কৃষি ক্ষেতে জন্ম নেওয়া ক্রিকেটার, রকেট লঞ্চারে মৃত্যু

বেঞ্জামিন হান্টসম্যান উইলিয়ামস, ক্ষণজন্মা এই রোডেশিয়ান(বর্তমান জিম্বাবুয়ে) ক্রিকেটারের জন্ম ১০ জুন, ১৯৪৪ সালে। ১৯৭৮ সালের ৩ আগস্ট রোডেশিয়ান বুশ যুদ্ধে যখন তাঁর গাড়ির উপর একটি রকেট লঞ্চার পড়ে জীবনাবসান ঘটায়, তখনো ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে ছিলেন তিনি।

বেঞ্জামিন হান্টসম্যান উইলিয়ামসের পর নেজাম হাফেজই ছিলেন একমাত্র হতভাগ্য, যারা সহিংস আক্রমণের দুর্ভাগ্যজনক শিকার হয়েছেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কিংবা স্বাধীনতার জন্য গণসংগ্রাম যেটাই ভাবুন না কেন , হান্টসম্যান ছিলেন এর নির্মম শিকার, তার তখন কিছুই করার ছিল না।

মাতাবেলেল্যান্ড এর সাথে সেবার দুই দিনের ম্যাচ খেলতে এলো অস্ট্রেলিয়া দল, যদিও ম্যাচটির কোন প্রথম শ্রেণীর স্ট্যাটাস ছিল না। সেদিন সম্ভবত কেউই মাতাবেলেল্যান্ডকে দল হিসেবে গুরুত্ব দেয়নি। তবু এটি সত্য যে, তারা অধিনায়ক রবার্ট উলিয়ট (যিনি রোডেশিয়ার হয়ে হকিও খেলেছেন) এবং জ্যাকি ডু প্রিজের(যিনি ঠিক সে মৌসুমের পরেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ডেব্যুডেন্ট হন) মত ভাল মানের অলরাউন্ডার তৈরি করতে পেরেছিল।

ব্রায়ান ডেভিসনের মত হার্ডহিটার ব্যাটসম্যানও ছিলেন, যিনি গ্লুচেস্টারশায়ারে যাওয়ার আগে লিচেস্টারশায়ারের জন্য ১৪ টি মৌসুমে খেলেছিলেন। তিনি রোডেশিয়ার হয়ে খেললেও পরবর্তীতে তাসমানিয়ায় চলে আসেন, যেখানে প্রায় ১০ বছর খেলেছিলেন।

কলিন ব্ল্যান্ড তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে ছিলেন সবচেয়ে উজ্জ্বল, যিনি তার দলে প্রায় কিংবদন্তীতুল্য ছিলেন, যদিও মানুষ তার অসাধারণ ব্যাটিং গড়ের কথা প্রায় ভুলে গিয়েছে। তিনি সেযুগে ৪৯-এর উপর গড় নিয়ে ১৬৬৯ রান করেন।

কিন্তু তাদের কেউই প্রভাব ফেলতে পারেন নি, গ্রাহাম ম্যাকেঞ্জি তার উদ্বোধনী স্পেলেই দুই ওপেনারকে তুলে নেন, অন্যদিকে গ্রাহাম ওয়াটসন, ডেভিড রেনিবুর্গ, এবং জেমস হাবল বাকি উইকেটগুলো তুলে নেন। অস্ট্রেলিয়া মাতাবেলেল্যান্ডকে ১০৭রানে অলআউট করে দেয়ায়, এ ম্যাচটির সময় দুইদিন হিসেবেই একদম যথাযথ মনে হচ্ছিল।

মাতাবেলেল্যান্ড বোলিংয়ে নামার পর, অধিনায়ক উলিয়েট বাহাতি সিম বোলার বেঞ্জামিন উইলিয়ামসের হাতে বল তুলে দেন। তার ডাকনাম ছিল বেঞ্জি, কেউ কেউ তাকে হান্টারম্যান বলে ডাকত, যেটি তার মিডলনেম। তিনি প্রায় নতুনই ছিলেন, চার বছর আগে একবার একটি প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছিলেন অরেঞ্জ ফ্রি স্টেটের হয়ে, ট্রান্সভালের বিপক্ষে, সে ম্যাচে উইকেটশূণ্য ছিলেন।

