সমালোচনা করুন, তাচ্ছিল্য নয়

বজ্রপাতে মৃত্যুর খবর থেমে গিয়েছিল। কিন্তু শনিবার রাত থেকে মনে হচ্ছে, ভয়ঙ্কর এক বজ্রপাত হয়েছে। যে বজ্রপাতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মৃত্যু হয়েছে!

জাস্ট আ ক্রিকেট ম্যাচ, গাইজ। দ্যাট ঠু, আ টি-টোয়েন্টি। জীবন-মরণ যুদ্ধে বাংলাদেশ হেরে যায়নি। দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়নি। একটা ম্যাচ হেরেছে। বাজে ভাবে হেরেছে। হতাশাজনক। খুবই দু:খজনক। খারাপ লাগারই কথা। কিন্তু দুনিয়ার শেষ হয়ে যায়নি।

অনেককে অনেক লজ্জা পেতেও দেখছি দলের হারে। এত লজ্জা থাকলে খেলাধুলা নিয়ে ভাবাই ঠিক না। কারণ, খেলার সঙ্গে লজ্জা যায় না। জাতি হিসেবে আমাদের অনেক ব্যর্থতা আছে, ব্যক্তি হিসেবে আছে, সেসব নিয়ে লজ্জা থাকা উচিত। একটা খেলায় হার-জিত নিয়ে নয়। প্রতিপক্ষ যে দলই হোক না কেন। অভাবনীয় অনেক কিছু হয় বলেই খেলাধুলার জগত সুন্দর। ‘লজ্জা’ ধরণের শব্দের ব্যবহার এই সৌন্দর্যকে কেবল কলুষিতই করে। আর আফগনিস্তানের কাছে টি-টোয়েন্টি হার তো খুব অপ্রত্যাশিতও নয়!

সমালোচনা হতে পারে। হবে। সবাই বোদ্ধা হবে, সেটাও বলছি না। অনেকেই আবেগ দিয়ে বলবে, হাস্যকর কিছুও বলবে। সবই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু একটা বাজে ম্যাচেই গালাগালের তোপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ, গান গাওয়া নিয়ে খোঁচা – এই অসভ্যতার শেষ কোথায়?

আমার সবচেয়ে হাসি পায় হিপোক্রেসির লেভেল দেখে। শুধু এই সিরিজ নয়, অনেক দিন ধরেই অনেককে বলতে শুনেছি ও দেখেছি, টি-টোয়েন্টিতে আফগানিস্তান আর বাংলাদেশের যা অবস্থা, তাতে আফগানদের সঙ্গে বাংলাদেশ পারবে না। এই সিরিজ ওয়ানডে থেকে টি-টোয়েন্টিতে রূপ নেওয়ার পরও চারপাশে হাহাকার দেখেছি, ‘সর্বনাশ, বাংলাদেশ তো পারবে না।’ তাহলে তো মানসিক প্রস্তুতি থাকারই কথা। কিন্তু হারের পর দেখছি, খাঁটি বাংলায় বললে, ‘ঠাডা পড়ছে!’

আবারও বলছি, হারের ধরণটা হতাশার ছিল। সমালোচনাও খুবই যৌক্তিক। কিন্তু গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়।

ম্যাচ হেরেছি যখন, ভুল তো কিছু ছিলই। অনেক ভুলই ছিল। শেষ দিকে বোলিং খুব বাজে হয়েছে। ম্যাচটা হাতছাড়া হয়েছে ওখানেই। এই স্লো ও লো উইকেটে ১৬৮ তাড়া করা অনেক কঠিন। তার পরও হতে পারত, যদি সাকিব-তামিম-মুশি দারুণ কিছু করতেন।

তামিমকে যতদূর চিনি ও বুঝি, তার ব্যাটিং ও সাইকোলজি, হয়ত খুব বেশি ভাবছিলেন। অনেক কিছু ভাবছিলেন। বেশি ভাবছিলেন বলেই বল টু বল ফোকাস করার যে ব্যাপার ছিল, সেটি নড়ে গিয়েছিল। অনেক ভাবনায় পাজলড হয়ে গিয়েছিলেন বলেই হয়ত প্রথম বলেই মুজিবকে সু্ইপকে করতে গিয়েছিলেন। কাজটা কঠিন। মুজিবের বল বাতাসে যেমন মনে হয়, তার চেয়ে একটু দ্রুত চলে আসে এবং ডিপ করে। যেটা এক্ষেত্রে হয়েছিল, দ্রুত চলে আসে বল। তামিম যখন বুঝতে পেরে শোধরাতে চেয়েছেন, ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

সাকিবের শট সিলেকশন আরেকটু ভালো হতে পারত। তবে ওই রান তাড়া করতে হলে, শুরুতে দ্রুত রানের বিকল্প ছিল না। সাকিব সেই চেষ্টায় ছিলেন।

