‘ডেড পয়েটস সোসাইটি’ ও একজন মোটিভেশনাল মেন্টরের খোঁজে

‘ডেড পয়েটস সোসাইটি’ ছবি নিয়ে কিছু লিখবো বলে ভাবি ততবারই প্রসঙ্গটা মগজে আবার কিলবিল করতে থাকে। এবারও সেই হৃদয়ে আটকে থাকা কথাগুলো বলার ব্যতিক্রম হবার জো নেই!

‘ডেড পয়েটস সোসাইটি’ মুভির সূত্র ধরে প্রথমেই আমি আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজের মেন্টরাশিপের ও মোটিভেশনাল টিচ করার অক্ষমতার বর্তমান দৈন্যদশার কিছু খন্ডিত বাস্তবতাকে তুলে ধরছি। মুভি রিভিউতে কেন এই প্রসঙ্গের অবতাড়না তা এই আলোচনা এগুতে থাকলে ক্রমেই বুঝতে পারবেন।

গত বছরের তরতাজা ঘটনাটা এত সহসাই কেউ নিশ্চয়ই ভুলে জাননি। আবরার খুন হলো সহপাঠীদের হাতে। সারাদেশে এই হত্যাকান্ড নিয়ে যখন তোলপাড় তখন বুয়েটের ভিসি স্যার দু’দিন হাজিরই হলেন না অফিসে। অন্যদিকে জগন্নাথের ভিসি স্যার তো শিক্ষকতা ছেড়ে যুবলীগের সভাপতি হতেই ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। ঢাবির ভিসি স্যার ১০ টাকার পেঁয়াজ, সমুচার গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে হাস্যস্পদ হয়েছেন। গোপালগঞ্জ ভার্সিটির ভিসি স্যারের পদত্যাগ চেয়ে সন্ত্রাসীদের প্যাঁদানি খেয়ে ক্যাম্পাস ছেড়ে জলে-বিলে আশ্রয় নিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। জাহাঙ্গীরনগরেও তো ভিসি-শিক্ষার্থী কম টানাপোড়েন হয়নি।

ভার্সিটি-কলেজগুলোতে ক্ষমতাশীন ছাত্র সংগঠনের ছেলেপুলেদের দাপটে শিক্ষকরা চুপসে থাকেন। এই সংস্কৃতিটা আগেও ছিলো, এখনও আছে। যখন ক্ষমতা যাহার শিক্ষকরা যেনো তাহার! অবশ্য মান্যবর শিক্ষক সমাজের টিকে থাকার জোরটা যেহেতু ওদের হাতে তখন তারা পদলেহি না হয়ে কি হবেন? শিক্ষক রাজনীতি আর অন্ধ আনুগত্য তাদের রূপান্তরিত করেছে নিধিরাম সর্দারে। কিসের মেন্টরশিপ আর কিসের মোটিভেশনাল স্পিচ!

খানিকটা নীচের স্তরে নামি। ওই কলেজ ও হাই স্কুল লেভেলটার কথাই ধরি। কোচিং আর প্রাইভেট টিউশনি বানিজ্য ওই পর্যায়ের শিক্ষকদের একেকজন ব্যবসায়ীতে পরিণত করেছে। বার বার বদল হওয়া নতজানু আর রোবোটিক ভবিষ্যৎমূখী শিক্ষানীতি এতে দিচ্ছে উৎসাহ। প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে উঠেছে কফিনে পেরেক ঠুকার সমতূল্য। আপনি মানুন আর না মানুন, যারা এসবে সংশ্লিষ্ট তারা কোনও না কোনওভাবে শিক্ষক।

পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই দেখা যায়, পেশাগত বিভিন্ন দাবী-দাওয়ায় আন্দোলনরত প্রাইমারী স্কুলের বয়োজোষ্ঠ শিক্ষকদের চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। এতদিনেও শিক্ষার আঁতুরঘর প্রাইমারী পর্যায়ের শিক্ষকদের দৈন্যদশায় ওই স্তরটা হয়ে উঠেছে ভগ্নদশার।

বেশ আছেন সরকারী প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষকরা। আমরা মধ্যবিত্ত জাতে উঠা শ্রেণী বহু আগেই যেই জায়গাটাকে নিজেদের সন্তানদের জন্য পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছি। সেখানে এখন পড়তে যায় কুলি-মজুর, কৃষক-শ্রমিক জনতার আম পাবলিকের ছেলে মেয়েরা। যারা ক্লাস ফাইভের আগেই ঝরে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে! শুনেছি সরকারী প্রাইমারী স্কুলে চাকরি পেতে না কি লাখ-লাখ টাকার বান্ডিল হাতে এম্পি-মিনিস্টার, নেতা-পাতিনেতাদের পেছনে ঘুরতে হয়।

মধ্যে থেকে কি হচ্ছে? একটার পর একটা মানসিক শক্তিহীন ধ্বসে যাওয়া প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। মূল্যবোধহীন, সজনশীলতা আর নিজ অধিকার বুঝতে অক্ষম একেকটা প্রজন্ম। আটকে যাচ্ছে আত্মকেন্দ্রীকতার গন্ডিতে। কোথায় তাদের মোটিভেশনাল মেন্টরশিপ? এ শুধু বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার এক বিরহ বিলাপ!