উইলিয়ামস অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক ববি সিম্পসনকে শূন্য রানেই দারুণ সুইং ডেলিভারিতে (অস্ট্রেলিয়ান গণমাধ্যম সিডনি মর্নিং হেরাল্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী) এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন। তবে বিল লরির ঠান্ডা মাথার ব্যাটিং অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসটাকে সেটেলড করে দেয়। লরি অস্বভাবসুলভ ভাবে আউট হন ৬টি চার ও লেগসাইডে মারা ছক্কাসম্বলিত একটি ইনিংস খেলে। এরপর লরির মতো গ্রামার টমাস একইভাবে আউট হলে, অস্ট্রেলিয়া ১৭৮/৩ এ পরিণত হয়, তবে অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য ছিল চারশ কিংবা তার বেশি রান।

তারপরই আসে উইলিয়ামস আঘাত। একটি অসাধারণ স্পেলে প্রথমে বব কপারকে কটবিহাইন্ড, তারপর লেন রেডপেথকে লেগবিফোর এবং কিথ স্ট্যাকপোলকে বোল্ড করেন। ডু প্রিজ লোয়ার অর্ডারকে ধসিয়ে দেন এবং শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ানরা ২১১ রানে বিধ্বস্ত হয়। ম্যাচটি ড্রয়ে গড়ালেও সিম্পসন আলোক সল্পতা সত্ত্বেও শেষ সময়ে ব্যাট করতে নেমেছিলেন দর্শক দের সীমাহীন উৎৎসাহের কারণে।

৮১ রানে ৪ উইকেট নেয়া উইলিয়ামসকে উপেক্ষা করতে পারেননি নির্বাচকরা। দুইদিন পরই একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে রোডেশিয়ার হয়ে খেলেন এবং ২৬রানে নেন ২ উইকেট। তুলে নেন ব্রায়ান ট্যাবার ও রেনিবার্গকে।

ট্রান্সভালের ম্যাচে তিনি টাইগার ল্যান্সকে ক্লিন বোল্ড করেন এবং ৭১ রানে ৩ উইকেট নেন। ওর এক ম্যাচ পরেই উইলিয়ামস প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট থেকে বিরতি নেন, তবে তিনটি মৌসুম পরেই ট্রান্সভালের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আবার ফিরে আসেন।

এই ম্যাচ উল্লেখ করা দরকার, ট্রান্সভালের মাত্র ১০১ রানের দরকার ছিল, কিন্তু উইলিয়ামস ও এডওয়ার্ড পার্কার অসাধারণ বোলিং করে, দুজন মিলে তুলে নেন ৬ উইকেট। উইলিয়ামস ৫৬ রানে নেন ৪ উইকেট।

সেসময়টাতে তিনি অন্যসময়ের চেয়ে ভালো পারফর্ম করছিলেন। তার প্রথম শ্রেণীর ক্যারিয়ারে (১৯৬৩-৬৪, ১৯৬৫-৬৬, এবং ১৯৬৯-৭০) – ৩৬.১৪ গড়ে ১৪ উইকেট শিকার করেন, সর্বমোট ২৬উইকেট নিয়েছেন ৩১গড়ে। এখানে ১৯৬১-৬২ মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে রোডেশিয়া কাউন্টি ডিস্ট্রিক্টের হয়ে খেলা ১৭ বছর বয়সী স্কুলবালক উইলিয়ামসের ৮৯ রানে নেয়া ২ উইকেটও ধরা হয়েছে।

হানসমান উইলিয়ামস বুলাওয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি দক্ষিণ আফ্রিকান স্কুলের হয়ে ১৬টি ম্যাচ খেলেন। পরে তিনি রাডেশিয়ান নফিল্ড স্কুলের হয়ে ইস্টার্ন প্রদেশের বিপক্ষে ৯ রানে ৩ উইকেট নেন ৯ও ভারে।

