প্রবাসে ‘কাস্টোমাইসড’ ঈদ

পৃথিবীর সমস্ত মানুষ দুনিয়া দেখে তার নিজের চোখে, নিজের অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশের কোনো অঁজপাড়াগাঁয়, জানুয়ারির কোন এক সন্ধায় উঠানে বসে, খড়-পাতা পুড়িয়ে তার পাশে বসা এক বৃদ্ধের শীতের অনুভূতি আর একই সময়ে, একই পৃথিবীতে, তুষারপাতে পা আটকে যাওয়া শিকাগোর কোন রাস্তায় চলতে থাকা পঞ্চাশোর্ধ লোকটির অনুভূতিতে বিস্তর পার্থক্য।

এ তো বললাম ভিন্ন ভিন্ন সিচুয়েশনের কথা। এমনকি একই দেশে, একই জায়গায়, একই সময়ে বাস করা মানুষের কোন ঘটনার অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধি সম্পূর্ণ আলাদা কারণ দিনশেষে প্রতিটা মানুষ খুব বেশি ইউনিক। তাই আমার এই লেখাটি আমি খুব বেশি জেনারালাইজ্‌ড করার বৃথা চেষ্টা করছি না। এটা মোর অর লেস আমার অভিজ্ঞতায় প্রবাস জীবনে ঈদ হতে যাচ্ছে, যার অনেকটা অংশ জুড়ে আমি চেষ্টা করবো আমেরিকা জুড়ে ব্যাঙের ছাতার মত ছড়িয়ে থাকা আমার অসংখ্য বন্ধুদের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করার, টু ড্র দ্য বিগার পিকচার, ইভেন অন আ স্মল স্কেল।

আমার আমেরিকা বাসের দেঁড় বছর পূর্ণ হবে এই জুলাইয়ে। টাইমফ্রেম অনুযায়ী এমন কিছু বেশি সময় না এটা, কিন্তু অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে গেলে আমি বলবো অলমোস্ট এ লাইফ টাইম। যাই হোক, এবারের ঈদ আমার প্রবাস জীবনে তৃতীয় ঈদ।

আমি আমেরিকা আসি জানুয়ারিতে। মিয়ামি ইউনিভার্সিটি, অক্সফোর্ড, ওহিও। খুবই কনফিউজিং একটা নাম কারণ ভার্সিটির নামে মিয়ামি থাকলেও ইউনিভার্সিটিটা মোটেও ফ্লোরিডায় নয়, বরং ওহিওতে। বাঙালিবহুল জায়গা বলতে যা বুঝায় অক্সফোর্ড তার ঠিক বিপরীত। ছিমছাম, অস্বাভাবিক পরিষ্কার এবং সুন্দর ছোট্ট একটা শহর যার অলমোস্ট পুরোটা গড়ে উঠেছে পার্টি স্কুল মিয়ামিকে কেন্দ্র করে।

এখানে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টের ৮০ ভাগ চাইনিজ এবং ফ্যাকাল্টিদের আন্ডা-বাচ্চাসহ বাঙালি হেড কাউন্ট সাকুল্যে ৩০ জন হবে মাত্র। সো অন্যান্য বড় শহরের মত এখানে ইভেন কোন মসজিদও নেই। ভার্সিটির একটা বেশ বড় সুন্দর রুম মুসলিম প্রেয়ার রুম হিসাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে যেখানে রেগুলার নামাজের কাছ সারা হয়। সুতরাং, এরকম একটা শহরে আর যাই হোক, বাঙালির ঈদের আমেজের ছিঁটেফোঁটাও আসে না, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

যাই হোক, আমাকে যদি বলা হয় আমি কি ঈদ খুব বেশি মিস করি? উত্তর সম্ভবত হবে ‘না’। আমার অভিজ্ঞতা বলে শৈশব থেকে কৈশোর আর সেখান থেকে যৌবনে পা দেওয়ার সাথে সাথে ঈদের আনন্দগুলো এক্সপোনেনশিয়ালি কমতে থাকে। একটা পর্যায়ে ঈদ হয়ে যায় সপ্তাহজুড়ে অবিশ্বাস্য রকমের খাওয়া, দাওয়াত আর সামাজিক দেখা-সাক্ষাতের একটা অজুহাত মাত্র।

