বাংলাদেশ কাঁপানো একটি বিপণন কৌশল!

ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে রাত ১০টার ঘরে আসতেই মাছরাঙা টেলিভিশনে চোখ রেখে চমকে যেতে হলো। খবর পড়তে হাজির হয়েছেন লাস্যময়ী জয়া আহসান ও সব্যসাচী চঞ্চল চৌধুরী! পেশাদার সংবাদ পাঠক পাঠিকার মতো পুরো আধঘন্টা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দর্শককে টিভি সেটের সামনে ধরে রেখেছেন এ দু’জন। একবারের জন্যও মনে হয়নি তারা পেশায় অভিনেতা অভিনেত্রী, মনে হয়েছে তাদের কাজই হলো সংবাদ পাঠ করা!

একদিন আগে থেকে সোশাল মিডিয়ায় ঘোষণা দিচ্ছিলেন সংশ্লিষ্টরা, চমক আছে রাত দশটায়। কিসের চমক, কিসের কী ভাবতে ভাবতে কূল কিনারা পাচ্ছিলেন না কেউই। চমক দেখিয়ে দিলেন জয়া, সংবাদ পাঠিকা হয়ে।

কোথায় নেই ‘দেবী’? পত্রিকার পাতায় ‘দেবী’, ফেসবুকে ‘দেবী’, মানুষের পোশাকে ‘দেবী’, অবশেষে রাতের সংবাদেও দেখা মিলল ‘দেবী’র। জয়া পরে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘আমাদের মার্কেটিং কনসালটেন্টের পরিকল্পনা অনুযায়ীই আমরা সবাই মিলে সংবাদপাঠের বিষয়টি চূড়ান্ত করি। মাছরাঙা টেলিভিশনের সংবাদ বিভাগের দল বেশ গোছানো। আমাকে কোনো ধরনের দুশ্চিন্তাই করতে হয়নি। তাছাড়া বরাবরই আমি বিশ্বাস করে এসেছি সংবাদকক্ষের এ জায়গাটি বেশ সম্মানের, বেশ পবিত্র।’

আজকাল কেবল ভাল সিনেমা বানালেই চলে না, সাথে প্রয়োজন মোক্ষম এক বিপণন। হলিউডে তো বটেই, বলিউডেও নানা রকম অভিনব বিপণন কৌশল বেছে নেওয়া হয়।  ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর মুক্তির আগে স্বয়ং আমির খান ছদ্মবেশ ধারণ করে ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতের ছোট শহরগুলোতে। ‘টু স্টেটস’ সিনেমার সময় নিজেদের বাগদানের নকল একটা কার্ডও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করেছিলেন আলিয়া ভাট ও অর্জুন কাপুর। তবে, এদের সবাইকেই যেন ছাড়িয়ে গেলেন চঞ্চল-জয়া।

সংবাদ শুরুর আগমুহূর্তে টিভিতে ভেসে উঠেছিল একটি বিজ্ঞাপন। যেখানে বাজারের ব্যাগ ভাঁজ করে বুকে চেপে ধরা একজন মেয়ে গাড়ীতে বসা একজন মেয়েকে বলছে, ‘আজকে গাড়ীতে করে কোথাও যাবেন না প্লিজ……..আমি না, অনেক কিছু বলে দিতে পারি, আমি যা বলি তা সত্য হয়ে যায়…..’ এই মেয়েটিই রানু, ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের রানু। আমাদের প্রিয় জয়া আহসান। অন্যদিকে গাড়ীতে বসে থাকা মেয়েটি নীলু, আমাদের শবনম ফারিয়া। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনেও ‘দেবী’।

‘দেবী’, জননন্দিত অভিনেত্রী জয়া আহসানের প্রথম প্রযোজিত চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের আগে ‘দেবী’ বলতে আমাদের চোখে ভেসে উঠতো হুমায়ূন আহমেদের একটি বইয়ের প্রচ্ছদ। মনের পর্দায় উঁকি মারতো মিসির আলি, রানু, নীলুরা। মনের পর্দায় থাকা রানু, নীলু, মিসির আলিকে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে ধরার কাজটা সহজ নয়। সেটিই করলেন জয়া। বলা যায় বাধ্য হলেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন একজন প্রযোজকের জন্য তিনি কত খোঁজ করেছেন, কেউ ভরসা করতে পারেনি অনম বিশ্বাসের উপর।

