বিচ্ছেদের ৫০ বছর পর পুনর্মিলন: একটি অশ্রুসজল ভালবাসার গল্প

সাল ১৯৬২। ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলস। অক্সিডেন্টাল কলেজের ক্যাফেটেরিয়ায় এক অলস বিকেলে প্রথম পরিচয় জেনিস রুড ও ‍উইলসন প্রেনটিসের। শুরু হল মেলামেশা। বিয়ের সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন।

গল্পের এটুকুতে কোনো বৈচিত্র। গল্পের টুইস্ট আছে এর পরেই। বিয়ে করতে করতেই যে কেটে যায় আরো ৫০ টি বছর। কেন? চলুন, সেই আবেগী গল্পটাই এবার জানা যাক।

ষাটের দশক। রোজ খুব ভোরে উইলসন ঘুম থেকে উঠেন কেবল একটি কারণেই। সকাল সকাল ক্যাফেটেরিয়ায় গেলে এক ঝলকের জন্য হলেও জেনিসকে দেখা যাবে। উইলসন  বয়সে জেনিসের চেয়ে ছোট। স্কুলের সেই দিনগুলোতে নিজের তাই কোনোই সুযোগ দেখেননি উইলসনই। বারবারই নিজের মনকে স্বান্তনা দিয়ে বলতেন, ‘ও আমার যোগ্যতার তুলনায় একটু বেশিই সুন্দরী।’

এভাবেই চলছিল দু’জনের চোখাচোখি। একবার এক থ্যাঙসগিভিং-এ জেনিসের কাছ থেকে বড় একটা ‘সারপ্রাইজ’ পেয়ে বসেন উইলসন। এক বন্ধুর কাছ থেকে উইলসনের বাড়ির ঠিকানা যোগার করেন। প্রায় ১৫০ মাইল গাড়ি চালিয়ে উইলসন ও তাঁর পরিবারের সাথে উইকেন্ড কাটাতে চলে আসেন জেনিস।

দেশটার নাম আমেরিকা হলেও সময়টা ছিল ষাটের দশক। তখন, ওখানেও হুট করে এক ছেলে বন্ধুর বাসায় বান্ধবীর চলে আসাটাকে লোকে আর যাই হোক শুধুই বন্ধুত্ব মনে করতো না। ১৯৬২ সালের ডিসেম্বরে এই জুটি বাগদানের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেন। স্থানীয় একটা পত্রিকাতে সেই খবরটাও ছাপা হয়েছিল।

এবার গল্পে একজন ‘ভিলেন’-এর আগমণ ঘটলো। তিনি হলেন জেনিসের বাবা। জেনিস যখন বাবাকে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানালেন, তখন তিনি মোটেও সন্তুষ্ট হলেন না। ওই সময় অন্যান্য মেয়ের মত জেনিসেরও নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার মত সাহস ছিল না। পরিবারের অমত হলে পড়াশোনার খরচ বন্ধ করে দেওয়ার বা পুরো সম্পর্ক ছিন্ন করারও হুমকি আসতে থাকে।

জেনিসের বাবার সম্পর্ক না মেনে নেওয়ার পেছনেও অবশ্য যৌক্তিক কারণ ছিল। কারণ উইলসন ছিলেন ইহুদি। আর জেনিসের পরিবার ছিল খ্রিষ্টান। যদিও, জেনিসের মা দু’জনের ভালবাসার গভীরতাটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি নিজের স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। যদিও, কোনো লাভ হয়নি।

উইলসন আর জেনিস নিজেদের ভালবাসা জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য হন! তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু, গল্পটা কিন্তু এখানেই শেষ হয় না। বরং এখান থেকেই শুরু হয়। বাকিটা গল্প যেন হার মানায় কোনো সিনেমার স্ক্রিপ্টকেও!

অবশেষে সেই বিয়ের দিন

উইলসন পড়াশোনা করতে চলে যান হার্ভার্ডে, আইন নিয়ে পড়াশোনা করতো। জেনিসও পরিবারের ডাইভিং বোর্ডের ব্যবসায় মন দেন। একটা সময়ে এসে দু’জনই বিয়ে করেন। যদিও কারো সংসারই টেকেনি।

দু’জনের পরিবারেই মৃত্যু আসে। দু’জনই সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের মা-কে হারান। তবে, সেই দু’টি মৃত্যুই দু’জনকে আবারো কাছ নিয়ে আসে। এটাই তো সম্পর্কের ম্যাজিক, একজন চলে গেলে সেটা পূরণ করার জন্যও তো অন্য কাউকে দরকার।

দু’জনেই মায়ের পুরনো জিনিসপত্র ঘাটতে গিয়ে নিজেদের বাগদানের খবরের পেপারকাটিংটা খুঁজে পান। মুহূর্তের মধ্যে যেন অতিতটা তাঁদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এমন না যে, ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তাঁদের আর দেখা হয়নি। দেখা হয়েছে, কিন্তু সে সময় দু’জনই ছিলেন বিবাহিত।

কিন্তু, এই সময়টাতে দু’জনই ছিলেন সিঙ্গেল, নি:সঙ্গ। জেনিস তাই দেখা করতে চাইলেন উইলসনের সাথে। ছাড়াছাড়ির প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার দিন বাদে এই জুটি আবারো স্যান ফ্রান্সিসকোর ক্লিফ হাউজে ডেট করলো।

বহুল প্রতীক্ষিত সেই বিয়ের কার্ড

এখান থেকে শুরু হল গল্পের দ্বিতীয় অধ্যায়। জেনিস-উইলসনের প্রেমকাহিনীর সেকেন্ড ইনিংস। ২০১২ সালের ১৯ আগস্ট তাঁরা সেই অক্সিডেন্টাল কলেজের ক্যাফেটেরিয়াতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এখানেই তো ৫০ বছর পর প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁদের।

তাঁদের বিয়ের কার্ডে ১৯৬২ সালের সেই পেপার কাটিংটাও ছিল। ভাগ্যে লেখা থাকলে কি না হয়, প্রেম গভীর হলে তো বিশ্বজয়ও করা যায়!

ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।