মুশফিকের আউটও আমি মনে করি পুরো সাইকোলজিক্যাল গেমের অংশ। হয়ত শুরু থেকেই রশিদকে আনসেটল করতে চেয়েছিলেন। তবে রশিদের যে কুইক আর্ম অ্যাকশন এবং যে পেসে বল করে, তাকে সুইচ হিট খেলা খুব কঠিন। অসম্ভব নয়, কঠিন। রিভার্স সুইপ বা সুইচ হিট, বাংলাদেশে সবচেয়ে ভালো খেলেন মুশিই। কিন্তু হয়ত ভুল বোলারকে ভুল সময়ে বেছে নিয়েছিলেন। অন্য বোলারকে চেষ্টা করতে পারতেন, কিংবা রশিদকে খেললেও আরেকটু পরে চেষ্টা করতে পারতেন। সাব্বির যেমন ভুল করেছেন শুরুতেই রশিদকে শাফল করে খেলত গিয়ে। তার গুগলি এত দ্রুতগতির যে শাফল করে খেলা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।

ক্রিকেটের মতো সাইকোলজিক্যাল খেলা আর নেই। তামিম-মুশিরা সেই সাইকোলজিক্যাল গেমে এদিন ভুল করেছেন। এই তো। ক্রিকেটে এসব তো নিয়মিতই হয়। এক ভুলেই সব শেষ হয়ে যায়নি।

একজন বোলার ওভারে ১ রানে ২ উইকেট নেওয়ার পর তাকে আরেক ওভার বোলিং দিতে ইতিহাসের সেরা ক্যাপ্টেন হতে হয় না। সবাই এটা বোঝে। সাকিব এতটুকু বুঝবেন না? কিন্তু সেটা যখন করেননি, নিশ্চয়ই কারণ ছিল, কোনো ভাবনা ছিল!

সাকিব ম্যাচ শেষে বলেছেন, মাহমুদউল্লাহকে বোলিং দিলে যদি মার খেত, তখন প্রশ্ন করা হতো, কেন মূল বোলারদের বোলিং দেওয়া হলো না। ঠিক যেটা হয়েছিল নিদাহাস ট্রফির ফাইনালে। সৌম্য ভালো বোলিং করছিল, তাকে চালিয়ে যাওয়ায় সাকিবকে তুলোধুনো করা হয়েছিল।

আমি অবশ্যই রিয়াদকে আরেকটি ওভার দিতাম। কালকে যেমন উইকেট ছিল, যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে আরেক ওভার অন্তত দেওয়া উচিতই ছিল। এটা আমি বুঝলে সাকিবের না বোঝার কারণ নেই। কিন্তু তিনি হয়ত অন্যভাবে ভেবেছেন। ওই সময় পেসাররা যদি ভালো করে ফেলত, আজকে সাকিবের দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা হতো। অধিনায়কদের জীবনটাই এমন।

সিদ্ধান্ত পক্ষে আসেনি, সমালোচনা হবেই। কিন্তু এভাবে গালিগালাজ কোনো পরিস্থিতিতে, কোনো সময়ই গ্রহণযোগ্য নয়। একটা-দুটা সিদ্ধান্ত কাজে লাগেনি বলেই সাকিব বাজে ক্যাপ্টেন, কিছু বোঝে না? একটা ছেলে এক যুগ ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে, ১০ হাজার রান আর ৫০০ উইকেটের ডাবলের দুয়ারে দাঁড়িয়ে, সেই ছেলে কি অতটুকুও বোঝে না, যেটা আমজনতা বোঝে? খুব সূক্ষ্য কোনো টেকনিক্যাল ভুল ধরা হলেও নাহয় বুঝতাম। আমজনতা যে সাধারণ ব্যাপারটি বোঝে, সাকিব সেটা বোঝেন না? স্রেফ তিনি এদিন অন্য ভাবে ভেবেছেন। কাজে লাগেনি।

হতে পারে, হারের পেছনে সেটির বড় ভুমিকা। তো? একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ, আর কিছু নয়! আজ লাগেনি, কাল লাগবে কাজে। সিম্পল।

আবারও বলছি, সমালোচনা হবেই। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ মেনে নেওয়ার মতো নয়!