শৈশবের ঈদ শুরু হয় ঈদের বেশ কিছুদিন আগে থেকে। নতুন জামা সবার কাছ থেকে যেভাবেই হোক লুকিয়ে রাখার যে অনুভব, সেই পাঁচ টাকার সালামির আনন্দ, দিনশেষে বন্ধুরা মিলে কার সালামি কত সেই নিয়ে বোস্টিং, পাড়ার ছেলেরা মিলে ছোট্ট ছোট্ট কার্ডের দোকান দিয়ে নিজেদের ব্যাপক বিজনেস ম্যাগনেট মনে করা- সেসব ঈদ এই আটপৌড়ে জীবন ছেড়ে গেছে বহু আগেই, তার জন্য আমেরিকা আসার দরকার পড়ে নি।

তবে হ্যাঁ, যৌবনের রমজান হল শৈশবের ঈদ। ঢাকায় রমজানে আত্মীয়স্বজনের বাসা থেকে শুরু করে বন্ধুর বাসা, মোহাম্মদপুর থেকে শুরু করে গুলশানের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে  ইফতার, সেহরির সময় বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট হান্টিং এবং মনে মনে নিজেকে ব্যাপক কুল ডুড ভাবা এবং ঈদের জাস্ট তিন-চারদিন আগে ঢাকার আজন্ম সাধনার ধনরূপ খালি রাস্তায় রাত ১২টা-১টায় গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে বন্ধুরা মিলে সব কিছু চষে ফেলার যে আনন্দ, তার সাথে খুব কম কিছুর তুলনা চলে। এই বস্তু মিস না করে উপায় নাই।

দেশে থাকতে আমার এই ধরণের কর্মকান্ডের আহবানের শুরু হত সাধারণত একটিমাত্র লাইনে। ফেইসবুকে ফ্রেন্ডদের জড় করে নক দিতাম, ‘আজ রাতে কোন রূপকথা নেই?’। আমার প্রবাস জীবনের ঈদ তথা রমজান এই একটিমাত্র প্রশ্নের নেতিবাচক দীর্ঘশ্বাসে বলে দেয়া যায়। এখানে রোজার সময় ব্যাচেলরদের ইফতার সঙ্গী হয় কখনো নুডল্‌স, হয়তোবা কিছু ফল অথবা ভাত-মুরগী। গতবার যেহেতু আমার প্রথম রোজা ছিল প্রবাসে, ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে বেশ অনেকবার ইফতারি বানিয়েছিলাম।

কাজটা কঠিন কিছু না, জাস্ট খুব বেশি টায়ারিং। এখানে পেয়াজ মরিচ কেটে দেয়া বা ডাল বেটে দেওয়ার জন্য যেমন মাজেদা খালারা থাকে না, তেমনি রান্নার পর সমস্ত বাসন কোসন নিজের পরিস্কার করতে হয়। বেশিরভাগ স্টুডেন্টই থাকে অ্যাপার্টমেন্ট শেয়ার করে সো ‘আমার ময়লা আমি যখন খুশি পরিষ্কার করুম, তোর কি?’ এই অ্যাটিচিউড ও খাটে না। সুতরাং ব্যাচেলরদের ছোলা-পিঁয়াজুর ইফতারি বলতে গেলে একমাত্র তখনই হয় যখন কোন বাঙালি ফ্যামিলি থেকে দাওয়াত আসে। আরেকটা অভিনব কমন ব্যবস্থা সপ্তাহান্তে প্রায়শই হয়ে থাকে, যার নাম পটলাক। বাংলাদেশে এই জিনিস সম্ভবত ‘পটলাক’বা ‘ওয়ান ডিশ পার্টি’ নামে পরিচিত।

এখানে প্রতিটা বাসা থেকে কিছু একটা রান্না করে এনে সবাই একসাথে সেটা খাওয়া হয়, তাতে সবার উপর প্রেশারও কম পড়ে। এখানে বাঙালি কমিউনিটির বছর জুড়ে ফান, রমজানের ইফতার আর ঈদের খানাদানা-সবকিছু হয় ঐ পটলাকের মাধ্যমে।

