ক্রিকেট বিশ্বায়ন ও আইসিসি

আইসিসি, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ক্রিকেটের অভিভাবকত্ব যার হাতে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে বেশ কয়েকবার নাম বদলালেও বদলায়নি লক্ষ্য উদ্দেশ্য। ‘গ্রেট স্পোর্ট, গ্রেট স্পিরিটি’ স্লোগানকে সামনে রেখে ক্রিকেটকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলায় পরিনত করার লক্ষ্যে শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্রিকেটের অভিভাবক এই সংস্থাটি।

যার ফলশ্রুতিতে এই কম্পিটিটিভ যুগে ফ্যান-ফলোইংয়ের দিক থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনপ্রিয় খেলার নাম ক্রিকেট। আর্থিক অসঙ্গতি,আগ্রহী সদস্যর অভাব,দীর্ঘ সময় সাপেক্ষতা ইত্যাদী সমস্যাকে ছাপিয়ে ক্রিকেটকে সার্বজনীন স্পোর্টসে পরিনত করার পিছনে আইসিসির প্রশংসনীয় পদক্ষেপগুলো কী?

একবিংশ শতাব্দীতে এসে ক্রিকেটের অসামান্য উত্থান এবং এর পিছনের মাস্টারপ্ল্যান সবটাই আড়াল হয়ে রয়েছে সমসাময়িক কিছু বিতর্কের অন্তরালে। ‘বিগ থ্রি’র কলঙ্ককে ছাপিয়ে নতুন উদ্যমে চলছে আইসিসি, লক্ষ্য একটাই, ক্রিকেটকে বিশ্বের সেরা ক্রীড়ায় পরিনত করা।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আইসিসির মাস্টারপ্ল্যান ‘প্রজেক্ট ওয়াইল্ডফায়ার’ এবং অন্যন্য অবকাঠামোগত পরিকল্পনা’র আদ্যোপান্ত নিয়েই আসছি আজ। চলুন দেখে নেয়া যাক..

  • দ্য ভিশন

ক্রিকেটকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া মাধ্যমে পরিণত করার লক্ষ্যে সদস্য বৃদ্ধি করা,ক্রিকেটে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহন নিশ্চিত করা,বৈচিত্রময় টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আলোড়ন তৈরী করা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি ক্রিকেটকে নিস্কলুষ রাখার মাধ্যমে চার বছরব্যাপী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।

  • স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান

লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্য আইসিসি প্রতি চার বছরব্যাপি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান নিয়ে থাকে, চলমান প্ল্যানের শুরুটা ২০১৬ সালে। অর্থাৎ এই প্ল্যানের মেয়াদ ’১৬ থেকে ’১৯ সাল পর্যন্ত।

এই ৪ বছরে আইসিসি যেসকল লক্ষ্য বাস্তবায়নে নজর দিচ্ছে তা হলো –

১. লক্ষ্য – বল ব্যাটে সমতা আনয়ন

পদক্ষেপ: ব্যাটের সাইজ সীমিত করে দেয়া,

‎ বলের ম্যাটারিয়্যালস পুনঃবিবেচনা করা।

২. লক্ষ্য – স্পোর্টিং পিচ নিশ্চিত করণ।

পদক্ষেপ: প্রতি ম্যাচে পিচ এবং আউটফিল্ডের উপর র্যাটিং প্রদান, এবং তার ভিত্তিতে অপরিণত পিচ এবং আউটফিল্ডের কারনে ডিমেরিট পয়েন্টের মাধ্যমে স্টেডিয়ামকে সাময়িক নিষিদ্ধকরন।

৩. লক্ষ্য – নতুন প্রযুক্তির ব্যাবহার।

পদক্ষেপ: ব্যাটে সেন্সর যুক্তকরণ, ড্রোন পিচ রিপোর্টার এবং প্রথমবারের মতো ভিআর এক্সপেরিয়েন্সের ব্যাবস্থা।

