২২ গজের বিশ্বজয়ী নাবিকেরা

১৯৭৫ এ প্রথম বসেছিল ক্রিকেট বিশ্বকাপের আসর। এরপর জল গড়িয়ে চলে গেছে বহুদূর।

এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় সবগুলো আসরের অবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বকাপ তাঁরাই জিতেছে, যারা দল হিসেবে সবদিকেই সমানতালে ধারাবাহিক পারফর্ম করে গেছে। সুতরাং বিশ্বকাপ জিততে দলীয় সমন্বয়ের বিকল্প নেই। সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলেন অধিনায়ক।

অধিনায়ককেই প্রত্যেকটি বিভাগে দলের পারফর্মের ভারসাম্যের দিকে কড়া নজর রাখতে হয়।

দিনশেষে যদিও অধিনায়ককে তাঁর সতীর্থদের পারফর্মের উপরই নির্ভর করতে হয়, তবু একজন ভাল অধিনায়ক তাঁর বুদ্ধি দিয়ে দলের মধ্যম সারির পারফর্ম দিয়েও ভাল ফলাফল নিয়ে আসতে পারেন, আবার খুব শক্তিশালী দলও ভাল নেতার অভাবে অনেক সময় সামঞ্জস্যতা রক্ষার অভাবে নিজেদের হারিয়ে ফেলে।

আর বিশ্বকাপের মত মঞ্চে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে স্বীয় পারফর্ম ও অন্যদের পারফর্ম করতে উদ্বুদ্ধ করতে একজন ভাল অধিনায়কের চাহিদা অপরিহার্য। এর আগে প্রতিটি আসরেই দলের অধিনায়কদের অবদান ছিল অসামান্য।

এখন পর্যন্ত আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের ১১ টি আসর বসেছে। ৫ টি দেশ বিশ্বকাপজয়ীর ট্যাগ গায়ে লাগাতে পেরেছে। এবং ৯ জন অধিনায়ক কাপটি প্রথম উঁচিয়ে ধরার সুযোগ পেয়েছেন।

সেই ৯ জন ক্রিকেটার বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়কত্ব করে বিখ্যাত এবং অনেকেই নিজেদের পারফর্ম দিয়েও ভক্তদের কাছে কিংবদন্তীসম সম্মান পেয়েছেন। তাঁদের কথা শুনে আসি আজ।

  • ক্লাইভ লয়েড (১৯৭৫ ও ১৯৭৯)

‘সুপারক্যাট’ খ্যাত ক্লাইভ লয়েড বিশ্বকাপের প্রথম দুই সংস্করণের ট্রফিজয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দেন। বলাই বাহুল্য, ক্যারিবিয়ানদের সেই সুসসময়ের যুগে, দুই আসরে দুই দলই ছিল দুর্ধর্ষ। যারা যেকোন দিনে যেকোন মুহূর্ত থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে ভেঙে দিতে পারত।

তবে সেই দলের শক্তির অন্যতম টনিক হিসেবে কাজ করতো ক্লাইভ লয়েডের বুদ্ধিদীপ্ত ক্যাপ্টেন্সী। সেই ক্যারিবিয়ান দল যেকোন দিনে যেকোন দলকে গুঁড়িয়ে দেবার সামর্থ্য রাখলেও অধিনায়কের সরব অবদান আলাদা আবেদন রাখত তাদের পারফর্মে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯৭৫ বিশ্বকাপ ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ডেনিস লিলি, জেফ থমসন এবং গ্যারি গিলমোরের বোলিং তোপে ৫০-৩ এ পরিণত হলেও লয়েড হাল ধরেন, তাঁর অধিনায়কোচিত ৮৫ বলে ১০২ রানের ইনিংসের কারণে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৬০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৯১ রানের বড়সড় একটি পুঁজি পায়। ওয়ানডের গোড়াপত্তনের তখনকার সময়ে ৬০ ওভারে ২৫০ ও জেতার মত স্কোর হিসেবে বিবেচিত হত। অজিরা জবাব দিতে নামলে ক্লাইভ লয়েডের দারুণ ক্যাপ্টেন্সিত করেন, ফলে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৭ রানের লড়াকু জয় পায়। বল হাতে ক্লাইভ লয়েড ১২ ওভারের পূর্ণকোটা শেষ করে ৩৮ রান দিয়ে একটি উইকেটও নেন।

