সভ্যতা এখনো হাজারো মাইল দূরে!

আমি প্রায় দশ বছর ধরে একটা বিষয় ক্রমাগত লিখে চলেছি- আমরা প্রতিটা বাংলাদেশি অন্যকে ছোট করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছি!

জন্মানোর পর থেকে জীবনের প্রতিটা পর্যায়ে আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে- অন্যকে ছোট করে আনন্দ লাভ করা!

জগতের মানুষজন আনন্দ পাওয়ার জন্য কেউ দেশ ভ্রমণে বের হয়, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, গান গায়, কবিতা আবৃত্তি করে কিংবা খেলাধুলা করে বেড়ায় বা অন্য কিছু!

আর আমরা অন্যকে ইচ্ছে মতো ছোট করে আনন্দ পাই!

আমাদের মাঝে কেউ যদি একটু ভালো করতে থাকে, তাহলে তাকে দুই কদম বেশি এগিয়ে ছোট করার চেষ্টা করি!

ক্রিকেটার তাসকিন আহমেদ বাবা হয়েছে। ছেলেটা আনন্দের সঙ্গে সদ্য জন্ম নেয়া বাচ্চা আর তার মা’র সঙ্গে একটা ছবি ফেসবুকে দিয়েছে; সেখানে লোকজন গিয়ে এমন সব মন্তব্য করেছে, যেটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করাও লজ্জার ব্যাপার।

কেউ লিখেছে -এটা আপনার সন্তান না! আপনি তো সেদিন বিয়ে করলেন! এতো তাড়াতাড়ি বাচ্চা হয় কিভাবে!

অন্য একজন লিখেছে -ও বুঝেছি বিয়ের আগেই কাজ সারা ছিল!

আরেকজন তো লিখেছে -আপনারা খাটে যেমন পারফর্ম করছেন, এমন পারফর্ম যদি মাঠে করতেন, তাহলে আমরা অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে সহজেই জিতে যেতাম!

এই রকম আরও হাজারটা মন্তব্য আছে সেখানে। লোকজন প্রায় ঝাপিয়ে পড়েছে সমালোচনা করার জন্য!

শেষমেশ বাধ্য হয়ে তাসকিন আহমেদ একটা কমেন্ট করে লিখেছে- সে ১২ মাস আগে বিয়ে করেছে। শুধু তাই না, তাকে শেষ পর্যন্ত হিসেব করে দেখিয়ে দিতে হয়েছে- বিয়ের পর’ই তাদের সন্তান হয়েছে! বিয়ের আগে না!

এটা’ই আমাদের স্বভাব! আমরা কারো ভালো দেখতে পারি না। কেউ একটু ভালো অবস্থানে চলে গেলে তো কথাই নেই! তাকে টেনে ধরে নিচে নামানোকে আমরা আমাদের দায়িত্ব এবং কর্তব্য মনে করি।

অথচ ছেলেটা যখন বাবা হওয়ার ছবিটা আপলোড করেছে, আমার মনে হয়েছে- কি চমৎকার একটা ছবি। দেখে’ই মনে হচ্ছিলো- ছেলে’টা বাবা হয়ে নিজেকে পৃথিবীর সব চাইতে সুখি মানুষ ভাবছে। ছবিটার মাঝে’ই কেমন যেন একটা সুখি সুখি ব্যাপার ছিল।

আর আমরা কিনা ঝাপিয়ে পড়ালাম- এটা কি আদৌ তার সন্তান কিনা কিংবা সন্তান হলেও বিয়ের আগেই মনে হয় সন্তান হয়ে যাচ্ছিলো ইত্যাদি!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা এমন করি কেন?

কারণ ছোট বেলা থেকেই পরিবার, সমাজ কিংবা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের আমরা এমনটাই জীবন ভর করতে দেখেছি কিংবা বলতে শুনেছি!

বেশি দূর যেতে হবে না। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেখানকার ছাত্র- শিক্ষকদের প্র্যাকটিস গুলো ভালো করে খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন। খুব বেশি দূরে আর যেতে হবে না।

বুয়েট ছাড়া দেশে আবার অন্য কোথাও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয় নাকি! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কি আদৌ কোন পড়াশুনা হয় নাকি! এরা নিজেরা নিজেরাই নিয়মিত এইসব বলে বেড়ায়!

