ক্রিকেট, মিডিয়া ও জাতীয়তাবাদ

১.

‘ক্রিকেটের বাইবেল’ খ্যাত ‘উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালামনাক’ সম্প্রতি গত এক দশকের শ্রেষ্ঠ পুরুষ টেস্ট ও ওয়ানডে একাদশ ঘোষণা করেছে। নারীদের করেছে সমন্বিত একাদশ।

পুরুষদের ওয়ানডে একাদশে স্থান হয়েছে সাকিব আল হাসানের। তাঁকে অভিনন্দন!

নিঃসন্দেহে উইজডেনের এ মূল্যায়ন একজন ক্রিকেটারের জীবনে মণিহারতুল্য। চূড়ান্ত উচ্চতার পারফরমার হওয়ার স্বীকৃতিও বটে এটা। পরিসংখ্যান বলবে, সাকিব আল হাসান তা-ই ছিলেন। ক্যারিয়ারের বাকিটা সময় তা-ই থাকুন, সেটাই প্রত্যাশা।

২.

এই দলটা গড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনা যাকে নিয়ে হয়েছে, তিনিও সাকিব আল হাসান। তবে, অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর পরিসংখ্যান ও পারফরম্যান্সের যৌথ শক্তির বলে তাঁকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে চার সদস্যের নির্বাচক কমিটি।

সেই অর্থে আসলে, বিতর্ক সাকিবকে নিয়েই হয়েছে। বাকিদের ব্যাপারে খুব বিস্তারিত ও সমোচ্চারিত পর্যবেক্ষণও নেই। অনেকের ক্ষেত্রে তো কয়েকজন নির্বাচকের আলাপও নেই! এই হলো অবস্থা!

আর সবচেয়ে কম কথা হয়েছে জস বাটলারকে নিয়ে। আর এমনভাবে আলাপটা করা হয়েছে, মনে হচ্ছে তিনি ‘অটো চয়েস’ ছিলেন!

উইজডেন নিজেদের বলে ‘ক্রিকেটের স্বাধীন স্বর’। কিন্তু, ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদের রক্ত তার মধ্যেও বহমান। নইলে বাটলারকে এতোটা ‘বেনিফিট অব ডাউট’ কীভাবে দেওয়া সম্ভব! বলা হয়েছে বাটলার নাকি ‘ইংলিশ ব্যাটিংয়ে বিপ্লব ঘটিয়েছেন’। তা তিনি ঘটাতেই পারেন। কিন্তু, সেই বিপ্লব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কী কাজে এসেছে! যা কাজে আসার তা সম্ভবত এসেছে আইপিএল আর ইংলিশ ক্রিকেটের।

কিন্তু, উইজডেনও তো ব্রিটিশ-জাতক মিডিয়া, তার ঘরের খেলোয়াড় জায়গা না পেলে কীভাবে জাতীয়তাবাদের সম্মান রক্ষা হয়! তাই বাটলার বিতর্কহীনভাবে দলে!

ঠিক এ কারণেই সাকিবকে আমি বলতে চাই আমাদের ‘উপনিবেশ বিরোধী’ সংগ্রামের ভ্যানগার্ড হিসেবে। তাঁকে ফেলে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু, র‌্যাশন্যালি দেখতে গিয়ে দেখা গেল, বাটলারকে দলে ঢুকাতে গেলে সাকিবকে ছাড়া ওদের উপায় নেই! বুঝেন অবস্থা! সাকিবের ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই বাটলারের আগমন। উপনিবেশের প্রভুদের এভাবেই থাপ্পর মারতে হয়! সাকিব কী নীরবেই না শুধু তাঁর কাজ দিয়ে সেটা সুনিপুণভাবে করে দেখিয়েছেন। ব্র্যাভো সাকিব!

৩.

যাক, সাকিব আছেন বলেই হয়তো বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডে একাদশটা নিয়ে আলাপ বেশি হয়ে গেল। নইলে সারা দুনিয়াতে দশকের শ্রেষ্ঠ টেস্ট একাদশ নিয়েই আলাপ বেশি। খোদ উইজডেনই তিনটি স্টোরি করেছে টেস্ট নিয়ে, ওয়ানডে নিয়ে যেখানে একাদশের বিশ্লেষণ ছাড়া আর কিছুই নেই।