১৯৭৯ বিশ্বকাপে, ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেমি-ফাইনালে এসেছিল সর্বজয়ীরূপে। কিন্তু সেমিফাইনালে মজিদ খান ও জহির আব্বাসের দারুণ জুটিতে ভর করে পাকিস্তান ২৯৪ রানের বড় টার্গেটকেও চোখ রাঙাচ্ছিল। ড্রিংকস ব্রেকে লয়েড চিন্তা করেন, আব্বাসকে ফেরাতে একটু ভিন্নভাবে বোলারদের বল করতে হবে।

ব্রেক শেষে, দুই দল মাঠে ফিরে।

আব্বাসের প্রিয় জায়গা অফস্টাম্পের বাইরের অংশ ছেড়ে, ক্যারিবিয়ান পেসাররা আব্বাসকে লেগস্টাম্প বরাবর বল করতে থাকে, আব্বাস কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেরেন ৯৩ রানে। পাকিস্তান অচিরেই ১৭৬/১ থেকে ২৫০ রানে অলআউট হয়ে যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ টানা ২য় বারের মত ফাইনালে ওঠে।

ফাইনালে ভিভ রিচার্ডসের, কোলিস কিং এবং জোয়েল গারনারের পারফর্মে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইংলিশদের ৯২ রানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে। ক্লাইভ লয়েড দ্বিতীয় বারের মত বিজয়ী অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।

  • কপিল দেব (১৯৮৩)

ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয় আজও টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসাবে বিবেচিত হয়। অধিনায়ক কপিল দেব এমন একটি বোলিং আক্রমণ নিয়ে এসেছিলেন, যারা ইংলিশ কন্ডিশনে কার্যকরী হবে, এবং অলরাউন্ডিং সাপোর্টও দিতে পারবে।কপিল দেব নিজেও একজন ভাল অলরাউন্ডার ছিলেন

সেই আসরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে, প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে ভারত মুহূর্তের মধ্যে ‘১৭/৫’-এ পরিণত হয়।  পরে কপিল দেব তাঁর মহাকাব্যিক ১৩৮ বলে ১৭৫ রানের ইনিংস খেলেন। ইনিংসটিতে ১৬ টি চার ও ছয়টি ছক্কা ছিল৷ ভারত সেই ম্যাচটি সহজেই জিতে নেয়।

এরপর আর পিছনে তাকাতে হয়নি দলটিকে। কপিল দেবের সৈনিকেরা সাহসী ক্রিকেট খেলে ফাইনালে পৌছে যায়। ফাইনালে সবাইকে চমকে দিয়ে পরাক্রমশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়।

সে ম্যাচে কপিল দেব টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ক্যাচটি নিয়ে হুমকি হয়ে ওঠা ভিভ রিচার্ডসকে বিদায় করেন। অনেকেই মনে করেন, স্কয়ার থেকে ৪০ গজ দৌড়ে এসে সেই বিখ্যাত ক্যাচটি নিয়ে ভিভকে তখন আউট করতে না পারলে ওয়েস্ট ইন্ডিজই ট্রফি জয়ের হ্যাটট্রিক করতো, ভারতের কাপ জেতা হত না।

  • অ্যালান বোর্ডার (১৯৮৭)

১৯৮৭ সালে অধিনায়ক এলান বর্ডারের নেতৃত্বে প্রথমবারের মত অজিদের কাঁধে ওঠে বিশ্বকাপ ট্রফি, পরে যে দেশ আরো চারবার সে সৌভাগ্য অর্জন করে। ৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়ানদের সিনিয়র সব ক্রিকেটাররা অবসর নিতে শুরু করলে অস্ট্রেলিয়ার ৮৭ বিশ্বকাপ দল দুর্বল হতে থাকে।

অ্যালান বোর্ডারের তরুণ দলটি বোধহয় ট্রফি জয়ের কথা স্বপ্নেও দেখেনি। স্বাগতিক ভারত ও পাকিস্তান ছিল সে আসরে হট ফেভারিট। কিন্তু বোর্ডার ও তাঁর তরুণ দল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুরু করেছিল।

স্বাগতিক ভারতের বিপক্ষে এক রানের শ্বাসরুদ্ধকর জয়ের পর সেমিফাইনালের পথ পাড়ি দেবার পথে অজিরা আরো চারটি ম্যাচ জয় করে। লাহোরে তাঁদের সাথে দেখা হয় আরেক স্বাগতিক পাকিস্তানের সাথে। বোর্ডারের দল সে ম্যাচ জিতে নেয় ১৮ রানে। স্থান করে নেয় ফাইনালে।