সাকিবের কোনো সিদ্ধান্ত কাজে না লাগলে বা বাজে শট খেললে, ওই ম্যাচে বাংলাদেশ হারলে যেভাবে সাকিবকে শূলে চড়ানো হয়, যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়, যেভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়, যেভাবে অপমান করা হয়, সেসবে আমি সাকিবের প্রতি ভালোবাসা কিংবা ভালোবাসা থেকে সৃষ্ট অভিমান দেখি না। কিংবা সাকিবের ভালো চাওয়া থেকে বা দেশের ক্রিকেটের প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা দেখি না। দেখি সাকিবের প্রতি অন্ধ আক্রোশ। তাকে নিতে না পারা, সহ্য করতে না পারা। এক শ্রেণীর তথাকথিত সমর্থক আছে, যারা সাকিব ও বাংলাদেশের ব্যর্থতার আশায় বসে থাকে। দুটি একসঙ্গে মিলে গেলেই চালায় চাবুক – খুবই দু:খজনক, কিন্ত খুবই সত্যি।

এটার কারণ হয়ত সেই পুরোনো চর্বিতচর্বন, সাকিবের যে অ্যাটিটিউড, সাকিবের যে ধরণ, এটা অনেক নিতে পারে না। তারা নিজেরা একেকজন হাড়ে হাড়ে বদ, নিজেরা কিছুই পরোয়া করে না, কিন্তু সাকিবকে হতে হবে তাদের মনের মতো, পুতু পুতু। তারা সাকিবের অর্জন, মাইলফলক এসব নিতে পারে। ‘ক্যারেকটার’ সাকিবকে নিতে পারে না। কিন্তু ‘ক্যারেকটার’ সাকিবকে ছাড়া ক্রিকেটার সাকিব যে কিছুই না, এটা আর কবে বুঝবে তারা?

অ্যাপার্ট ফ্রম ম্যাশ, সাকিব হ্যাজ দা স্মার্টেস্ট ক্রিকেট ব্রেইন ইন বাংলাদেশ। আগে অসংখ্যবার প্রমাণ দিয়েছেন। এক শ্রেণির উজবুক তবু প্রতি ম্যাচেই প্রমাণ চায়। সব ম্যাচেই কাজে লাগলে তো সে ক্রিকেটার নয়, মহামানব ধরণের কেউ হতো!

এই তো, মাত্র আগের সিরিজেই এই দলকে নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না। নিদাহাস ট্রফিতে তামিম, মুশিদের পারফরম্যান্সে প্রশংসার তুবড়ি ছুটেছে। এক ম্যাচেই তারা ভিলেন। ইনজুরির ধকলের পর প্রাপ্য বিশ্রাম না কাটিয়ে সাকিব ছুটলেন শ্রীলঙ্কায়। ড্রেসিং রুমে এমন বৃক্ততা দিলেন, সবার মনোবল আকাশ স্পর্শ করল। দলের অনেক ক্রিকেটার বলেছিলেন, সাকিবের ওই বক্তৃতার পর সবাই দারুণ উজ্জী্বিত হয়ে গিয়েছিলেন। আজ এক ম্যাচ পরই সাকিবের নেতৃত্ব চলে না।

বিপিএলে পাঁচটা বিদেশি খেলাবেন। আর কোনো টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট নেই। এই ফরম্যাটে উন্নতি কি হাওয়া থেকে হবে?

এটুকু অন্তত বুঝতে হবে, ন্যাচারাল অ্যাবিলিটি ও ফিজিক্যাল অ্যাবিলিটি মিলিয়ে টি-টোয়েন্টিতে আফগানিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। তার মানে এই নয় আমরা পারব না। আমাদের ঘাটতিগুলো ঢেকে দিতে হবে টিম এফোর্ট দিয়ে। শরীরী ভাষা দিয়ে। এভাবেই আমরা আগে পেরেছি। এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টিতে পেরেছি, নিদাহাস ট্রফিতে পেরেছি। আবার না পারার কারণ নেই।

এখনও সিরিজ জয়ের সুযোগ আছে। ধরলাম সেটি হলো না। কিংবা ৩-০ তে হারলাম। তারপর? সমালোচনা হবেই, হোক। ক্রিকেটীয় সমালোচনাই শুধু নয়, আবেগ থেকেই বলা হোক অনেক কিছু। কিন্তু সেটা যেন মাত্রা না ছাড়ায়। দয়া করে গালিগালাজ, ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। ওরা আমাদের মতোই রক্ত মাংসের মানুষ। পরিবার আছে। ভালো লাগা-খারাপ লাগা আছে। সমালোচনা করুন, তাচ্ছিল্য নয়।

ধরলাম, আপনি খুব বড় ভক্ত। তাই ফলটা মানতে পারছেন না। ঠিক আছে। তাই গালিগালাজ করবেন? ব্যক্তিগত আক্রমণে জিতবেন? সমর্থকরা এসব করলে দলটা আরেকবার হারে, সমর্থকরাও হারে, এই খেয়াল থাকে না?

খেলার ফলে লজ্জা থাকে না। মাঠের বাইরের পরাজয়েই আসল লজ্জা!

ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।