তাই বাধ্য হয়ে নিজেই প্রযোজক হয়ে গেলেন। কাঁধে তুলে নিলেন একটি সিনেমার দায়িত্ব। এ দায়িত্ব তিনি চুপটি মেরে বসে রইলেন না। মাঠে নেমে পড়লেন আঁট-ঘাট বেঁধে। শিল্পী বাছাই হতে শুরু করে সিনেমা নির্মাণের প্রতিটি স্তরে প্রয়োগ করেছেন নিজের মেধা। সম্ভাব্য সেরা ব্যক্তিদের নিয়েই গড়ে তুলেছেন তার ‘দেবী’ টিম। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, সরকারের আংশিক সহযোগীতায় নির্মিত হয়েছে ‘দেবী’, জয়ার ‘দেবী’, মিসির আলি প্রথমবার।

জয়া কাজ করেছেন ওপার বাংলায়। তিনি জানেন ওদেশে একটি সিনেমাকে কিভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছানো হয়। আপনি সিনেমা বানালেন আর দর্শককে জানালেন না, তখন আপনার ছবি খুব কম লোকই দেখবে। জয়া ব্যাপারটা বোঝেন। তাই তিনি বাংলাদেশেও শুরু করে দিলেন নতুন ধারা। সিনেমার প্রচারণা যে কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে তা বোধহয় জানা যেত না জয়া প্রযোজক না হলে।

নি:সন্দেহে প্রচারণা নিয়ে জয়ার আক্ষেপও আছে। ‘ফিরে এসো বেহুলা’র মত সাসপেন্স থ্রিলার সিনেমায় তিনি আগে কাজ করলেও স্রেফ পর্যাপ্ত বিপণনের অভাবে সিনেমাটি ভাল ব্যবসা করতে পারেনি।

সিনেমার প্রমোশান নিয়ে এত মাতামাতি কখনো হয়নি। কখনো এত নতুন আইডিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক, ‘দেবী’ নিয়ে কি কি হয়েছে।

  • ‘দেবী’ চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে পোস্টার, টিজার, গান, ট্রেলার প্রকাশ করেছে। প্রতিটি সেগমেন্টের মাঝে একটি প্রয়োজনীয় ব্যবধান ছিল।
  • ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের অনুষঙ্গ নিয়ে তৈরী হয়েছে পোষাক, সে পোষাকের প্রদর্শনীর জন্য করা হয়েছে ফ্যাশন শো।
  • টি-ব্যাগে ছবি দিয়ে প্রচারণা করা হয়েছে ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের।
  • ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের লোগো ব্যবহার করে তৈরী করা হয়েছে টি-শার্ট, মগ, ফুড বক্স, হেলমেট, গহনা, চাবির রিং।
  • ফুডপান্ডার সাথে যৌথভাবে আয়োজন করা হয় কনটেস্টের।
  • টিকটক চ্যালেঞ্জের আয়োজন করা হয় ‘দেবী’ চলচ্চিত্রের গান নিয়ে।
  • পোস্টার ডিজাইন কনটেস্ট করা হয়েছিল চলচ্চিত্রটির জন্য।
  • ছবিটির টিজারের উপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়েছে স্পুফ। যা বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে নতুন।
  • বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল ২০১৮ তে ‘ফেস অব বাংলাদেশ’ নির্বাচিত হওয়া জয়া উপস্থিত হয়েছিলেন ফাইনালে, উন্মোচন করেছিলেন ট্রফি।
  • ফেসবুকের জন্য ‘দেবী’ ছবির থিমের উপর ডিজাইন করা হয়েছে ফটো ফ্রেম।
  • অনলাইনের বিভিন্ন গ্রুপে, ব্লগে, পেজে, ইউটিউবের চ্যানেলে দেখা গেছে জয়া আহসানকে, তিনি অবলীলায় তাদের সময় দিয়েছেন। কথা বলেছেন।
  • জয়া সোশাল মিডিয়ায় সময় দিচ্ছেন এত ব্যস্ততার মাঝেও। নিয়মিত নিজের অফিসিয়াল ফ্যান পেজে আপডেট দিচ্ছেন, ফ্যান গ্রুপের খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