ফাইনালে তাঁদের প্রতিপক্ষ ছিল শিরোপা প্রত্যাশী ও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। অজিদের দেয়া ২৫৪ রানের টার্গেটে ইংলিশরা এথে এবং গ্যাটিংয়ের ব্যাটিংয়ের উপর ভর করে দারুণ জবাব দিতে থাকে।

ব্রেকথ্রুয়ের আশায় উন্মুখ এলান বোর্ডার একটু অন্য পন্থা নিলেন। সেট ব্যাটসম্যান গ্যাটিংয়ের বিপক্ষে তিনি নিজেই চলে এলেন বোলিংয়ে।

তাঁকে আক্রমণ করতে গিয়ে প্রথম বলেই রিভার্স সুইপ করে বসলেন গ্যাটিং, কিন্তু ব্যাটেবলে তো হলই না, ধরা পড়লেন কিপারের গ্লাভসে। ফাইনালে হয়ত অধিনায়ক রান পান নি, কিন্তু পাশার সবচেয়ে বড় দান দিয়ে বাজিমাতের কৃতিত্বটা দিতেই হবে বোর্ডারকে।

গ্যাটিংয়ের বিদায় ইংল্যান্ডের রানের গতি কমিয়ে দেয়। শেষওভারের নাটকীয়তায় ৭ রানে হেরে যায় ইংলিশরা। এবং অস্ট্রেলিয়া প্রথমবারের মত ওয়ানডে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট মাথায় তোলে।

  • ইমরান খান (১৯৯২)

মাঝে এশিয়ায় ঘুরে এসে আবারো পশ্চিমে প্রত্যাবর্তন করে বিশ্বকাপ আসর। আর ওশেনিয়া অঞ্চলে অনুষ্ঠিত সে আসরেই বাজিমাত করে এশিয়ার দল পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ জয়ের জন্যই ইমরান খান তাঁদের ক্রিকেট ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

ইমরান খানের সে দলটা ছিল তারুণ্যে ভরপুর।  ওয়াসিম আকরামের মত ন্যাচারাল সুইং বোলারের সাথে ওয়াকার ইউনিসের কাটার। আর স্বয়ং অধিনায়ক ইমরান খান যুক্ত হয়ে পাকিস্তানি বোলিং লাইনআপ সেই ইংলিশ কন্ডিশনে অন্যতম এক্স ফ্যাক্টর বিবেচিত হচ্ছিল, সাথে তরুণ ইনজামাম, ইমরানরা ব্যাট হাতে নিজেদের দিনে দারুণ খেলে দেখাতেন।

সে দলকে নিয়ে ইংলিশ কন্ডিশনে এসে শুরুটা খুব বেশি ভাল হয়নি তাঁদের, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২২০ টার্গেট দিয়েও ১০ উইকেটে হেরে আসরের যাত্রা শুরু করে তাঁরা। রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে চলা সে আসরে এক জিম্বাবুয়ে বাদে অন্য কাউকেই হারাতে পারছিল না পাকিস্তান।

কিন্তু হঠাতই ঘুরে দাঁড়ায় দলটি, অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যেন। এর পেছনে দলকে নিয়ে ইমরান খানের মোটিভেশন ও ক্রমাগত সাহস যোগানোর প্রভাব ছিল অনেক।

তিনি দলকে বলতেন, আমরা সবাই এখন আহত বাঘ, আঘাত হানতেই হবে, সেই স্লোগান টিশার্টে ডিজাইন করিয়ে দলের মাঝে বিলি করে সবার মনে প্রভাব ফেলেছিলেন।  পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে ধারাবাহিক পারফর্ম করা এ ব্যাটসম্যান বিশ্বকাপ ফাইনালে দলের জয়ের পথে সর্বোচ্চ ৭২ রান করেছিলেন।

  • অর্জুনা রানাতুঙ্গা (১৯৯৬)

এশিয়ার তৎকালীন নবপরাশক্তি শ্রীলংকা সেবার বিশ্বকাপ জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছিল। এশিয়ায় অনুষ্ঠিত এই আসরে লঙ্কানরা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ব্যাটিং, স্মার্ট ফিল্ডিং এবং আগ্রাসী বোলিং দিয়ে সবার মন জয় করেছিল। সেই পারফর্মের অন্যতম মূল অনুপ্রেরণা ও মাস্টারমাইন্ড ছিলেন শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক অর্জুন রানাতুঙ্গা, যিনি খুব ভেবেচিন্তে প্রতিটি ম্যাচে আলাদা প্ল্যানিং ও স্ট্রাটেজি অবলম্বন করতেন। এবং দলের সবার মাঝে দারুণ বোঝাপড়া সৃষ্টি করে সেই প্ল্যানে বাঘা বাঘা দলগুলিকে কাবু করে দিতেন।

