লাগিয়ে নেন ব্লাশন, চলতে থাকে জীবন

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

মা আরতি রায় চেয়েছিলেন মেয়ে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী হবে। কিন্তু মেয়ের এগারো মাস বয়সেই যেন ভাগ্যনির্ধারণ করলেন সৃষ্টিকর্তা। অফার এল চলচ্চিত্রে। হিরন্ময় সেনের ‘পাগল ঠাকুর’ ছবিতে ওই বয়সেই করলেন ছায়াদেবীর সঙ্গে অভিনয়। এই ছবিতে দেবশ্রীর মেজদি রানীর মা কৃষ্ণা রায় মুখার্জীও ভক্তিগীতি গেয়েছিলেন ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য্যর সঙ্গে। পিতা বীরেন্দ্র কিশোর রায়।

এরপর ‘বালক গদাধর’। সঙ্গে ছিলেন আরও খ্যাতনামা শিল্পী নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, বীরেন চট্টোপাধ্যায়, শমিতা বিশ্বাস, গীতা দে, শ্যাম লাহা প্রমুখ।

কিন্তু ছায়াদেবীর সঙ্গে রয়ে গেল সেই জীবনের শুরু থেকেই আজীবন সম্পর্ক। বড় হয়ে এই রুমকি-ঝুমকি ছায়া দেবীর শেষ জীবন অবধি মেয়ে হয়ে থাকেন। ছায়াদেবী তাঁদের কনক। কনকের পারলৌকিক কাজও তারা করেন।

একটু বড় হতে বিশাল সাড়া ফেলল দুই বোন রুমকি ঝুমকির নাচ গান। তখনকার সব বিখ্যাত জলসায় রুমকি ঝুমকির নাচ গান ছাড়া অনুষ্ঠান শুরু হতনা। স্কুলের পাশাপাশি মা আরতি রায়ের ইচ্ছেতেই নাচের জগতে প্রবেশ। মা ও বড়দি পূর্ণিমা রায় লাহিড়ীর কাছে নাচের প্রাথমিক পাঠ। এরপর নৃত্যগুরুমা বন্দনা সেন। ওড়িশি শিখেছেন কেলুচরণ মহাপাত্র’র কাছে।

এরপর একটু বড় হলে ‘কুহেলী’। সেখানেও সন্ধ্যা রায়ের মেয়ে হলেও সুমিতা সান্যাল থাকলেও ছায়াদেবীর কোলে চড়েই বেশী অভিনয়। বাড়ির নাম চুমকি। কিন্তু তখন জলসায় নাচে বিখ্যাত রুমকি রায় নামে। আর গানে উপরের দিদি ঝুমকি রায়। দুই শিশুশিল্পীর বেশ নাম হল গোটা বাংলায়।

উত্তম কুমারের সঙ্গে একটা ছবিতে কাজ হবার কথা হয়েও শেষ অবধি হয়নি। বিশাল আক্ষেপ মহানায়কের সঙ্গে কাজ করা হয়নি। কিন্তু এই রুমকি-ঝুমকি মহানায়ক মহানায়িকার সঙ্গে মঞ্চ একসঙ্গে শেয়ার করেছে। শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের খাতিরে অনেক মহানায়কের শ্যুটিং দেখেছেন। এমনকি মহানায়কের পাড়ার অনুষ্ঠানেও মহানায়কের ইচ্ছায় দুই বোন করেছেন অনুষ্ঠান।

উত্তম-সুচিত্রা ও সুব্রতা’র সঙ্গে মঞ্চভাগ করে ছোট্ট রুমকী রায় দেবশ্রী

এরমাঝে তরুন মজুমদার হিন্দি ছবি ‘বালিকা বধূ’র চরিত্রে কাস্ট করলেন রুমকিকে। কিন্তু রোলের তুলনায় সে বেশ ছোটো। তাই সেটা হলনা।

এরপর সদ্য প্রথম যৌবনে রুমকি রায়কে নিয়ে ছবি বানালেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়।নায়ক মিঠুন চক্রবর্তী। ‘নদী থেকে সাগরে’ শিশু শিল্পী রুমকির বড় বেলার অভিনেত্রী জীবন শুরু হল। আরো ছবি রুমকি রায় নামে ‘জীবন যে রকম’, ‘জি টি রোড’, ‘আগুনের ফুল্কি’, ‘লাট্টু’।