জয়ার ভান্ডারে বোধহয় আরো কিছু চমক এখনো বাকি রয়ে গেছে। ‘দেবী’ মুক্তির প্রাক্কালে সংবাদ পাঠ করে তিনি আরেকটি পালক যুক্ত করলেন তার প্রচারণার মুকুটে। আগে যা কেউ ভাবেনি, সেই অভাবনীয় আর অনন্য কাজটাই দেখা গেল দেবীর সুবাদে!

নিজের চলচ্চিত্র নিয়ে অবিরাম ছুটে চলা জয়ার পক্ষেই সম্ভব। এরপূর্বে কিছু ভালো ছবি শুধুমাত্র প্রচারণার জন্য দর্শকের কাছে পৌঁছুতে পারেনি। অথচ এসব ছবি নিয়ে পরবর্তীতে দর্শকের মাঝে একপ্রকার হাহাকার কাজ করেছিল। অধিকাংশ মানুষ জানতোই না ছবিগুলোর কথা। তাই হয়তো জয়া শুরু থেকেই সতর্ক ছিলেন। কাজে লাগিয়েছেন তার ওপার বাংলার অভিজ্ঞতা।

জয়ার কিছু চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের গল্প নিয়ে কাজ সবাই করতে পারেনা। কট্টর হুমায়ূন ভক্তরা তার কোন উপন্যাসের কিঞ্চিৎ পরিবর্তন সহ্য করতে অপারগ। সেখানে সিনেমার জন্য সিনেমার মতো পরিবর্তন উপন্যাসে করতেই হয়। সেটি হয় চিত্রনাট্য। উপন্যাস বা গল্পে যা পড়তে ভালো লাগবে তা সিনেমার পর্দায় দেখতে ভালো লাগবেনা, তাই পরিবর্তন করতে হয়। সে যার লেখাই হোক। তাই অনম বিশ্বাস সময়োপযোগী করে নিয়েছেন চিত্রনাট্যকে। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই ছবির প্রচারণায় জয়া নেমেছেন, সাথে পাচ্ছেন চঞ্চলকে, ক্ষেত্রবিশেষে শবনম ফারিয়াকে।

ছবিটি মুক্তি পাবে ১৯ অক্টোবর, শুক্রবার। শোনা যাচ্ছে ঢাকা শহরের প্রায় সকল হলের প্রথম দিকের শোয়ের টিকেট শেষের পথে। মানুষের মাঝে ‘দেবী’ নিয়ে এক ধরনের আগ্রহ কাজ করছে। সবই সম্ভব হয়েছে জয়ার নিত্যনতুন প্রচারণার কৌশলের জন্য। আমাদের দেশে ‘দেবী’ যদি সফল হয়, তাহলে এ ধারার ছবি নির্মাণে উৎসাহ পাবে দর্শক।

মিসির আলিকে বড়পর্দায় নিয়মিত পেতে হলে ‘দেবী’-কে সফল করতে হবে। জয়ার দৌড় শেষ হচ্ছে ১৯ অক্টোবর রিলিজের সঙ্গে সঙ্গেই। এরপরের কাজটা দর্শকের। মিসির আলিকে আবার বড়পর্দায় আনতে হলে এগিয়ে আসতে হবে তাদেরই।

জয়া তো বলেই দিয়েছেন, ‘দেবী’ সফল হলে তিনি মিসির আলিকে নিয়ে সিরিজ ছবি করতে পারেন, হতে পারে ‘নিশীথিনী’।

 

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।