রিকশাচালকের মেয়ের স্বর্ণ জয়ের গল্প

জলপাইগুঁড়ি জায়গাটার জন্য এমন আনন্দের উপলক্ষ্য আগে খুব কমই এসছে। দরিদ্র রিকশাচালকের মেয়ে স্বর্না বর্মনের সোনা জয়ে আনন্দে ভাসছে তাঁর নিজ শহর জলপাইগুড়ি। প্রথম ভারতীয় নারী হিসেবে স্বপ্না বর্মন এশিয়াডের সবচাইতে কঠিন ইভেন্ট হেপ্টাথলনে স্বর্নপদক জিতেছেন।

ইন্দোনেশিয়ায় স্বপ্নার এই ইতিহাস সৃষ্টির পরই রাস্তায় বের হয়ে এসে, মিষ্টি বিলিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে জলপাইগুঁড়ির সাধারণ মানুষ। নিজ গ্রাম ঘোষপাড়ায় তার জীর্ণ কুটিরেও মানুষের উপচে পড়া ভীড়।

তাঁর মা বাসনা খবর শুনে আনন্দের আতিশয্যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। মেয়ের সাফল্যের জন্য সব কাজকর্ম রেখে দরজা বন্ধ করে দুপুর থেকে স্বপ্নার তৈরি কালি মন্দিরে প্রার্থনারত ছিলেন মা বাসনা।

তিনি বলেন, ‘আমি ওর পারফরমেন্স দেখিনি। দুপুর দুইটা থেকেই আমি ওর জন্য প্রার্থনা করছিলাম। এই মন্দিরটি আমার মেয়ে শুধু আমার জন্য তৈরি করেছে। কালি দেবির উপর আমার অগাধ বিশ্বাস। যখন খবরটা শুনলাম, নিজেকে আমি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি নি।’

‘স্বপ্নার বাবা একজন রিকশা চালক ছিলেন। কিন্তু বছর কয়েক ধরে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছেন । এটা ওর জন্য সহজ ছিলো না। আমরা কখনোই তার চাওয়া পূরণ করতে পারিনি; কিন্তু এ নিয়ে কোনদিন ওর কোন অনুযোগ ছিলো না।’, আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলেন স্বপ্নার মা।

জন্মগতভাবে স্বর্নার উভয় পায়ে ছয়টা করে আঙুল থাকায় প্রতিযোগিতার জন্য সঠিক মাপের জুতা পাওয়া খুব কঠিন ছিলো। অতিরিক্ত দৈর্ঘ্যের কারণে পা ফেললে ব্যথা হতো এবং খুব দ্রুত সে অবসন্ন হয়ে পড়তো। সরঞ্জামাদি কেনাটাও তার জন্য খুব কঠিন ছিলো। কথাগুলো বলছিলেন স্বর্নার শৈশবের কোচ সুকান্ত সিনহা।

রাজ্য পর্যায়ও কখনো পাড় করতে পারেননি এই কোচ। তাঁর সর্বোচ্চ অর্জন, ১৯৮০ সালে বাংলায় আন্তঃজেলা ট্রিপল জাম্প ইভেন্টে তৃতীয় স্থান লাভ। তিনি বলেন, ‘আমি তার কোচ ছিলাম ২০০৬ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত। সে খুব দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা মেয়ে। ফলে ট্রেনিংয়ের ব্যয় বহন করা তার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ছিলো। যখন সে ফোর্থ স্ট্যান্ডার্ডে ছিলো, তার মধ্যে একটা তেজ দেখতে পেয়েছিলাম  ফলে আমি তাকে ট্রেনিং দিতে শুরু করি।’

তিনি আরো যোগ করেন, ‘সে প্রচণ্ড জেদি ছিলো আর এটাই তার সাফল্যকে এনে দিয়েছে। আমাদের রায়কত পাড়া স্পোর্টি এসোসিয়েশন তাকে জুতা ও বিভিন্ন সরঞ্জামাদি দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। আজকে আমি যে কত খুশী তা বলে বোঝানোর ভাষা আমার জানা নেই।’

চার বছর আগে এশিয়াডে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করেছিল স্বর্না। সে সময় ৫১৭৮ পয়েন্ট নিয়ে একজন টিনএজার হিসেবে ১৫ তম হয়েছিল। গত বছর এশিয়ান এথলেটিক চ্যাম্পিয়নশিপেও সে খুবই উজ্জ্বল ছিলো, যেখানে সে স্বর্ন জয় করেছিল।

হেপ্টাথলন হলো এশিয়াডের সবচাইতে কঠিন প্রতিযোগীতাগুলোর একটি। সাতটি ইভেন্টে প্রতিযোগিতাটি হয় যা দুদিন ধরে চলে। প্রথম দিন হয় ১০০ মিটার দৌড়, উচ্চলাফ এবং ২০০ মিটারের শ্যূট। আর দ্বিতীয় দিনে আছে দৌড় লাফ এবং ৮০০ মিটারের তীর নিক্ষেপ।

– দ্য কুইন্ট অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।