করোনা ভাইরাস ও তার মিথ: এক্সপোজড

করোনা ভাইরাস নিয়ে শত শত সতকর্তাবাণীমূলক লেখা, খবর হয়েছে। এই লেখাটা একটু ভিন্নধর্মী। করোনা ভাইরাস নিয়ে বেশ কিছু জার্নাল, বিশেষজ্ঞদের মতামত, ভাইরাসটির অতীত বিশ্লেষণ আলোচনা করে তুলে ধরছি।

মিথ মানে যেটা প্রচলিত, কিন্তু তার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না। অবাক করার বিষয় হচ্ছে করোনা নিয়ে মিথের অভাব নেই সারাবিশ্বে।

  • মিথ ১: করোনা ভাইরাস উহানের একটি ফিশ মার্কেট থেকে ছড়িয়েছে, যেখানে মানুষ বাদুড় খায়।

উত্তর: উহানের প্রথম ৪১ জন করোনা আক্রান্ত রোগীর ১৩ জনের কোন সম্পর্কই ছিল না সেই ফিশ মার্কেটের সাথে। তাদের সাথে বাকি ২৮ জনের কখনো দেখা হয়নি, কিংবা সেই ১৩ জন কখনো ঐ ফিশ মার্কেট বা তার আশেপাশের এলাকায় যাননি। সুতরাং সবাই ফিশমার্কেট থেকে আক্রান্ত না হলে ভাইরাস আসলো কোথা থেকে? অর্থাৎ এটা নিশ্চিত যে এই ভাইরাসের উৎপত্তি উহানের সেই সামুদ্রিক ফিশ মার্কেট নয়।

এর পিছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো নোভেল করোনার ৫ টি রুপের মাত্র একটি পাওয়া গিয়েছিল উহানে।কিন্তু আমেরিকায় মিলেছিল সবগুলো।সুতরাং শাখা যেহেতু আছে উহানে গাছ নিশ্চয়ই আমেরিকাতে। এর পক্ষে বিপক্ষে বহু যুক্তিখণ্ডন ঘুরেছে গত ২ মাসে।তবে আস্তে আস্তে মোটামুটি পরিষ্কার হয়েছে আসল ঘটনা। উহানে প্রথম রোগী মেলে ১ ডিসেম্বর ২০১৯-এ। পাঠকদের জন্য এই তথ্যটা মাথায় রাখা জরুরি।

ওয়াশিংটনের ডিজিস এক্সপার্ট ডেনিয়েল লুসি এক আর্টিক্যালে বলেছিলেন প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী পাওয়া গিয়েছিল গত নভেম্বরে! আরেকদল আমেরিকান সায়েন্টিস্ট বলেছেন, না! গত সেপ্টেম্বরেই করোনা আউটব্রেক হয়েছিল আমেরিকাতে।তাদের কথার যুক্তিও আছে বটে।সেটা পরের অংশেই ক্লিয়ার হওয়া যাবে।

যারা বিশ্ব স্বাস্হ্য নিয়ে মোটামুটি চোখ কান খোলা রাখেন, তারা গতবছরের আগস্টে ই-সিগারেট কাণ্ড জানার কথা। আমেরিকায় বেশ কিছু রোগী বুকের ব্যথা এবং নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে মারা যান। অদ্ভুত সে ভাইরাস চিনতে না পেরে তাদের খাদ্যাভ্যাস ঘেটে ই-সিগারেটের খোঁজ মেলে। সুতরাং তৎকালীন সব দোষ জুটে ই-সিগারেটের ঘাড়ে। তাইওয়ানিজ এক চিকিৎসক সেটাকে সম্ভাব্য করোনা ভাইরাস বলে আমেরিকান অথোরিটিকে জানান, এবং তার কথা সবাই ইগ্নোর করে।

এবার আসা যাক আসল ঘটনা নিয়ে। করোনা ভাইরাস এর উৎপত্তি নিয়ে কাহিনীর সন্দেহটা জাগে যখন একজন জাপানিজ নাগরিক গত সেপ্টেম্বর মাসই আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। যে কিনা কখনো উহানে যায় নি,তার পক্ষে উহান থেকে সেটা পাবার সম্ভাবনা তখন ছিল না। কিছু কিছু মিথ একসময় সত্য প্রমাণ হয়ে যায়। গত জানুয়ারিতে যখন ইউএস এই করোনা ছড়িয়েছে বলে মিথ ছিল, সেটাই আংশিক সত্যে পরিণত হয়েছে।ইউএস মিলিটারির ফোর্ট ডেটরিকে জার্ম নিয়ে কাজ করা বায়ো-ল্যাব বন্ধ করে দেওয়া হয়।