অন্যদিকে চিন্তামণি ছদ্মনামে তামিল ছবিতে চুমকি কাজ করে ফেলেছে। আশির দশকে মহানায়কের মহাপ্রয়ানে ভাঁটার টলিপাড়ায় প্রেম ভালোবাসা দুর্গাপুজো একরাশ আনন্দে একঝাঁক নবীন প্রজন্মের শিল্পীদের নিয়ে তরুণ মজুমদার ভরিয়ে দিলেন ‘দাদার কীর্তি’ ছবি উপহার দিয়ে। তনু বাবু বললেন, ‘মিসেস রায় রুমকি নামটা চলবেনা আজ থেকে ওর নাম দেবশ্রী।’ মহুয়া রায় চৌধুরীর পাশাপাশি ‘বয়েই গেছে’ গানে নতুন নায়িকার জন্ম হল দেবশ্রী রায়।

এরপর আবার মানু সেনের ছবি ‘সুবর্ন গোলক’ এ মহুয়ার বোন দেবশ্রী। অপর্ণা সেনের সাহসী ছবি ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ যা বাঙালি  মধ্যবিত্ত সমাজ গ্রহণ করেনি। কারণ কিছু সাহসী দৃশ্য। অথচ সেই ছবি অপর্ণা সেনকে ইংরেজিতে করতে বলেন স্বয়ং সত্যজিত রায়।

১৯৮১ সালের সমাজ এত উদারমনস্ক ছিলনা, তাই তখন এসব দৃশ্য বিশাল সমালোচিত হয়। দেবশ্রীর বয়সের তুলনায় রোলটা বিশাল সাহসী তখনকার সমাজে। দেবশ্রীকে সাংবাদিকরা বিতর্কিত প্রশ্ন করায় দেবশ্রী মন খারাপ করে এক কোনায় বসেছিলেন। ছবির প্রযোজক শশী কাপুর দেবশ্রীকে বলেছিলেন, ‘এরপর থেকে সবাইকে বলবে যা করেছি বেশ করেছি। আবার করবো।’

স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের সাথে

এই ছবি করেই বলিউডের ছবিতে ডাক পেলেন এবং বাংলা মূলধারার ছবিতে দাপুটে নায়িকা হয়ে উঠলেন দেবশ্রী। ত্রয়ী, সুরের আকাশে, পারাবত প্রিয়া, অপরুপা, প্রার্থনা – একের পর এক সফল ছবি করতে থাকেন।

মহুয়া রায় চৌধুরীর আকস্মিক প্রয়াণে তাঁর খালি জায়গায় যথার্থ নায়িকা হয়ে উঠলেন দেবশ্রী। বিশাল সুপার হিট হল ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’,‘চোখের আলোয়’, ‘ঝঙ্কার’, ‘ভয়’, ‘বেয়াদপ’, ‘জীবন যৌবন’ করলেন।

সত্যবতীর রোল করে বি আর চোপড়ার মহাভারতে সাড়া ফেলে দেন দেবশ্রী। এরপর বোম্বে থেকে ফিরে এসে ‘কলকাতার রসগোল্লা’। জামাইবাবু রাম মুখার্জীর পরিচালনায় রক্তেলেখা ছবিতে কবিতা কৃষ্ণমৃর্তির এই গান দেবশ্রীকে চুড়ান্ত জনপ্রিয়তা দেয়। যে গান আজও রসগোল্লা বাংলার শিরোপা পেলে বাজানো হয়।

এই দেবশ্রীকেই ঋতুপর্ণ ঘোষ দিলেন এক অন্য রূপ। একজন বানিজ্যিক নায়িকা সারা ছবি জুড়ে একটা দুটো ড্রেস টি শার্ট কি কালামকারি পরে অভিনয় করে গেলেন। যা তখন অনেককেই অবাক করে, এভাবেও ছবি হাউসফুল হয়।

একটা প্রশ্ন ওঠে একজন কমার্শিয়াল ছবির নায়িকা কি করে জাতীয় পুরস্কার পায়? যেখানে অপর্ণা সেন পাননি। কেন পাবেননা কিংবদন্তি পরিচালক অজয় কর,অসিত সেন,তপন সিনহার নায়িকা যিনি। কমপ্লিট নায়িকা দেবশ্রী।

– ‘মিঠুর ভালো নামটা জানো?’

– ‘কি যেন একটা ‘অ’ দিয়ে!’