রানাতুঙ্গা, তৎকালীন পিঞ্চ হিটার ঘরানার ব্যাটসম্যান সনাথ জয়সুরিয়া এবং উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান রমেশ কালুভিতারানাকে ব্যাটিং প্রমোশন দিয়ে ওপেনিংয়ে নামান। এই সিদ্ধান্ত পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দারুণভাবে কাজে দেয়।

ওপেনিংয়ে বিষ্ফোরক শুরুর পর, ডি সিলভা, রানাতুঙ্গা, রোশোন মহানামা, রানাতুঙ্গার মত ব্যাটসম্যানরা মিডল অর্ডার সামলাতেন, যা লংকান ব্যাটিং লাইনআপকে অন্যতম শক্তিশালী বানিয়ে দেয়।

সেমিফাইনালে হট ফেভারিট ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওভারেই দুই ওপেনারকে হারালে শ্রীলংকা কিছুটা হোচট খেলেও, সেই শক্তিশালী মিডল অর্ডার দারুণভাবে তা সামলে নেয়।

ফাইনালে দারুণ শুরু করা অস্ট্রেলিয়া ২৪১ এ থামত না যদি না রানাতুঙ্গা স্পিন দিয়ে তাঁদেরকে চেপে ধরতে পারতেন। রান তাড়া করতে নেমে ডি সিলভার সেঞ্চুরিতে শ্রীলংকার জয় পাওয়া সোজা হয়ে যায়, এবং জয়সূচক রানটি অধিনায়কের ব্যাট থেকেই আসে।

  • স্টিভ ওয়াহ (১৯৯৯)

নবীন অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ’র নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া দলের ৯৯ বিশ্বকাপের শুরুটা ভাল হয়নি। গ্রুপপর্বে তাঁরা পাকিস্তান এবং ওশেনিয়ার আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে বেশ পিছিয়ে পড়েও শেষপর্যন্ত সুপার সিক্সে পৌছে যায়।

কিন্তু এই পর্বে অজিরা দারুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে, এবং সব ম্যাচ জিতে নেয়। ভারত, জিম্বাবুয়ের সাথে জেতার পর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হয় অস্ট্রেলিয়া।

কিন্তু স্টিভ ওয়াহ’র ১১০ বলে ১২০ রানের ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার জয় নিশ্চিত হয়। সেমিফাইনালে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচটি বিশ্বকাপেরই যেন এক বিজ্ঞাপন হয়ে রইল। ক্লুজনারের বিখ্যাত রানআউটের ম্যাচে ওয়াহ ৫৬ রান করেন।

ফাইনালে পাকিস্তানকে ১৩২ রান অলআউট করে ৮ উইকেটে জিতে ওয়াহ’র অধিনায়কত্বে অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয়বারের মত বিশ্বকাপের স্বাদ পায়। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর আগে আর পরে এমন ম্যাড়মেড়ে ও এক পেশে ফাইনাল আর কখনো দেখা যায়নি।

  • রিকি পন্টিং (২০০৩ ও ২০০৭)

টানা দুই বিশ্বকাপ, এক অধিনায়ক, কিংবদন্তীখচিত দল। এ যেন দুই প্রজন্মে দুই রাজার এক বিন্দুতে মিলে যাবার গল্প। ২০০৭ বিশ্বকাপ জিতে রিকি পন্টিং ক্লাইভ লয়েডের কীর্তিকে ছুঁয়ে ফেলেন।

১৯৯৯ থেকেই ক্রিকেটের একক রাজত্বের গোড়াপত্তন করে ওয়াহ যেখানে রেখে গেলেন, সেখান থেকেই শুরু করে পন্টিং যেন সেই দাপটকে ধরাছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যেতে চাইলেন। দু’টি আসরই অস্ট্রেলিয়া জিতেছে প্রবল পরাক্রমে এবং কোন ম্যাচ না হেরে!