গুগল করলেই সে নিউজ পেয়ে যাবেন।

নিউইয়র্ক টাইমস ৮ আগস্ট ২০১৯ এর পেপারে এই খবর বেরিয়েছিল। বায়ো-ল্যাব বন্ধ করার কারণ ছিল একটা ভাইরাস ল্যাব থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেই ঘটনাটা ছিল ই-সিগারেট মহামারির ঠিক পরেই। পরবর্তীতে যখন দেখা গিয়েছিল ই-সিগারেট মহামারীর সিম্পটমগুলো সরাসরি করোনা ভাইরাস সিম্পটমের সাথে মিলে যায়; সুতরাং তৎকালীন ই-সিগারেটের উপর দোষ দেওয়া আমেরিকানরা আসলে নিজেদের দোষে ভাইরাস ছড়ানোকেই আড়াল করছিল।

  • মিথ ২: আমেরিকানরা উহানে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে।

উত্তর: এটা আসলে মিথ নয় আবার পুরোপুরি সত্যিও নয়।যদিও করোনার উৎপত্তি ইউএস মিলিটারি ল্যাবে, তবুও সেটা নিজেরাই নিজেদের বডিতে করে নিয়ে আরেকজনের এরিয়ায় ছড়াবে সেটা পুরোপুরি বিশ্বাসযাগ্য নয়। কারণ ছড়ানোর ফলে নিজেদের এলাকাও যে আক্রান্ত হবে। চীনের উপর দোষ দিতে গেলে নিজেদের থলে ছিঁড়ার রিস্ক কেন নিবে তারা। তবে উহানে কীভাবে আসলো সেটার ঘটনাটা পাঠকদের জানা দরকার। উহানে গত বছরের অক্টোবরের ১৮-২৭ তারিখ অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্ব মিলিটারি গেমস। সেখানে ইউএস মিলিটারির ৫ জন অ্যাথলেট অজানা রোগে হাসপাতালের ভর্তি ছিলেন। যেহেতু তাদের সিম্পটম প্রকাশে দেরী হয়েছিল,তারা সেখানে এক সপ্তাহে পুরো উহানেই ঘুরে থাকতে পারে। যার প্রথম ভিক্টিম হয়তো ফিশ মার্কেটেও কাকতালীয়ভাবে খেতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই ফিশ মার্কেট গুঞ্জনের উৎপত্তি।

আর ঠিক এজন্যেই করোনা ভাইরাসের ‘পেশেন্ট জিরো’ বা জেনেসিস পেশেন্ট বা সহজ বাংলায় প্রথম রোগী শনাক্ত করা যায়নি। কারণটাও সহজ সে রোগী যে ই-সিগারেট মহামারীর (যা ছিল ভুয়া) আড়ালে হারিয়ে গিয়েছেন!

  • মিথ ৩: করোনা ভাইরাস ২৫ ডিগ্রীর বেশি তাপমাত্রায় মারা যায়।

উত্তর: ভাইরাস ল্যাবরেটরিতে চাষ করা হয় তো জানেন। অনেক ভাইরাস ১০০ ডিগ্রী ফারেনহাইট বা ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াসে কালচার করা হয়। যে জিনিস এই তাপমাত্রায় কালচারই হয় সেটা ২৫ ডিগ্রীতে কি হবে? হাস্যকর একটা মিথ ছিল এটা। ফ্যাক্ট হচ্ছে ৭০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় যেকোন ভাইরাসের দমন সম্ভবপর হয়; করোনাও তাই।

