‘কুল ড্যুড’ প্রজন্ম, ফেক স্টারডম ও সাংস্কৃতিক দুর্ভিক্ষ

সাম্প্রতিক সময়ের দু’টো ঘটনা ফেসবুকে জন্ম দিয়েছে মুখরোচক ইস্যুর। ফেসবুক নয় শুধু, ইউটিউবও সরব ছিল তাতে। অনন্ত জলিল-হিরো আলম ব্যাটল এবং মামুন-অপু ভাইয়ের লড়াইয়ে নতুন ভিডিও কনটেন্টের দেখা পেয়েছে ইউটিউবাররা, ফেসবুক ফিডে ভেসেছে অসংখ্য লেখার সমাহার। একটি চলচ্চিত্র অঙ্গনের, অপরটি টিকটক প্রাঙ্গণের।

আমরা সেসব নিয়ে হরদম আলোচনা করেছি। আমাদের আলোচনায় এই মানুষগুলো আরও হিট হয়েছে। আগে থেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করা উনারা নিজেদের আবারো বিশাল কিছু ভাবতে শুরু করেছে। দিনশেষে তারা ক্ষণিকের জন্য হলেও লাভবান হচ্ছে, আর আমরা সমানে তলিয়ে যাচ্ছি অবনতির চোরাবালিতে।

বছর চার পাঁচেক আগে ফেসবুকে ডেসপারেটলি সিকিং আনসেন্সরড বা ডিএসইউ নামে একটা গ্রুপ ছিল। হিরো আলমের উঠে আসা সেখান থেকে। কোথাকার কোন ডিশ ব্যবসায়ী মিউজিক ভিডিও বানিয়েছে, তাকে পঁচানোর বাসনায় সেটি দেখে দেখে আমরা মাথায় তুলে ফেলেছি। পুরোপুরি অথর্ব, অযোগ্য, প্রতিভাহীন আশরাফুল হোসেন আলম, যার খায়েশ ছিল একদিন লোকে তাকে এক নামে চিনবে। হোক তা ভালো কিংবা খারাপ দৃষ্টিকোণ থেকে! সে সফল হয়েছে।

বন্ধুদের আড্ডায় গিয়ে আমি আপনি কথা পেড়েছি, ‘আরে জানিস, কোথা থেকে এক ছাগল এসেছে। মিউজিক ভিডিও নামাইছে। এত্ত লেইম রে মামা!’ এরপর ইউটিউব, ফেসবুকে ঢুকে ভিডিও দেখেছি, শেয়ার দিয়েছি। ব্যস, তরতরিয়ে ভিউ বাড়ছে। আলোচনা হচ্ছে। হালফিলে একই কান্ড করে যাচ্ছি অপু-মামুনদের বেলায়৷ টিকটক বা লাইকি, এই জিনিসগুলো গিলে খাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মকে। উঠতি বয়সের প্রায় শতকরা আশি ভাগ এদের চিনে৷ এদের ভক্ত হিসেবে বেড়ে উঠছে। ফ্যান গ্রুপ খুলছে। কতখানি সুস্থ বিনোদনের অভাবে ভুগলে এসব নিয়ে চর্চা করে সময় নষ্ট করছি আমরা!

দোষটা আসলে কাদের? তাদের নাকি আমাদের? তারা তো ভাইরাল হতেই এত কসরত করছে। বাংলাদেশে অসংখ্য প্রতিভাবান সঠিক মূল্যায়নের অভাবে ঝরে পড়ে। কেউই তাদের দেখে না। চলচ্চিত্রের কথাই ধরা যাক। সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’-র কথা কয়জন শুনেছি? বাংলাদেশের প্রথম অ্যান্থোলজি ফিল্ম ‘ইতি তোমারই ঢাকা’, যাতে এগারোজন পরিচালকের এগারোটি গল্প রয়েছে সেটির খবর রেখেছি কয়জন?

বাংলাদেশের প্রথম অ্যানিমেশন মুভি ‘টুমোরো’-র ইউটিউব ভিউ এক মিলিয়নেরও কম! প্রজন্ম টকিজ নামে একটি চ্যানেল আছে, যারা চমৎকার সব শর্টফিল্ম বানায়। সব মৌলিক গল্প,আমাদের আশেপাশেরই গল্প। অথচ তাদের সর্বোচ্চ রিচ হওয়া ভিডিওর ভিউ মোটে দেড় লাখ! আমরা ওসব দেখি না।

বর্তমান প্রজন্মের তরুণ তরুণীদের অধিকাংশের ফোন ঘাঁটলে রবীন্দ্র নজরুল বাদ দেন, সুবীর নন্দী, ফরিদা পারভিন, রফিকুল আলমদের গান পাবেন না। এরা তো মান্ধাতা আমলের। কুমার বিশ্বজিৎক, পার্থ বড়ুয়া, বাপ্পা মজুমদারদেরও পাবেন না প্লে লিস্টে। নামকরা ব্যান্ডগুলোর অতি পরিচিত কিছু গান ছাড়া বাকীগুলো পাবেন না তেমন। অ্যান্ড্রু কিশোর মরার পর তাকে নিয়ে পোস্টের খাতিরে পোস্ট দিলেও উনার সাফল্যের প্যারামিটারের উচ্চতা সমন্ধে ধারণা নেই এদের।

