিজের কল্পনার সাথে সেগুলোকে মেলানোর চেষ্টা করেন এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হতাশ হয়ে যান।

বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় চরিত্র নিয়ে সিনেমা/নাটক তৈরী করে সফল হবার ঘটনা দূর্লভ। বাংলাদেশের প্রথম প্যাকেজ নাটক ‘প্রাচীর পেরিয়ে’ নির্মিত হয়েছিল মাসুদ রানা কে নিয়ে। নোবেলের সেই নাটক মোটামুটি ব্যর্থই ছিল। তবে আমাদের পাশের দেশেই বোমক্যাশ, ফেলুদা, শবর কিংবা কাকাবাবুকে নিয়ে নির্মিত সিনেমাগুলো সফল হওয়ায় মিসির আলীকে নিয়েও মানুষ আশাবাদী ছিল। ‘মিসির আলী’ চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী সেই আশার অনেকখানিই সফলও করেছেন বলা যায়। তবে এরপরেও কিছু প্রশ্ন থাকে।

প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে মিসির আলীকে নিয়ে সিনেমা বানানোর জন্য ‘দেবী’ নিয়েই কেন শুরু করতে হবে? ‘দেবী’ প্রথম উপন্যাস এজন্যেই? বোমক্যাশ, ফেলুদা কে নিয়ে যখন সিনেমা নির্মিত হয়েছে তখন কিন্তু তাদের প্রথম উপন্যাস কিংবা কাহিনী নিয়ে সিনেমা বানানো হয় নি। এমনকি জেমস বন্ডের প্রথম কাহিনী নিয়েও সিনেমা নির্মিত হয়েছিল অনেক অনেক পর।

মিসির আলী কোন স্পাইডারম্যান কিংবা সুপার ম্যান টাইপের সুপার হিরো সিরিজ নয় যে তাদের রুপান্তরের ইতিহাসটা দেখানো প্রয়োজন। মিসির আলীর হাইপটা এতটাই বেশী যে আমার ধারণা যারা মিসির আলীর কোন বই পড়েননি তারা দেবী দেখে মিসির আলী সম্পর্কে কোন সঠিক ধারণা পাবেনা।

৩.

মিসির আলী আসলে কেমন ধরণের মানুষ? আত্মভোলা তবে পর্যবেক্ষন ক্ষমতা অসম্ভব তীক্ষ্ণ। তিনি বিশ্বাস করেন যে পৃথিবীতে রহস্য বলে কিছু নেই। আজ যেটা রহস্য মনে হচ্ছে সেটা ভাঙ্গা যাচ্ছে না বলেই ব্যখ্যার অতীত মনে হচ্ছে। একটা সময় চাঁদে যাওয়া রহস্য ছিল। আজ চাঁদে যাওয়ার উপায় বের হবার কারণে রহস্যের সমাপ্তি হয়েছে।

দেবী সিনেমাতে কি সেই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সম্পন্ন মিসির আলীকে আমরা পেয়েছি? ক্লাস নিতে গিয়ে দুই পায়ে দুই স্যান্ডেল পড়া আত্মভোলা মিসির আলীকে আমরা দেখেছি। কিন্তু মিসির আলীর সিগনেচার পয়েন্ট ‘পর্যবেক্ষণ’ এর কিছুই পাই নি। অবশ্য দেবী বইটাতেও এমন কিছু ছিল না। তবে সিনেমা করতে গেলে অনেক কিছু চাইলেই যোগ করা যায়। মিসির আলীর অন্যান্য বই থেকে টুকরো টুকরো কিছু ঘটনা এনে উনাকে আলাদা একটু ভাবে দেখানো যেত। ‘অনীশ’ বই এর একটা ঘটনা একটু বলা যাক।

অসুস্থ হয়ে মিসির আলী হাসপাতালে ভর্তি হলেন। একদিন দেখলেন হাসপাতালের কেবিনের দেয়ালে লেখা আছে, ‘এই ঘরে যে থাকবে সে মারা যাবে। ইহা মিথ্যা নয়, সত্যি’।

সাধারণ মানুষ এই লেখা দেখে আতকে উঠবে। কিন্তু মিসির আলী ভেবে ভেবে বের করলেন ঘটনা কি। উনি অনুমান করে বের করলেন যে এই লেখাটা একটা বাচ্চা মেয়ের লেখা যার উচ্চতা চার ফুট দুই ইঞ্চি। এবং মেয়েটা এই ঘরেই মারা গিয়েছে।

কারো সাথে কথা না বলে শুধু ভেবে তিনি এই তথ্যটা কিভাবে বের করলেন?

তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে দেয়ালে লেখার সাথে সাথে সবুজ মার্কারে আরো কিছু ছবি আছে যার কয়েকটা বেণি বাধা মেয়ের ছবি। একটা বয়স পর্যন্ত মেয়েরা মেয়েদের ছবি আকে। এ থেকে তিনি ধারণা করলেন ছবিটা যে একেছে সে মেয়ে।

সাধারণত একজন মানুষ দেয়ালে যখন কিছু লিখে তখন সে তার চোখ বরাবর লিখে। মেয়েটা যেহেতু অসুস্থ ছিল তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে লেখাটা লিখেছে। সেখান থেকে মেয়েটার উচ্চতা পাওয়া গিয়েছে। মেয়েটা মেঝেতে দাড়িয়েও লিখতে পারে কিন্তু অসুস্থ থাকায় বিছানায় শুয়ে লেখাটাই অধিক গ্রহণযোগ্য।

সবশেষে প্রশ্ন হচ্ছে মেয়েটা মারা গিয়েছে এটা কিভাবে তিনি নিশ্চিত হলেন?

বাচ্চারা লেখার ব্যাপারে পার্টিকুলার। যা বিশ্বাস করে সেটাই লিখে। যদি বাচ্চাটা সুস্থ হয়ে যেত তাহলে হাসপাতাল ছাড়ার আগে অবশ্যই লেখাটা নষ্ট করে যেত।

পরবর্তীতে খোজ নিয়ে জানা গেল যে মিসির আলী যা অনুমান করেছেন তার সবগুলোই সত্য। শুধু মাত্র উচ্চতার কথাটা পুরোপুরি মেলেনি। মিসির আলী বলেছিলেন চার ফুট দুই ইঞ্চি, বাস্তবে উচ্চতা ছিল চার ফুট এক ইঞ্চি।

দেবী সিনেমাতে কি আমরা মিসির আলীকে পেয়েছি? অবশ্যই না। সিনেমাতে আরো কয়েকটা সিকুয়েন্স যোগ করে মিসির আলীর চরিত্রটা আরো আকর্ষণীয় করার প্রয়োজন ছিল। সিনেমাটিতে ফোকাস করা হয়েছে মূলত দেবীকে। যেহেতু উদ্যোক্তা জয়া আহসান তাই সেটা অযৌক্তিকও না। তবে মিসির আলীর চরিত্রটা আরেকটা বাড়ালে কোন ক্ষতি ছিল না। কাকাবাবু কিংবা ফেলুদা সিনেমাতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে বই এর বাইরে কিছু বিষয় যোগ করা হয়েছে।

৪.

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সিনেমাটা কেমন লেগেছে। একজন দর্শক হিসেবে বলবো সিনেমাটা খারাপ লাগে নি। দৃশ্যায়ন এবং কুশলীদের অভিনয় অসাধারণ ছিল। সিনেমাটা দেখতে বোরিংও লাগেনি। এই রিভিউটা সিনেমার নেগেটিভ রিভিউ নয় বরং ৮৫ পাওয়া একটা পারফর্মেন্স আর কি কাজ করলে ৯০ পেতে পারতো সেটার দিকে আলোকপাত করা।

সমস্যা হচ্ছে মিসির আলী সিরিজ হিসেবে টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক কম। যেহেতু জয়া আহসান এ সিনেমায় মারা গিয়েছেন তাই পরবর্তীতে তার আর সিনেমাটা করার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অন্য কেউ করলে কেমন হবে কিংবা মিসির আলী চরিত্রেই বা কাকে নিবে সেটা কে জানে।

তবে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাইবো মিসির আলী যদি আবার নির্মিত হয় সেক্ষেত্রে ‘আমি এবং আমরা’, ‘অনীশ’ ‘বৃহন্নলা’ কিংবা ‘মিসির আলীর অমিমাংসিত রহস্য’ উপন্যাস অবলম্বনে হোক। এছাড়া ‘জ্বীন কফিল’ কিংবা ‘সঙ্গিনী’ শীর্ষক ছোট গল্প অবলম্বনেও সিনেমা বানানো যেতে পারে।

সিনেমাটা সফল হোক সেটাই চাই এবং একই সাথে এটাও চাই যে ফেলুদার মতো মিসির আলীও একটা সিরিজে পরিণত হোক।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘শবর’-এর মতো কাহিনী নিয়েই যদি সিরিজ বানানো যায় তাহলে ‘মিসির আলী’ নিয়ে এর চেয়ে ভালো কিছু অবশ্যই সম্ভব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।