  • মিথ ৪: ব্রয়লার মুরগীতে করোনা ছড়ায়।

উত্তর: এটা মূলত ভারতের মিথ। এই মিথের ফলে ভারতে মুরগীর কেজি ২০ রুপীর নিচে নেমে গেছে। এটা সম্পূর্ণ ভুয়া। তবে জানার বিষয় হচ্ছে করোনা না হলেও এসব মুরগী বা তার ডিম নিপা ভাইরাস ছড়ানোতে কাজে লাগতে পারে। ভয়ের ব্যাপার না? না,ততোটা ভয়ের না যদি আপনি কারণটা জানেন। মুরগীর ডিম বা হাঁসের ডিম যাই খান সিদ্ধ বা ভাজি করে খেতে হবে। হাফ বয়েলে ভাইরাস মরে না; একটা ভাইরাস থেকে গেলেও শরীরে তা বেড়ে গিয়ে নিপা ভাইরাস হতে সক্ষম। সুতরাং এই অভ্যাস ত্যাগ করুন।

  • মিথ ৫: এটা সিজনাল ফ্লু এর মতো।

উত্তর: সবথেকে বড় মিথ সম্ভবত এটাই এবং ডেডলিয়েস্ট। ভাইরাসটির বর্তমান ফ্যাটালিটি রেট ৩% এর বেশি হলেও শুরুর দিকের মাইল্ড কেইস এবং টেস্ট না করা কেইস মিলিয়ে সেটা ১% এর মতো হবে।যা সিজনাল ফ্লু এর ফ্যাটালিটি রেট থেকে ১০ গুণ বেশি! প্রতিবছর সিজনাল ফ্লু তে সাড়ে ছয় লক্ষ মানুষ মারা যায়। যদি এটা সিজনাল ফ্লু এর মতোও ছড়ায় এবং আমরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করি তাহলেও বিশ্ব হারাতে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৬ মিলিয়ন মানুষ। ইনসেইন না হলে এটাকে সিজনাল ফ্লু এর কাতারে কেউ ফেলবেনা। তার চেয়ে বড় কথা এ রোগে আক্রান্ত হলে ফুসফুসের যে ক্ষতি হয় তা পরবর্তীতে শ্বাসকষ্টের কারণ হবে। সিজনাল ফ্লু এর ঠিক উল্টো এটা, যা লং টার্ম ক্ষতি করতে সক্ষম।

  • মিথ ৬: বয়স্করাই বেশি ঝুঁকিতে আছে।

উত্তর: দুর্বল ফুসফুসের অধিকারীরাই রিস্কে। সাধারণ বয়স্কদের ফুসফুস তুলনামূলক দুর্বল থাকে। তবে আমাদের দেশের বায়ুদূষণে ‘জোয়ান’দেরও হুমকিতে পড়তে হবে। ভাল ফুসফুস থাকলে ১০০ বছরের রোগীও রিকোভার করবে যার প্রমাণ গত সপ্তাহে উহানে শতোর্ধী রোগীর রিকোভার করা।

  • মিথ ৭: মাস্ক শুধু আক্রান্তরা ব্যবহার করবে।

উত্তর: ব্যাপারটা এরকম হলে বেশ কিছু দেশ শতভাগ মাস্ক পড়ার উপর কড়াকড়ি আরোপ করতো না।প্রকৃতপক্ষে মাস্ক ড্রপলেট থেকে সুরক্ষা দেয়, যা ছড়ানোর বড় মাধ্যম।এছাড়া অভ্যাসবশত হাত নাকে চলে গেলেও মাস্ক আপনাকে আটকে দিবে।তবে মাস্ক পড়লেই সুরক্ষিত সেটাও একটা মিথ।চোখ দিয়েও নানান পার্টিক্যাল চলে যায়।সুতরাং চশমা সাথে ব্যবহার করলে সুরক্ষার চান্স আরো বেড়ে যাবে।

  • মিথ ৮: ভাইরাসটি ছড়াতে একদম পাশাপাশি ১০ মিনিট থাকতে হয়।

উত্তর: যদিও এটা শুরুর দিকের মিথ।এখন সবাই জানেন যে এটা সেকেন্ডেস মধ্যেও ছড়িয়ে যেতে পারে।সরাসরি কিংবা ধাতব বস্তু কিংবা কাপড় থেকেও ছড়াতে পারে।

