করোনাভাইরাস: ঝুঁকিতে প্রবাসী আয় প্রবাহ!

বলা হয় – ‘চীন কষ্ট পেলে বিশ্ব কাঁদে।’ বাংলাদেশও বোধকরি ধীরে ধীরে সেই কষ্টের ছোঁয়া পেতে শুরু করেছে। মূল ধাক্কাটা লেগেছে দেশের অর্থনীতির জীবনীশক্তি তথা প্রবাসী আয় খাতে।

চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ ছিল ১.৬৩ বিলিয়ন ডলার, যা গত ডিসেম্বরের তুলনায় ৩.১৪% কম। পরবর্তীতে, ফেব্রুয়ারি মাসে এই প্রবাহ আরও ১১.৩৬% কমে দাঁড়িয়েছে ১.৪৫ বিলিয়ন ডলারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি’র ক্রমনিম্নমান সূচকের কারণে এই প্রবাহ আরও কমবে সামনের দিনগুলোতে।

‘যদিও বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকাতে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ছে, তথাপি পেট্রোলিয়ামের নিম্নমুখী চাহিদার কারণে গালফ দেশগুলো অর্থনৈতিক মন্দার সম্মুখীন হচ্ছে, যা বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য অশনি সংকেত’, এমন মন্তব্য করেছেন এইচ মনসুর, নির্বাহী পরিচালক, পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট ও সাবেক অর্থনীতিবিদ, আইএমএফ। তাঁর মতে, অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিটেন্স আসা কমে যাবে যার সরাসরি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

ইতোমধ্যে, জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারি মাসে, দেশের মোট রেমিটেন্সের শীর্ষ দুই উৎস দেশ, সৌদি আরব ও দুবাই থেকে রেমিটেন্স প্রবাহ কমে গিয়েছে যথাক্রমে ৪২.৪৬ মিলিয়ন ডলার ও ৬৫ মিলিয়ন ডলার। জাপান থেকেও ৪.১ মিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স প্রবাহ কমেছে গত দুই মাসে। ইতালিও কিন্তু বাংলাদেশের রেমিটেন্সের অন্যতম প্রধান উৎস। গোটা ইতালি এখন লকডাউন। বুঝে নেন তাহলে ! ইউরোপের দেশগুলো থেকেও গত দুই মাসে রেমিটেন্স প্রবাহ করেছে যথাক্রমে ১০ মিলিয়ন ডলার ও ২৬ মিলিয়ন ডলার।

চলতি অর্থবছর থেকে ২% নগদ প্রণোদনার ফলে রেকর্ড পরিমাণ রেমিটেন্স এসেছিল গত বছর, ১৮.৩২ বিলিয়ন ডলার। তবে মনসুরের মতে, এই ২% নগদ ভর্তুকি এখন কাজ করবে না কারণ করোনা ভাইরাসের কারণে উৎস দেশগুলো নিজেরাই উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক মন্দা’র ভেতর আছে। যে দেশগুলোর অর্থনীতি করোনা ভাইরাসের কারণে বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে, তাদের দীর্ঘ সময় লাগবে নিজেদের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে।

তিনি আরও বলেন, ‘চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি বড় ধরণের ধাক্কা খাবে কারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রেমিটেন্সের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশ তার ব্যাল্যান্স অব পেমেন্ট বজায় রাখতে বড় ধরণের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে না যেহেতু তেলের মূল্য বিশ্বব্যাপী নিম্নমুখী।’

তবে তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত দেশের প্রবাসী শ্রমিকরা চাকুরী হারাতে পারেন যদি পেট্রোলিয়াম রপ্তানি বিপদজনক হারে কমে যায় কারণ সেখানকার অর্থনীতি অনেকটাই এর ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসাইন বলেন, ‘এছাড়াও দেশে অর্থ পাঠানো অধিকাংশ প্রবাসী মূলত ফাস্ট ফুড, গ্রোসারি শপ – এই ধরনের ক্ষুদ্র-মাঝারী ব্যবসায় জড়িত। যেহেতু আক্রান্ত দেশগুলোতে বেশীরভাগ মানুষই গৃহবন্দী অবস্থায়, সেহেতু ক্ষুদ্র মাঝারী ব্যবসাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রবাসীদের আয় প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে ব্যাপকভাবে। একই সাথে অনেক বড় বড় কোম্পানি তাদের কর্মীদের জোর পূর্বক ছাঁটাই করতঃ পণ্য উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।’

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, ‘এই মুহূর্তে, দেশের অর্থনীতির একমাত্র ইতিবাচক সূচক, রেমিটেন্সের যে নিম্নমুখী প্রবণতা, সেটাকে সামাল দেওয়ার মতো কোন সমাধান নেই আপাতত। দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে এখনও নিম্নমুখী রেমিটেন্স বা বৈশ্বিক মন্দার ধাক্কা লাগেনি কারণ আমদানি সূচকও নিম্নমুখী। তবে সমস্যা তৈরি হবে যখন আমদানি বাড়বে। চলতি অবস্থায় সরকারের উচিৎ স্বল্প মেয়াদে নগদ প্রণোদনা আরও ২% বাড়ানো, যাতে রেমিটেন্স গ্রহীতা’রা উপকৃত হন।’

– দ্য ডেইলি স্টার অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।