৪. লক্ষ্য – সফল আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করা।

অর্জন: সবচেয়ে বড় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ আয়োজন, মোস্ট ওয়াচড চ্যাম্পিয়নস ট্রফি আয়োজন। ‎এছাড়াও এবছরের শেষে অনুষ্ঠিতব্য নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০১৯ বিশ্বকাপকে আইসিসির ইতিহাসের সবচে’ সফল ইভেন্টে রুপদানের পরিকল্পনা রয়েছে।

এছাড়াও ক্রিকেটকে নিস্কলুষ রাখতে আকসুকে শক্তিশালী করা, বর্নবাদ নির্মূল করা এবং ডোপিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নেয়া এই চার বছরের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের অংশ। স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানের বাহিরেও আইসিসি কর্তৃক গৃহীত অবকাঠামোগত কর্মসূচিও রয়েছে মাস্টারপ্ল্যানের অংশ হিসেবে।

মেম্বারশিপ মডেল: আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রিকেটকে প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ন রাখার জন্য মেম্বারদের দুটি পর্যায়ভুক্ত করে থাকে আইসিসি, পূর্ন সদস্য এবং সহযোগী সদস্য। পুর্ণ সদস্যের অধীনে ১২টি দেশ রয়েছে যারা আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা রাখে। এ তালিকার সর্বশেষ সংযোজন আফগানিস্তান এবং আয়ারল্যান্ড।

৭-১০টি ক্রাইটেরিয়া মেনে চলতে পারলে আইসিসি এ মেম্বারশিপ দেয়, যেকারনে ক্রিকেটের অভিজাত এই স্তরে সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্ধীতা নিশ্চিত থাকে। এর বাইরে রয়েছে ৯২টি সহযোগী দেশ, ৪টি দেশ বাদে এদের আন্তর্জাতিক টেস্ট এবং ওয়ান-ডে খেলার স্ট্যাটাস নেই। তবে সদ্য আইসিসির যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের ফলে সবাই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি স্ট্যাটাসের অধিকারী হয়েছে।

এছাড়াও তাদের নিয়ে আইসিসির ভিন্ন টুর্নামেন্ট ব্যাবস্থা রয়েছে, যেকারনে এপর্যায়ের ক্রিকেটেও ভারসাম্যপুর্ন প্রতিযোগীতা সৃষ্টি হয়েছে।

এ্যাসোসিয়েট টুর্নামেন্ট: সহযোগী দেশগুলোকে প্রতিযোগীতামুলক ক্রিকেটে রাখতে আইসিসির দুটি বড় ইভেন্ট রয়েছে, ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগ এবং ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।

ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট লিগের শুরু হয়েছে ২০০৭, প্রথমে এটি ৮টি ডিভিশনে বিভক্ত থাকলেও বর্তমানে ডিভিশনের সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে এনেছে আইসিসি। প্রতিটি ডিভিশনে ৬টি করে টিম, পঞ্চম ডিভিশনে দুটি বেশি।

প্রতি ৩-৪ বছরে এই ৫০ ওভারের ফর্মেটে লিগ সম্পন্ন হয়, লিগের সর্বশেষ আসরের (১৫-১৭) চ্যাম্পিয়ন। প্রতিটি ডিভিশনের খেলা হয় রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে, ডিভিশনাল রাউন্ড শেষে শীর্ষ দুটি দল হাইয়ার ডিভিশনে উত্তীর্ন হয় এবং একদম নিচের দুটি দল লোয়ার ডিভিশনে রেলিগেট হয় বাকি দুটো স্ব স্ব ডিভিশনে বহাল থাকে।

আইসিসির এই ভিন্নধর্মী স্ট্রাকচারের ফলে বিশ্বব্যাপি ক্রিকেটদল গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মান বজায় থাকে, এবং দলগুলোর মাঝেও উৎসাহ উদ্দীপনার কারনে দেশগুলোতে ক্রিকেটের দ্রুত প্রসার হচ্ছে।