বইপড়ার চল কমছে দিনদিন। বই যে কতখানি সুস্থ বিনোদন তা নিয়ে ধারণাই বোধকরি নেই টিনএজ ড্যুডদের। এদের প্রত্যেকের ফোনে টিকটক আছে, লাইকি আছে, পাবজি, ফ্রি ফায়ার, কল অব ডিউটি আছে। আছে লুডুস্টার। সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে থাকে এসবে। এর বাইরেও একটা দুনিয়া আছে সেটা সমন্ধে ওরা অবগত নয়। তাই আধুনিক ডিভাইসে অপু ভাই, মামুন ভাইদের দেখে। হিরো আলমকে নিয়ে মজা করে। আরেকটা জিনিস এখন খুব খাচ্ছে। মিমস। ওটা নিয়ে হাজার রকমের পেজ, গ্রুপ আছে! আমজনতা খুব খাচ্ছে, মিমাররা মজা পাচ্ছে।

আমাদের বাবা, বড়ভাইদের কাছে গল্প শুনেছি- হলে নতুন সিনেমা এলে, পছন্দের ব্যান্ডের নতুন গান মুক্তি পেলে উনারা রীতিমতো পাগল হয়ে যেতেন। প্রিয় তারকার স্টাইল ফলো করতেন। তাদের সময়ের তারকাদের রুচির প্রশংসা শুনি আর আক্ষেপ করি! এখন পথেঘাটে দেখা মেলে চুলে লাল, হলুদ, সবুজ রং করা, রঙচঙে শ্যু-স্নিকার পরা, অতিমাত্রায় ছেঁড়া বিচ্ছিরিরকমের প্যান্ট, চোখ ঝলসানো জামা আর হাতে গলায় গহনা লাগিয়ে বাইক নিয়ে ঘোরা একদল গর্দভের। জায়গা অজায়গায় ক্যামেরা বা মোবাইল বের করে দশ বারো সেকেন্ডের ক্লিপ বানিয়ে নেটে ছাড়ে। ব্যস, হিট হওয়া আটকায় কে?

দোষটা আমাদের। এদের দেখলে আমরা মজা নিই। এরাও দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে। আহাম্মকিটুকু ধরিয়ে দেই না। কয়টা পরিবার এখন বাচ্চাদের সময় দেয়? হলফ করে বলা যায়, আঙুলের কড়ে গুণে সেই সংখ্যা বের করা যাবে। কোনটা ভালো, কোনটা খারাপ, কোনটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কোনটা নেতিবাচক; বেশিরভাগেরই নেই ন্যূনতম জ্ঞান। তাহলে তাদের দোষ দিব কিসের ভিত্তিতে?

মানুষ তার কর্মে বাঁচে। সালমান শাহ যার জ্বলজ্বলে উদাহরণ। সঙ্গীতে আইয়ুব বাচ্চু, সঞ্জীব চৌধুরিদেরদের কখনো মৃত্যু হবে না। বইপাড়ায় এক হূমায়ুন আহমেদের নাম মোর দ্যান এনাফ। নাটকের একজন প্রতিভাবান সায়েম সাদাতকে এখনো মানুষ স্মরণ করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে হাজার ওয়াটের আলো দিয়ে খুঁজেও তেমন প্রমিজিং কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেদিন অপু মামুনের ঝগড়ার পর মামুনের ভক্তকূল বলে উঠল, টিকটকাররা নাকি দেশকে বিশ্বের সামনে রিপ্রেজেন্ট করছে!

একটা দেশের ব্যান্ড সংগীত, সিনেমা, খেলাধুলা বিশ্বের দুয়ারে প্রতিনিধিত্ব করে বলে এতদিন জেনে এসেছি। যখন উঠতি প্রজন্ম যারা কি-না দেশের ভবিষ্যৎ, ওদের মুখ থেকে যদি শুনতে হয় সস্তার এসব সো কল্ড সেলেবদের গুণগান তখন আফসোসের সঙ্গে সঙ্গে করুণাও হয়।

হিরো আলম যেমন জায়েদ খানের সাথে কথার লড়াইয়ে জড়িয়ে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিল এই বলে – ‘আপনি আর আমি একমঞ্চে দাঁড়াব, দেখি কাকে লোকে বেশি চেনে!’ ভাবা যায় এসব? আগে লড়াই হতো কলমের, ক্যামেরার, বাদ্যযন্ত্রের, আর এখন? তেঁতো উত্তর চোখের সামনেই।

সেফাতউল্লাহ বিতর্কিত হলেও মাঝেমাঝে তার কথার সঙ্গে তাল মেলাতেই হয়। আমরা আসলেই অশিক্ষিত, মূর্খ, বর্বর এক প্রজন্ম নিয়ে এগিয়ে চলছি!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।