  • মিথ ৯: ইঁদুরের শরীরে এটার ফল ভাল এসেছে, আগামী দু’মাসেই ভ্যাকসিন চলে আসবে।

উত্তর: কোন ভ্যাকসিনই এত দ্রুত আসে না। এটা বাজারজাতকরণ করার সব ধাপ পেরোতে হবে। সাইড ইফেক্ট নিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে।তার জন্য কয়েক মাস লেগে যায়। ভাইরাস আউটব্রেকের শুরু থেকে ১ বছরের মধ্যে ভ্যাকসিন আসাই দ্রুততম কাজ। এ বছরের শেষ দিকের আগে এ রোগের ভ্যাকসিন বাজারজাতকরণ হবার সম্ভাবনা খুবই কম। অন্তত আগের সব ভ্যাকসিনের স্ট্যাটিসটিক্যাল ফল এটাই বলে।

  • মিথ ১০: এ রোগে ঠাণ্ডা এলাকায় বেশি মানুষ মরে।

উত্তর: ভাইরাসের কাছে ঠাণ্ডা গরম কিছু না সেটা আগেই উপরে ক্লিয়ার হয়েছে। ইতালিতে ৬% ফ্যাটালিটি রেট দেখে সবাই এটা ভাবছে। বাস্তবতা হলো এটা শুরুর দিকে বলে বেশি মরেছে,সামনে তরুণরা ভাল ফুসফুসের রোগীরা আক্রান্ত হয়ে এই রেট কমে যাবে। মূলত ইতালীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইউরোপ সেরা।তাই সেদেশের মানুষ বেশিদিন জীবিত থাকেন। মোট জনসংখ্যার ৪৫% বৃদ্ধ কোঠায় ঢুকে গেছেন। যার কারণে তাদের মোট জনসংখ্যার বিশাল অংশের ফুসফুস ‘বৃদ্ধ’। তাই সেখানে ফ্যাটালিটি রেটটাও বেশি। আরেকটা বড় কারণ ইতালি সরকার এটাকে ‘মিথ ৫’ এর মতো ভেবেছিল। সুতরাং তারা প্রিকশানারি ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে সহজেই এটা ছড়িয়ে যায়।

  • বোনাস মিথ (বাংলাদেশের জন্য): এসব বড়লোকদের রোগ, এসব মুসলিমদের হবেনা।

উত্তর: গরীবদের মরার চান্স কমই। তারা যে পরিবেশে জন্ম থেকে বেড়ে উঠেছে; তাতে প্রকৃতিই তাদের ইমিউনিটি সিস্টেম স্ট্রং করে দেয়।তবে যারা পুষ্টিজনিত স্বাস্থ্যঝুকিতে আছে তাদের এ রোগে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। তাই গরীবদের মাঝে মহামারি হলে বরং তাদের মাঝে মৃত্যুবরণ কম হবার সুযোগ নেই। অপরদিকে মুসলিম মানে প্র্যাক্টিসিং মুসলিম যদি প্রতিদিন নিজেকে ওজু আর গোসলে পরিষ্কার রাখে তাহলে তাদের ভাইরাস ধরার সুযোগ কম।বাট সরাসরি আক্রান্তের টাচে আসলে মুসলিমদেরকে ছাড় দেবার কোন মানসিকতা এই ভাইরাসের নেই। কারণ ভাইরাসের ধর্ম চেনার মতো এক্সট্রা কোষ নেই।

বাংলাদেশে উপরের মিথগুলো পোস্ট আকারে বেশ ভালভাবে গত কয়েকমাস সার্কুলেট হয়েছে। যেহেতু কোন বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না হলে সেটা নিয়ে কপি পোস্ট করার অভ্যাস নেই; তাই অনেকদিন অপেক্ষা করে যতটুকু জেনেছি তার সর্বোচ্চটা দিয়ে মিথ নিয়ে আলোচনাটা সাড়লাম। একটা কথা মনে রাখবেন, পৃথিবীতে অজানা জিনিসের কনস্ট্যান্ট সত্যি বলে কিছু নেই।আজকের সত্যি আগামীদিনের মিথ হতেই পারে। সবাই সাবধানে থাকবেন। মনে রাখবেন এটা সিজনাল ফ্লু যেমন নয়, তেমনি ইবোলার মতো মারণঘাতীও নয়। সচেতনতা আর সরকারের স্বদিচ্ছা সামাজিকভাবে করোনাকে হারাতে পারবো আমরা। মনে রাখবেন এটা এমন এক রোগ যেখানে স্বার্থপরদেরও মৃত্যু হতে পারে; বাঁচতে হলে সামাজিকভাবেই বাঁচতে হবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।