আইসিসি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ৪ দিনের ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচের ফর্ম্যাটে। আড়াই বছর ব্যাপী এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহন করে ৮টি দল। সর্বশেষ এই টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তুলেছে আফগানিস্তান, রানার্সআপ হয়েছে আয়ারল্যান্ড। পরবর্তিতে দুটো দলকেই দেয়া হয়েছে টেস্ট স্ট্যাটাস।

ডেভলপমেন্টস: ক্রিকেটের বিশ্বায়ন নিশ্চিত করতে সহযোগী দেশগুলোতে ক্রিকেটের উন্নয়নে আইসিসি একটি ডেভলপমেন্ট টিম গঠন করেছে। যারা ক্রিকেট ছড়িয়ে থাকা পাঁচটি মহাদেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

উল্লেখ্য এশিয়া মহাদেশে ডেভলপমেন্ট টিমের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশের কৃতি ক্রিকেটার আমিনুল ইসলাম। সহযোগী দেশগুলোকে পরামর্শ থেকে শুরু করে কোচিং স্টাফ পর্যন্ত দেয়া হয় এই টিমের অধীনে।

ডেভলপম্যান্ট টিমের কার্যক্রমে ক্রমেই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রিকেট। ফলশ্রুতিতে সব মহাদেশ জুড়ে পূর্ণ সদস্যের বাইরেও দেড় মিলিয়নের বেশি ক্রিকেটার রয়েছে বর্তমানে,  আমেরিকার মতো মহাদেশেও ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বিশেষত ব্রাজিলে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আফ্রিকায় ২২টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে আইসিসির। জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা বাদেও নামিবিয়া, কেনিয়া, সুইজাল্যান্ড, মরক্কোর মত দেশে ক্রিকেটের দ্রুত প্রসার হচ্ছে। ইউরোপে সবচেয়ে বেশী সহযোগী দেশ এবং এশিয়ায় রয়েছে সর্বোচ্চসংখ্যক পুর্ন সদস্য। এবং নতুন সদস্যর সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়াও ডেপলপমেন্ট কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুবাইয়ে রয়েছে বিশ্বমানের ক্রিকেট একাডেমী।

অর্থনৈতিক মডেল: ‘বিগ থ্রি’ প্রহসনের পর নতুন মডেলে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে আইসিসি, যা ক্রিকেটকে সার্বজনীন করতে অগ্রনী ভুমিকা পালন করবে। নতুন মডেল অনুসারে সহযোগী দেশগুলো ২০১৫-২৩ সালে এই ৮ বছরে ৫৫০ মিলিয়ন অর্থ পাবে, যা বিগত সময়ের থেকে প্রায় দ্বিগুণ।

প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বাংলাদেশ,জিম্বাবুয়ে সহ স্বল্পন্নোত ক্রিকেট পূর্ণ সদস্যদের ফাউন্ডও। ধীরে ধীরে স্পোর্টস জগতে নিজেদের হারানো রাজত্ব ফিরে পাচ্ছে ক্রিকেট। প্রায় দু’শ কোটি ফলোয়ার নিয়ে ক্রিকেট এখন ফুটবলের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। সদস্য সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, স্প্যানিশ ফুটবল লিগ লা লিগার পেইজেও ক্রিকেটের দেখা মিলছে আজকাল।

এই কৃতিত্ব কার? অংশগ্রহনকারী দেশগুলোকে একসুত্রে শৃঙ্খলযুক্ত রাখা আইসিসিই এই আহুত বিপ্লবের প্রধান সমন্বয়ক। ক্রিকেটকে একঘরে করে দেয়া ‘বিগ থ্রি’ ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আইসিসি বুঝিয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের পরিচালনাভার সঠিক হাতেই রয়েছে।

শুধুমাত্র অন্তর্কোন্দল এবং রাজনীতিক বিষমুক্ত হতে পারলেই আইসিসি হয়ে উঠবে বিশ্বসেরা স্পোর্টস অর্গানাইজেশনের একটি। এবং ক্রিকেটও হয়ে উঠবে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় ক্রীড়া মাধ্যম। এবার শুধু পরিকল্পনাকে কাগজে কলমে বাস্তবায়নের পালা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।