– অদিতি

প্রসেনজিৎ-দেবশ্রী

বেদ মন্ত্রের পারদর্শী নারী অদিতি’র মতোই ‘ঊনিশে এপ্রিল’-এর অদিতি দেবশ্রীকে যেমন দিল সেরা নায়িকার জাতীয় পুরস্কার তেমন এ ছবি ও তার সাফল্যর সময়ই ভালোবাসার ঘর ভাঙল প্রশ্ন উঠল তাহলে কি ছিল খেলাঘর? যে প্রশ্নে কৌতুহলে আজও দেবশ্রী মিডিয়ার হাত থেকে রেহাই পান না।

অদিতি’র মতোই একা মেয়েও এগোতে পারে দেখিয়ে দেন দেবশ্রী, ‘দাহ’ করে ফেলেন সব যন্ত্রনা সৃষ্টির মাধ্যমে। যেন অদিতির মতো একক সিদ্ধান্তে অনঢ় থেকে জীবনকে নতুন ভাবে ছড়িয়ে দেন নটরাজ ট্রুপ কিংবা পশুপ্রেমী সত্তা সঙ্গে রাজনৈতিক দিক কিংবা ‘দেবশ্রী রায় ফাউন্ডেশান’ গড়ে তুলে। মিডিয়ার কোনো প্রশ্নবানে কৌতুহলে আর যে দহিতা হননা, তিনি অনেক উত্তোরণ ঘটিয়েছেন নিজের।

দেবশ্রী রায়ের দরকার পড়েনা প্রতি হপ্তায় আবোল তাবোল চরিত্রে অভিনয় করে ছবি রিলিজের,পেজ থ্রি পেজে মুখ দেখানোর তবু তাঁর এক ঝলক দেখা পেলেই মিডিয়া শিরোনাম করতে বাধ্য থাকে। শেষ নিখুঁত বাঙালি নায়িকা তো তিনিই।

কেন আজও মিডিয়া দর্শক এক নায়ক এক পুরুষ নিয়ে তাঁকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করে আজও?

রেহাই দিন। যে নায়িকার উচ্চতা এসবের অনেক উপরে। যার কাছে সুন্দরী হবার প্রতিযোগিতার পরীক্ষা দিয়ে গন্ডী পেরোতে হয়েছিল অর্পিতা পাল চট্টোপাধ্যায়কে।  জীবনে যিনি পেয়েছেন সেরার সেরা নায়কদের।

যাকে ক্যারিয়ারের শুরুতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আমার পাশে দাঁড়া তোর সঙ্গে হিরোদের মতো পোজ দিয়ে একটা ছবি তুলি।কোনদিন তোর নায়ক হতেও পারি।’

এবং উনি পরে হন দেবশ্রীর স্বামী টিভি তে ‘দেনা পাওনা’ ধারাবাহিকে।  বাংলার বাদশা রা বাদেও বলিউডের সর্বাধিক নায়ক এই টলি নায়িকার হিরো। জিতেন্দ্র, ওম পুরি, রাজ বাব্বার, ফারুক শেখ, গায়ক অমিত কুমার, অরুণ গোভিল, পঙ্কজ ধীর, হর্ষ ছায়া।

অন্যদিকে বাংলাদেশের আলমগীর, ফেরদৌস, ইলিয়াস কাঞ্চন যার নায়ক।  দেবশ্রী রায় সেই নায়িকা যাকে নায়কের কাঁধে ভর দিয়ে ছবি করতে হয়না। যিনি একাধারে নটী বিনোদিনী কাদম্বরী করেছেন।শ্রীদেবীর পাশেও যার উপস্থিতি উজ্জ্বল। ‘কাবুলীওয়ালার বাঙালি বউ’-এর নাম ভূমিকায় তাঁকেই ভাবেন লেখিকা সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

সুচিত্রা সেন, রেখা, দেবশ্রী রায়’রা স্বমহিমায় স্বগরিমায় উজ্জ্বল। পুরুষ নির্ভর নন এরা। জীবনের ভুল আক্ষেপ যন্ত্রনা এরা আবৃত করেন চোখের কাজল মাসকারায়, ঠোঁটে পুরু লিপস্টিকের আবেদনে। মনের ভার হালকা হন কেউ রামকৃষ্ণদেব তো কেউ সাঁইবাবার চরণাশ্রয়ে।

একা থাকা কোন অভিশাপ না, একাকিত্ব যাপন করতেও জানতে হয়। যা করে দেখিয়েছেন দেবশ্রী রায়। রোজ নতুন ভাবে শুরু করতে পারেন তিনি। রোহিণী আরেকবার লাগিয়ে নেন ব্লাশন চলতে থাকে জীবন চিত্রনাট্য ‘সিনেমায় যেমন হয়’।

দেবশ্রী ও শ্রীদেবী

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।