অভূতপূর্ব এই ধারবাহিকতা রক্ষার্থে সত্যিকার সেনাপতি ছিলেন রিকি পন্টিং। দলভর্তি স্টার ক্রিকেটারকে একসুতোয় বেঁধে তাঁদের কাছ থেকে পুরোটা আদায় করে নিয়ে দলকে রেজাল্ট এনে দেয়া, এ কাজটা পন্টিংয়ের চেয়ে ভাল কে পারত!

পন্টিং নিজেও ওয়ানডে ইতিহাসে অন্যতম স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান হিসেবে বিবেচিত হন। ২০০৩ এর আসরে ৪১৫ করেছেন, ফাইনালে ১২১ বলে ১৪০ রানের ইনিংস খেলে ভারতকে ম্যাচ থেকে ছিটকে দেন।

২০০৭ এ টানা ১১ টি ম্যাচজয়ী অস্ট্রেলিয়া যেন আগ্নেয়গিরির চেয়েও ত্রাস ছড়িয়ে ছিল, অস্ট্রেলিয়ার সামনে যে দলই পড়েছে, স্রেফ গুঁড়িয়ে গেছে। সে আসরে পন্টিং করেন ৫৩৯ রান।

  • মহেন্দ্র সিং ধোনি (২০১১)

সবাই বলছিল, এর চেয়ে ভাল সুযোগ ভারতের কাছে আর সহসা আসবে না। ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, তরুণেপ্রবীণে মিলে ব্যালেন্সড দলটার উপর ভারতীয়রা অনেক আশার বাজি ধরে।

ধরবেই না কেন? দলের কাপ্তান যে মহেন্দ্র সিং ধোনির মত শক্ত ও ঠান্ডামাথার সেনানী! ২০০৭ সালে একদম নবীন দল নিয়ে প্রথম বড় এসাইনমেন্টেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতিয়ে ছিলেন।

তাঁর মূল বৈশিষ্ট্য ধীরস্থিরতা। প্রতিপক্ষ আক্রমণ করছে, ম্যাচ তুলে নিয়ে যাচ্ছে, একটার পর একটা প্ল্যান মাঠে মারা যাচ্ছে, ধোনির মুখ দেখে তা বোঝার কোন উপায় নেই। তিনি নিশ্চিন্ত মনে নিজের উপর অটল থেকে একটার পর একটা কৌশল খাটিয়ে ম্যাচ বের করতে যেন সিদ্ধহস্ত।

২০১১ বিশ্বকাপ ছিল ধোনীর নিজেকে প্রমাণের সেরা মঞ্চ, ধোনী তা ভালভাবেই করেছিলেন, পুরো আসরেই তাঁর চতুর ক্যাপ্টেন্সির ভেলকি দেখেছে বিশ্ব। দলের দরকারে ব্যাটও হেসেছিল তাঁর।

ফাইনালে লংকানদের ভাল বোলিংয়ে টপ অর্ডার ফিরে গেলেও, গম্ভীর – ধোনির ইনিংসের উপর ভর করে ভারত সহজ জয় পায়। ধোনির ব্যাট থেকে জয়সূচক ছক্কা আসে।

  • মাইকেল ক্লার্ক (২০১৫)

তিনি যখন অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা নেন, অজিরা তখন প্রচন্ড প্রতাপ ছড়িয়ে খেলছে, কিন্তু কিছু সিনিয়র ক্রিকেটারের অবসরে, পালাবদলের সন্ধিক্ষণে অজিরা তাঁদের সাম্রাজ্য হাতছাড়া করে ফেলে।

কিন্তু রাজত্ব ছাড়া কি আর রাজপুত্রের ভাল লাগে? তাঁর শরীরে যে রাজরক্ত। তেমনি ক্লার্কও যে চ্যাম্পিয়ন দলটার অংশ ছিলেন, শিরোপাটা দেশে না থাকলে তাঁর কেন ভাল লাগবে?

ক্যারিয়ারের শেষবেলায় এসে চ্যালেঞ্জটা নিয়েই নিলেন। স্টার্কের আগুন ঝরানো বোলিং, পুরো পেস এটাকের ছন্দে থাকা, ব্যাটসম্যানদের সময়মত ক্লিক করা ক্লার্কের কাজ আরো সহজ করে।

ফাইনালে কিউইদের অল্পরানে গুটিয়ে দিয়ে শিরোপা হাতে নেন মাইকেল ক্লার্ক। চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা ক্লার্ক, বিদায় বেলায় দলকে চ্যাম্পিয়ন করেই বিদায় নিলেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।