ক্রিকেটের বাইবেল উইজডেন: সেকালের কথা

ক্রিকেটার্স আলম্যানাক এর প্রথম খণ্ড প্রকাশ করতে গিয়ে আমাদেরকে নানাবিধ বাঁধা ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে। বিশেষ করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার কাজটি যথেষ্ট কঠিন ছিল. তবে, আমাদের বিশ্বাস গৌরবময় এই খেলাটির সকল ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীর কাছেই আমাদের এই প্রয়াসটি ভাল লাগবে। সঙ্গত কারণে প্রথম সংকলনটিকে বড় পরিসরে করা সম্ভব হয় নি। আপনাদের ভাল লাগলে আগামীতে আরও বেশি ম্যাচের বেশি তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করার আশা করছি।

উইজডেন ক্রিকেটার্স আলম্যানাক, ১৮৬৪।

ঘটনার শুরু জন উইজডেন এর হাত ধরে, যিনি শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্রিকেটার হিসেবে দারুণ সফলতা পেয়েছিলেন। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষিক্ত হবার সময় তাঁর উচ্চতা ছিল মাত্র সাড়ে ৫ ফুট এবং ওজন ছিল ৪৪ কেজি! তবে, স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভয়ানক রাউন্ড-আর্ম ফাস্ট বোলার হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যান। অবশ্য, তাঁর সেরা অস্ত্র ছিল অফ কাটার বলগুলো। বয়সের কারণে পরের দিকে গতি কমে গেলেও নানা বৈচিত্র্য দিয়ে ব্যাটসম্যানদের ঘায়েল করতেন।

খেলার মাঠে উইজডেনের সেরা সাফল্য উত্তর (ইংল্যান্ড) দলের বিরুদ্ধে। ১৮৫০ সালে দক্ষিণ (ইংল্যান্ড) দলের হয়ে লর্ডস মাঠে একাই ১০ উইকেট দখল করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে সব ক’টিই ছিল বোল্ড আউট। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের ইতিহাসে বোল্ড আউটের মাধ্যমে সকল উইকেট দখল করার এটাই একমাত্র নজির! বাত-জ্বরের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার বেশি লম্বা হতে পারেনি। ১৮৭ ম্যাচে ১০.৩২ গড়ে ১,১০৯ টি উইকেট দখল করেছেন। খেলা থেকে অবসর নেন ১৮৬৩ সালে, ৩৭ বছর বয়সে।

জন উইজডেন

ক্রিকেট খেলাকালীনই তিনি সতীর্থ ফ্রেড লিলি-হোয়াইট এর সাথে পার্টনারশিপে ‘ক্রিকেট এন্ড সিগার’ নামে একটি দোকান দিয়েছিলেন কোভেন্ট্রি স্ট্রিট এলাকায়। পাশাপাশি ক্রিকেট কোচিং ও করাতেন। তবে, ইতিহাসের পাতায় নিজের নামকে চিরস্থায়ী করেছেন ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার বছর-খানেক পর। যখন তিনি ক্রিকেটের উপর একটি বার্ষিকী ছাপাবার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত লিলি-হোয়াইট এর ‘দ্যা গাইড টু ক্রিকেটার্স’ কে টেক্কা দেয়ার জন্য তিনি এই কাজটি হাতে নিয়েছিলেন। আর এভাবে নিজের অজান্তেই ক্রিকেটের যুগান্তকারী একটি ঘটনার সূত্রপাত ঘটে।

উইজডেন ক্রিকেটার্স আলম্যানাক (বা সংক্ষেপে শুধুই উইজডেন) শুধু ক্রিকেটই নয়, যে কোন ক্রীড়ার ক্ষেত্রেই বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো ম্যাগাজিন যা এখনও সগৌরবে চলছে। ক্রিকেটের ভক্তদের কাছে একে নতুন করে পরিচয় দেয়ার কিছু নেই, তবে যে ম্যাগাজিনটি দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে অত্যন্ত সুনামের সাথে এগিয়ে চলেছে তার সম্পর্কে আরেকটু বেশি না বললেই নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে এটি দুইটি বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৪৪ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড সহ্য করেও টিকে ছিল। অবশ্য, ১৯৪৪ সালের অগ্নিকাণ্ডে তাদের সকল নথি-পত্র পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

তৎকালীন রীতি অনুযায়ী প্রথম খণ্ডের দারুণ বাহারি একটি নাম ছিল- ‘The Cricketer’s Almanack for the Year 1864, being Bissextile or Leap Year, and the 28th of the Reign of Her Majesty Queen Victoria।’ সম্পাদক ছিলেন ডব্লিউ এইচ ক্রকফোর্ড এবং ডব্লিউ এইচ নাইট। দুজনে মিলে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮৬৯ পর্যন্ত। এরপর জনাব নাইট এককভাবে সম্পাদনার দায়িত্ব হাতে তুলে নেন এবং পরবর্তী দশ বছর সেটা পালন করেন।

১১২ পাতার ম্যাগাজিনটির দাম ছিল এক শিলিং। কাগজ ছিল গোলাপি রঙের এবং বাঁধাই ছিল সফট-ব্যাক। বইটির সাথে বর্তমান সময়ের হলুদ রঙের শক্ত বাঁধাই এর সাথে কোন মিল পাওয়া যাবে না। প্রথম সংকলনে সেসময়কার অনেক ম্যাচের স্কোর-কার্ড এবং এমসিসি’র সর্বশেষ আইনগুলোর উল্লেখ ছিল। এছাড়াও, ১৮৫০ থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত শতরানের ইনিংসের তালিকাও দেয়া হয়েছিল। কেউ বাড়িতে বসে নিতে চাইলে তার জন্য (গ্রেট ব্রিটেনের যে কোন স্থানে) ১৩ স্ট্যাম্পের বিনিময়ে ডাকযোগে পাঠাবার অফারও ছিল।

তবে, শুরুতে এটি পুরোপুরি ক্রিকেট ম্যাগাজিন ছিল না। ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য খেলা ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও উল্লেখ ছিল। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, গৃহযুদ্ধের খবর এমনকি প্রথম চার্লস এর বিচারের সর্বশেষ খবরও এতে স্থান পেয়েছিল। ১৮৯১ সালে সিডনি পারডন সম্পাদক হিসেবে যোগদান করার পর ক্রিকেটের বাইরের খবর ছাপানো বন্ধ করেন। তাঁকে উইজডেনের সর্বকালের সেরা সম্পাদক হিসেবে পরিগণিত করা হয়। তিনিই সর্বপ্রথম সেরা পাঁচ ক্রিকেটার নিয়ে সম্পাদকীয় লেখা শুরু করেন ১৯০১ সালে। যা আজও অব্যাহত রয়েছে।

উইজডেনকে ক্রিকেটের বাইবেল বলা হয়ে থাকে। বর্তমান সম্পাদকের নাম লরেন্স বুথ।

_______________

ভারতের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক অভিষেক মুখার্জী ক্রিকেটসকার.কমে Cricket history in quotes নামক দারুণ একটি সিরিজ লিখেছেন। এই সিরিজে তিনি ইতিহাস খুঁড়ে তুলে এনেছেন সাধারণ মানুষের উক্তিতে বা লেখায় উল্লেখ করা ক্রিকেটের সব দারুণ রেফারেন্স। মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল ফোকাস ক্রিকেট ছিল না, অন্য কোন কিছুর সাথে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে! আমি অসাধারণ সেই সিরিজটির ভাবানুবাদ করার চেষ্টা করছি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।