দেবী: যা কিছু ভাল, যা কিছু ‘মন্দ’

বড় পর্দায় আসলো ‘দেবী’। হুমায়ূন আহমেদ এর দেবী, আমার আপনার দেবী, জয়া আহসানের দেবী, অনম বিশ্বাসের দেবী, সঙ্গে আছে ‘মিসির আলি’।

এই সিনেমা প্রথম দিন প্রথম শো দেখার মাঝে যে কতটা আলাদা অনুভূতি কাজ করে সেটা যারা দেখেছে তারাই বুঝবে। যার কাছে শুক্রবারের সকালের মোহনীয় ঘুম ছেড়ে দে দৌড়। দৌড় স্বার্থক হয়েছে, আমি সন্তুষ্ট। তবে বলি শুরুতেই আমি কম এক্সপেকটেশন নিয়ে গিয়েছিলাম।

প্রথমত, উপন্যাস থেকে সিনেমা বানালে সেটার প্রচণ্ড পরিমানে খুত থাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। মূলত উপনাস থেকে সিনেমা বানানো সবচেয়ে বড় রিস্ক।

দ্বিতীয়ত, এঁকে তো হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত উপন্যাস থেকে বানানো। উনি এমন একজন যার লেখা থেকে কিছু বানানো হলে সেটার বেশীরভাগই উপস্থাপন করা সম্ভবের পর্যায়ে কম পড়ে।

তৃতীয়ত, যিনি বানিয়েছেন তার প্রথম পরিচালিত সিনেমা।

চতুর্থত, আমাদের দেশে ডার্ক ঘারানার সিনেমা খুব কম হয় বা এর দর্শক সেভাবে আমাদের দেশে কম। সেই ডার্ক ঘারানার সিনেমা তাও আবার বড় পর্দায়!

ও সর্বশেষ, নীলু ও আনিস চরিত্রের জন্য যে দুই জন কে নেয়া হয়েছে। কারণ, যারা উপন্যাস পড়েছেন তারা জানেন শেষের ক্লাইম্যাক্সে নীলুর কতটা প্রভাব।

যাই হোক সিনেমা হলে ঢুকলাম। শুরুতেই জয়া আহসান আজকের দেবীর শো সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি দেশ বরেন্য সঙ্গীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুকে উৎসর্গ করলেন। শুরু হলো ভালো লাগা, একটার পর একটা অবাক হওয়া শুরু হলো। শুরুর সিনটাই আপনাকে অবাক করে দিবে। এরকম একটা ডার্ক ঘারানার সিনেমা দেখতে গিয়েও যে আপনি হেসে কুটিকুটি হওয়ার মতো হিউমার ছিলো স্ক্রিন-প্লে তে।

  • দেবী চরিত্রে জয়া আহসান

আমার কাছে মনে হয়েছে এই দেবী চরিত্রের জন্য আমাদের দেশে জয়া ছাড়া আর কাওকেই মানাতো না এবং সে ছাড়া এই চরিত্র আর কেউ করতেও পারতো না। প্রতিটা দৃশ্যে জয়ার অনবদ্য অভিনয় ছাপিয়ে গিয়েছে একেকটা থেকে আরেকটা। সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগেই অনেকেই জয়ার বয়স নিয়ে কথা বলেছেন।

তাদের কে বলবো একবার হলে গিয়ে দেখে আসুন, বলতে বাধ্য হবেন জয়া ছাড়া এই চরিত্র আর কারো দ্বারা সম্ভব না। সামান্য শাড়ি আর চোখে কাজল আর দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে বাজিমাৎ করে গিয়েছেন জয়া। শেষে শুধু এইটুকু বলে রাখি জয়া যদি এই সিনেমার জন্য পুরষ্কার না পায় তাহলে জয়ার প্রতি অন্যায় করা হবে।

  • মিসির আলি চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী

আমাদের দেশে নাকি অভিনেতা নাই! এই চঞ্চল কে দেখে আপনি নিজেই দ্বন্দে পড়ে যাবেন এটাই কি সেই চঞ্চল যে মনপুরার সহজ সরল যুবক কিংবা শরাফত করিম আয়নার মতো দুর্দান্ত কেউ। চঞ্চল চৌধুরীরা অভিনয় করেন না, উনারা চরিত্র ধারন করেন, চরিত্রে ডুবে যান, গল্পের চরিত্র গুলো কে বাস্তবে রুপদান করেন।

  • নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া

আমি এই জায়গাটা তেই সবচেয়ে বেশি ভয়ে ছিলাম। কিন্তু আমার ভয় কে উড়িয়ে দিয়ে পারফর্ম করে গিয়েছেন ফারিয়া। এক্সপ্রেশন, কিছুটা হীনমন্যতায় থাকা, ভয়ে থাকা, ইন্ট্রোভার্ট টাইপের চরিত্রে উত্রিয়ে গেছেন তিনি। এরকম লেগে থাকলে সামনে আরো ভালো করবে সে।

  • পরিচালকের ভুমিকায় অনম বিশ্বাস

আয়নাবাজির চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা। জয়া কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ‘পরিচালকের জায়গায় অনম কেন?’ জয়া বলেছিলেন, ‘এই সিনেমা বানানোর জন্য অনমই তার কাছে বেষ্ট মনে হয়েছে।’ তারপরও মনের মধ্যে খচখচানি ছিলো আদৌ পারবে কি না। কিন্তু সে পেরেছে এবং যথেষ্ট পেরেছে। এরকম একটা উপন্যাস থেকে সিনেমা বানানোর সামর্থ্য আছে অনম বিশ্বাসের সেটা সে প্রমান দিয়েছে। ভবিষ্যতে তার কাজের আশায় থাকবো।

  • ভিলেন সাবেতের চরিত্র করা ইরেশ জাকের স্ক্রিন টাইমিং ও ব্যবহার

আমার কাছে মনে হয়েছে আরো অনেক বেশি ব্যাবহার করা যেতো তাকে। কেমন যেনো খাপছাড়া লেগেছে তার উপস্থাপন। এখন সেটা স্ক্রীনপ্লে নাকি পরিচালকের দূরদর্শিতার অভাব নাকি সম্পাদনার কাজ! সেটা বলতে পাড়ছি না। মোট কথা স্বপ্নজালের ওই অভিনয়ের পর এই অভিনয় ভালো লাগবে না।

  • ক্লাইম্যাক্স

ক্লাইম্যাক্সে এই হাস্যকর দৃশ্য না রাখলেও চলতো। কেমন যেনো বাচ্চাদের মতো হয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ক্লাইম্যাক্সের যে টান টান উত্তেজনা আমি বইয়ে পেয়েছিলাম তা এখানে খুব কমই আছে শুধু জয়ার অভিনয় বাদে আর কিছুই মান সম্মত মনে হয়নি। আরো কাজ করা যেতো আমার মনে হয়।

সব শেষে বলবো দেবী দেখুন। না দেখলে অনেক কিছুই মিস করে যাবেন। এতো ভালো একটা সিনেমা না দেখলে আফসোস থেকে যাবে কিন্তু। আমাদের দেশে নাকি ভালো বাংলা সিনেমা হয় না! এক এই ২০১৮ সালেই একের পর এক দুর্দান্ত সব বাংলা সিনেমা পায়ে যাচ্ছি আমরা। মাঝে মাঝে মনে হয় সব ২০১৮ সালেই কেনো নাকি ২০১৮ সাল থেকেই ভালো মানের বাংলা সিনেমার বানানোর জোয়ার শুরু হলো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।