তার জীবন সম্পর্কে যতদূর জানা যায় যে, উইলিয়ামসের বাবা পোর্ট এস্টেটে একজন কৃষক ছিলেন। ইনয়াতি, বুলাওয়ে থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে মাতাবেলেল্যান্ড গ্রামে। সম্ভবত তিনি উইলিয়ামসকে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট থেকে দূরে রাখতে চাইতেন।

তিনি তখন সবে বিশে পা রাখেন যখন জিম্বাবুয়ের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, যা রোডসিয়ান বুশ যুদ্ধ (বা বুশ যুদ্ধ) নামে পরিচিত। ত্রিপক্ষীয় এ যুদ্ধে যোশুয়া নিকোমোর জিম্বাবুয়ের জনগণের বিপ্লবী বাহিনী (জিআইপিআরএ), রবার্ট মুগাবের জিম্বাবুয়ে আফ্রিকান ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (জাএনএএএল) এবং প্রধানমন্ত্রী ইয়ান স্মিথের রোডসিয়ান সরকার জড়িত ছিল।

এটা যুদ্ধের বিবরণ দেয়ার জায়গা নয় বটে, কিন্তু উইলিয়ামসের গল্পের জন্য, এটুকু জানতেই হবে। তখন যুদ্ধ এমন একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে যেখানে সমস্ত শ্বেতাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কদের,

যাদের বয়স ছিল ৬০এর নিচে বিশেষত যারা ছিল ৩৫এর নিচে সেসব জোয়ান পুরুষদের সেনাবাহিনীতে আহবান জানানো হয়েছিল। যুদ্ধ যতই তীব্র হয়, সিবিডব্লিউর( ক্যামিকেল এন্ড বায়োলোজিকাল উইপন) ব্যবহার অনিবার্য হয়ে ওঠে। অন্যান্য জাতির তুলনায়, রোডেশিয়া ক্যামিকেল  এবং বায়োলজিক্যাল যৌগ তৈরিতে অভ্যস্ত ছিল। গেরিলাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্যারথিওন এবং থালিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল।

১৯৭৮ সালে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। মে মাসে রোডেশিয়ান সেনাবাহিনী এবং মার্কসবাদী সেনাবাহিনীর মধ্যে একটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছিল যেখানে পঞ্চাশ জন বেসামরিক লোক মারা যায়, যা যুদ্ধের মধ্যে সরবোচ্চ পরিমাণ বেসামরিক লোক মারা যাবার ঘটনা ছিল।

জিআইপিআরএ জাতীয়তাবাদীরা এই সময়কালে একাধিক বিমানচালককে গুলি করে। সেযুদ্ধের মধ্যে ধরা পড়েছিল ৩৪ বছর বয়সী উইলিয়ামস। সরকারী শ্বেতাঙ্গ কর্মচারী, তিনি তখন পুলিশ রিজার্ভ হিসেবে কাজ করছিলেন।

৩ আগস্টে উইলিয়ামস তুর্কি মাইনের কাছাকাছি যাচ্ছিলেন, বুলাওয়ে থেকে ৪০ মাইল দূরের একটি গ্রামে, যেখানে পরিত্যক্ত সোনার খনি ছিল। তুর্কি মাইনটি জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটে স্ট্রিক পরিবারের জন্মস্থান হিসেবে বিখ্যাত।

সাউথ পুলিশ রিজার্ভ অ্যাম্বুশে ডিউটি করতে  লুপানে যে গাড়িতে উইলিয়ামস যাচ্ছিলেন, সে গাড়িতেই একটি আরপিজে রকেট লঞ্চার এসে বিস্ফোরিত হয়। গাড়িটি বিধ্বস্ত হয়।  তৎক্ষণাৎ তাঁর হাতে ‍গুরুতর জখম হয়। তিনি আর কখনো তা ঠিক করতে পারেননি। কারণ কিছুক্ষণ পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

– ক্রিকেট কান্ট্রি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।