এরা তো ভালোই! সেটা তো আমরা জানিই!

কিন্তু নিজেদের বড় করে দেখার জন্য অন্যদের ছোট করে দেখতে হবে কেন? দেশের অন্য কোথাও কি তাহলে পড়াশোনা হচ্ছে না?

‘পাত্তা’ দেবার ব্যাপারটাই দেখুন! যদিও ‘পাত্তা’ শব্দ’টা নিয়েই আমার আপত্তি আছে।

আরও বড় পরিসরে বললে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলে’রা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকজনদের পাত্তা দেয় না! আবার ধরেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে তো আপনি পাত্তাই পাবেন না!

শুধু তাই না!

সরকারি চাকরী করলে আপনি এক ধরনের মানুষ। না করলে আপনি আরেক ধরনের মানুষ কিংবা হয়ত মানুষই না!

একবার গেলাম আমার এক সহকর্মীর গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তখন আমি নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করছি। আমার সহকর্মী আমাকে তাদের এক গ্রামের বাজারে নিয়ে গেলেন। গ্রামের মাতাব্বর শ্রেণীর এক লোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি করেন?

– আমি শিক্ষকতা করি।

– সরকারি না বেসরকারি?

– বেসরকারি।

ভদ্রলোক এরপর আমার সঙ্গে আর কথা’ই বললেন না! ভাবখানা এমন- তোমার সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করার সময় আমার নাই!

তো, সেই ভদ্রলোক নিজে কিন্তু সরকারি চাকরী করে না। তাহলে সে কেন সরকারি চাকরী’কে এতো মূল্য দিচ্ছে?

কারন সে জীবন ভর দেখে এসছে- সরকারি চাকরী করা মানেই বিশাল ক্ষমতা!

ও এখানেও আবার ব্যাপার আছে।

আপনি ধরুণ সরকারি চাকরী করেন, কিন্তু বিসিএস ক্যাডার না; তাহলেও আবার সমস্যা!

কারণ বিসিএস ক্যাডাররা আবার আপনাকে পাত্তা দিবে না!

আবার ধরুন আপনি বিসিএস ক্যাডার, কিন্তু চাকরী করছেন শিক্ষা ক্যাডার কিংবা একাউন্ট বা এই ধরবনের কোন ক্যাডারে। দেখবেন পুলিশ কিংবা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ক্যাডারের লোকজন আপনাকে পাত্তা দিচ্ছে না!

ধরুন আপনি শিক্ষা ক্যাডারে চাকরী করছেন, অন্য ক্যাডারের লোকজন বলে বসতে পারে, আরে ওরা আবার কিসের বিসিএস ক্যাডার। মাস্টার মানুষের আবার ক্যাডার কিসের!

এর কোন’টাই আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি না। আমাকে বছরের পর বছর অনেক মানুষ এইসব লিখেছে, তাদের অভিজ্ঞতা জানিয়েছে। কারন আমি লেখালেখি করি।

এই হচ্ছে আমাদের অবস্থা! কেউ কাউকে ‘পাত্তা’ দিতে চাই না! অন্যকে ছোট করে’ই জগতের সমুদয় আনন্দ আমরা পেয়ে বেড়াচ্ছি!

যারা ভাবছেন- তাসকিনের ফেসবুক পেজে অশিক্ষিত কিংবা স্বল্প শিক্ষিত মানুষজন গিয়ে এইসব লিখেছে; আপনাদের জানিয়ে রাখি- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র- শিক্ষক কিংবা বিসিএস ক্যাডার, এরা কেউ’ই কিন্তু অশিক্ষিত কিংবা স্বল্প শিক্ষিত না!

শিক্ষিত হওয়া আর সভ্য হবার মাঝে একটা পার্থক্য আছে। আমরা সেই পার্থক্য’টা এখনো নির্ণয় করতে পারিনি। আমরা ভেবে বসে আছি- শিক্ষিত মানেই সভ্য!

যার কারনে সভ্যতা এখনো আমাদের কাছ থেকে হাজারো মাইল দূরে!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।