এতোসব কথার অবতাড়না প্রায় ৩০ বছর আগে সেই ১৯৮৯ সালে নির্মিত ড্রামা মুভি ‘ডেড পয়েটস সোসাইট’-এর সূত্র ধরে। আমার দেখা অন্যতম সেরা মোটিভেশনাল সিনেমা। মুগ্ধতায় ভালোবেসেছিলাম রবিন উইলিয়ামস নামের এক অসাধারণ প্রয়াত অভিনেতাকে। কত আগে দেখেছিলাম! অথচ রবিন অভিনীত জন কিটিং নামের এক প্রথা বিরোধী মহান শিক্ষকের সেইসব মোটিভেশনাল সংলাপগুলো আজোও যেনো কানে বাজে। রবিনের অসাধারণ অভিনয়ে সেই সময়ের এক ছাত্রের জীবন্ত এক মেন্টরে পরিনত হয়েছিলো কিটিং।

মুভিটি এঁকঘেয়েমিপূর্ন প্রথাগত শিক্ষা কালচারে অভ্যস্থ আমেরিকার এক স্কুলের জন কিটিং নামের এক অদ্ভুত ইংরেজী ক্লাশের শিক্ষককে নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। যিনি তার ছাত্রদেন প্রচলিত পড়ালেখার স্টাইলটাই চেঞ্জ করে দেন। সাধারন পড়ালেখার বাইরে তিনি শিক্ষার্থীদের মনন ও মানসিকতাকে বিকশিত করতে অনেক উদ্বুদ্ধমূলক কথা ও গল্প বলেন। তিনি সূক্ষ্মভাবে তার ছাত্রদের মনে অবচেতনভাবে তিনি ছাত্রদের মধ্যে জানার আগ্রহ, স্বপ্ন দেখার আগ্রহ সৃষ্টি করেন।

তাঁর ব্যতিক্রমী প্রচেষ্টায় ছাত্ররা জীবনকে সম্পূর্ন নতুন ও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সুযোগ পায়। জন কিটিং নিজেকে শিক্ষক নন, ছাক্রদের ক্যাপ্টেন হিসেবে পরিচয় দিতে আনন্দবোধ করেন। তিনি ছাপার অক্ষরের কবিতা নয়, কবিতার ভেতরের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতেন।

মুভিটার স্টোরিটেলিং ও ডায়ালগগুলো এতই অসাধারন যে এটি দেখতে দেখতে আপনিও আপনার জীবনে এমন একজন শিক্ষকের অভাব অনুভব করবেন যার ছোঁয়ায় হয়তো আপনার গোটা জীবন ও জীবনদর্শনই বদলে যেতো!

অস্কারে একগাদা নমিনেশন পেয়েও দারুন এই ছবিটার কপালে জুটে কেবল সেরা স্ক্রিন প্লের খেতাব। টম স্কালম্যানের স্ক্রিন প্লে আসলেই লা জওযাব ছিলো। পরিচালনায় পিটার ওয়ির দারুন মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। প্রয়াত লিজেন্ডারি অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস শিক্ষক জন কিটিংয়ের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। এই মুভিতে তিনি হয়তো অস্কার জেতেননি কিন্তু জিতে নিয়েছেন দর্শকের মন। মুভিটির শেষ সিকোয়েন্সে তার অভিনয় হৃদয়স্পর্শী হয়ে আছে আজোও। সত্যিকারের মুভিপ্রেমীদের কাছে এমনিতেই তো আর তিনি কমনলি প্রিয় অভিনেতা হননি!

এই মুভিটা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবার উপলব্ধি করতে পারলাম আজ আমাদের নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রয়োজন কয়েকজন জন কিটিং। যারা ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনে মেন্টর হয়ে দেখা দিবে। যারা তাদেরকে বোধবুদ্ধিসম্পন্ন, মূল্যবোধসম্পন্ন ও ক্রিয়াশীল এক জীবন গড়তে আর সুন্দর আগামীর প্রত্যয়ে গড়ে তুলবে। যারা প্রথার বাইরে গিয়ে, শিক্ষা বাণিজ্যের লাভ-লোকসানের হিসেব-নিকেশ থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক শিক্ষায় আলোর পথে পরিচালিত করবে নিজেদের হাতে গড়া শিক্ষার্থীদের।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।