ঈদের সকাল শুরু হয় সেইম নামাজের মধ্য দিয়ে। শুধু হাজারখানেক মানুষের বদলে সামিল হয় সাকুল্যে ৩০ জন, তাদেরও সবাই বাংলাদেশি না। এরপর কোন একটা বাসায় দুপুরে ঈদের পটলাক, আড্ডা, গান। সব মিলে মোটেও খারাপ কিছু না। সবকিছুই হয়, তবে খুব সীমিত একটা স্কেলে, একটা মাপা গণ্ডিতে। এই চেহারা ফ্লোরিডা, নিউইয়র্ক, মিশিগান বা টেক্সাস এ মোটেও এমন না।

সেখানের বেশিরভাগ বাঙালি কমিউনিটিতে দু’শোর বেশি মানুষ, সো ছোট ছোট অনেক গ্রুপিং ও বিদ্যমান। এই জায়াগাগুলায় ঈদ মোটামুটি বাংলাদেশের ঈদের মতই। শুধু নিকট আত্মীয়ের জায়গায় চারপাশে ঘিরে থাকে জীবনের প্রয়োজনে এক হওয়া একরাশ মানুষ। ট্রাস্ট মি, দিস ইজ নট দ্যাট ব্যাড! শুধু ঈদের ‘আমেজ’ বলতে যা বোঝায় তার ছিটেফোটাও নেই। এখানে ঈদ হয় একদিনের, সেই দিনটিও পরতে হয় হলিডেতে, নাহলে ভার্সিটি, এক্সাম সবই চলে এবং বাঙালিরা তাদের কাছাকাছি উইকেন্ডে ঈদ ডে প্রাগ্রাম শিফ্‌ট করে নেই।

এর সবই অলমোস্ট কুরবানির ঈদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এখানে কুরবানি বলতে কিছু নেই, অতি আগ্রহী কেউ থাকলে সে হয়তো ২-৩ হাওয়ার ড্রাইভে কোথাও কুরবানি দেয়া সম্ভব হলে তা দিয়ে মাংস নিয়ে আসে। সে ঝামেলাই ৯০% বাঙালি যায় না। হালাল মার্কেট থেকে কেনা গরুর মাংস খেয়ে সবাই ভাব করতে থাকে, আহ, কুরবানির মাংসের মতই তো মজা।

শেষ করার আগে বলতে চাই, সারাজীবন শুনে এসেছি, বিদেশের জীবন অন্যরকম, আলাদা। কিন্তু সেটা যে ঠিক কোনস্কেলে, এটা বই পড়ে বা মুভি দেখে বোঝা যায় না। এখানে সমস্ত কিছু একা করতে হয়, রান্নাবান্না, লন্ড্রি, ড্রাইভিং, গ্রোসারি – এভ্রিথিং, যার সিকিভাগ ও আমাদের বয়সী ব্যাচেলররা বাংলাদেশে করে আসে নি। সো এখানকার জীবন প্রচণ্ডভাবে কাস্টোমাইজড। ঈদও এর বাইরে না।

এখানে ছুটি অনুযায়ী ঈদের প্রোগ্রাম কাস্টোমাইজড হয়, ওয়েদার অনুযায়ী ঈদের ভেন্যু ইন্ডোর না আউটডোর, সেটা ডিসাইড হয়, অ্যাভেইলেবিলিটির উপর ডিসাইড হয় ঈদের মেন্যু। দিনশেষে একান্ত নিজের মত করে লাইফ লিড করার স্বাধীনতা, মোটামুটি যোগ্য এবং লাকি হলে মাস শেষে একটা ডিসেন্ট অ্যামাউন্টের সেভিংস, নিজের গাড়ি, চাকরি শুরু করে সামান্য স্টেবল হয়েই নিজের বাড়ি, এক-দেশ পরিমাণ ডিস্টেন্স ৭-৮ ঘন্টায় পাড়ি দেয়া সহ অসংখ্য হাতছানি প্রবাস জীবন, আমেরিকার জীবন আমাদের অফার করে।

সে জিনিসগুলো উপভোগ করতে লাইফের যে কাস্টোমাইজেশান, এইটুকু অভিযোজন করা, এইটুকু ছাড় দেয়া প্রবাস জীবনে অতি আবশ্যক। এবং এতে অভিযোগেরও কোন কারণ নেই, থাকা উচিৎ না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।