আমারও আগ্রহের জায়গায় টেস্ট একাদশ।

কিন্তু, ওয়ানডে নিয়ে এই আলাপ সম্ভবত ব্যক্তিগত জায়গা থেকে অনিবার্য ছিল। এটা সীমাব্ধতাও হতে পারে। কিন্তু, এই সীমাবদ্ধতা সাকিবের নয়, আমারও নয়। জস বাটলারের। জস বাটলারকে দলে নেওয়ার পেছনে আমার পর্যবেক্ষণটি ‘জাতীয়তাবাদ’-কে খণ্ডন করতে গিয়েছে। আমি বাটলারের ব্যাটিং পছন্দ করি ভীষণ। কিন্তু, তাঁকে এই একাদশে আসার যোগ্য মনে করি না। আমার কাছে তাঁর অন্তর্ভুক্তি জাতীয়তাবাদী সমর্থকসূচক মনে হয়েছে। এমন রাখঢাক না রেখে কথা বলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু করার কিছু নেই।

আমি মোটেও জাতীয়তাবাদী জায়গা থেকে সাকিবকে সমর্থন করছি না। সাকিব দলে না থাকলেও আমার ইতরবিশেষ হতো না। আমি নির্বাচকদের পর্যবেক্ষণের ‘মেথডোলজি’কে প্রশ্নবিদ্ধ করছি মাত্র।

৪.

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যক্তিগত টাইমলাইন ও গণমাধ্যম – দুটি আলাদা জায়গা। গণমাধ্যমকে একটা নির্মোহ জায়গা থেকে আলোচনা করতে হয়, সংবাদ পরিবেশন করতে হয়। বাংলাদেশের কোন গণমাধ্যমে এই আলোচনা আমি এখনও পড়িনি। তবে, সাকিবকে নিয়ে এন্তার বড় বড় সংবাদ পরিবেশন করতে দেখেছি এই ইস্যুতে।

সাকিবের ওয়ানডে একাদশে সুযোগ পাওয়াটাই তাদের কাছে বড় ব্যাপার। তাই এটা নিয়ে ফলাও করে সংবাদ হচ্ছে। খুব ছোট করে হয়তো টেস্ট একাদশের খবরটা প্রকাশিত হয়েছে। আই রিপিট, ছোট করে!

জাতীয়তাবাদ ও ব্যবসা এভাবেই বিবেকবুদ্ধিকে লোপ পাইয়ে দেয়। পেশাগত সততাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার টোপ দিয়ে যায়।

একটা টেস্ট খেলুড়ে দেশের মিডিয়ার কথা বলছি আমি। টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব আমজনতা না বুঝতে পারে, একজন পেশাজীবি ক্রিকেট সাংবাদিক নিশ্চয়ই বোঝেন। তার কাছে, কী করে একজন ব্যক্তি সাকিব আল হাসানের ওয়ানডেতে গড়া কীর্তি পুরো একটি টেস্ট একাদশ নিয়ে আলোচনার চেয়ে ছোট নিউজ-যোগ্য মনে হয়?

খেলাটার চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে গেল কবে?

আরে ভাই, আলাপ তো এটা হবে যে, হ্যাঁ, সাকিব আল হাসান ওয়ানডের সেরা একাদশে আছেন, কিন্তু, টেস্টের একাদশে তো নেই। কেন নেই, কী করলে থাকতে পারতেন, আলাপ হতে হবে এই লাইনে। অথচ, এটা নিয়েই উদযাপনে মাতোয়ারা আমরা! কে কার চেয়ে বড় জাতীয়তাবাদী সেটা প্রমাণ করতে হবে না! আর জাতীয়তাবাদের মশলা দিয়ে সাকিবকে না বিক্রি করলে টিভি-অনলাইনের টিআরপি কিংবা পত্রিকার বিক্রি-বাট্টা হবে কী করে!

একটা খেলার স্পিরিট মিডিয়ার জাতীয়তাবাদী ব্যবসায়িক কৌশলের কাছে কত ন্যাক্কারজনকভাবেই না নত হয়ে থাকে!

আমাদেরও, কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কি গণমাধ্যম, সর্বত্র আগে টেস্ট ক্রিকেট, তার পর অন্য ক্রিকেট নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা করা উচিত। তাতে সাকিব আল হাসান থাকলেন কি না সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্বটা স্বীকার করে নেওয়া৷

আপনি ক্রিকেট নিয়ে লাফালাফি করেন, কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে মাথাব্যথা নেই, এই হিপোক্রেসি থাকলে আপনার ক্রিকেটের লেখা আমি খাই না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, জাতীয়তাবাদ ও প্রচারসর্বস্ব লম্ফঝম্পই আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের মতো ক্লাসিক খেলাটাকে, বয়সে বাড়ালেও, বুদ্ধিতে বাড়তে দিল না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।