চোখের আড়াল, তবু মনের আড়াল নয়

রাখী গুলজারের জন্মটাই হয়েছে ঐতিহাসিক এক মুহূর্তে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার রাণাঘাটে যখন এক বাঙালি পরিবারে জন্ম হয়, তার কিছুক্ষণ আগেই ভারতের স্বাধীনতার ঐতিহাসিক সেই ভাষণ দেন জওহরলাল নেহেরু।

দেশ স্বাধীন হয়েছে, সংসারে এসেছে নতুন একটি মুখ – এতগুলো আনন্দের সংবাদও অবশ্য সেদিন রাখীর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। কারণ, তখন যে পরিবারটা রিফিউজি। পূর্ব বঙ্গ, মানে এখনকার বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বিশাল জুতার ব্যবসা ছিল রাখীর বাবার। কিন্তু, সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে পরিবার নিয়ে তিনি চলে যান পশ্চিমবঙ্গে।

তাই তখন পরিবারটিকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। রাখী এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে, আমাদের মত শরণার্থীদের জন্য ভরসা রাখার মত কোনো জায়গা ছিল না। আমার শুধু মনে আছে, বাবা রোজ রেডিও ‍শুনতেন। পুরোটা জীবনই তাঁকে এটা করতে দেখেছি আমি। পরে, আমিও সেই একই কাজ করতাম।’

পারিবারিক টানাপোড়েনেই কি না, খুব অল্প বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন রাখী। যাকে এখন লোকে বাল্য বিবাহ বলে। স্বামী ছিলেন বাঙালি সাংবাদিক-সিনেমা পরিচালক অজয় বিশ্বাস। তবে, বিয়েটা খুব বেশিদিন টেকেনি।  তাঁরা ছাড়াছাড়ি করে ফেলেন। রাখী বলেন, ‘যখন আমি অজয়কে বিয়ে করি তখন আমি ভালবাসা বা বিয়ে – কোনোটারই মানে বুঝতাম না। আমি শুধু জানতাম প্রত্যেক মেয়েকেই বিয়ে করতে হয়, তাই আমিও করেছিলাম। এটা ছিল অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ, আর শুরু থেকেই বিষয়টা আমার কাছে শাস্তির মত মনে হতে থাকে।’

রাখীর পর্দার জীবনটাকে বেশ বর্ণাঢ্যই বলা চলে। ১৯৬৭ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে বাংলা সিনেমা ‘বধূ বরণ’ দিয়ে তাঁর অভিষেক। প্রথম হিন্দি সিনেমা করেন ১৯৭০ সালে। ধর্মেন্দ্র’র বিপক্ষে রাজশ্রী ফিল্মসের ব্যানারে মুক্তি পায় ‘জীবন মৃত্যু’। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৩ সাল অবধি কাজ করেন। লম্বা এই সময় রাখী অভিনীত প্রায় আনুমানিক ৯১ টি সিনেমা মুক্তি পায়।

রাখীর শেষ কাজ ২০০৩ সালের ‘শুভ মহরৎ’। ঋতুপর্ণ ঘোষের পরিচালনায় আগাথা ক্রিস্টির ‘মিরর ক্র্যাকিং ফ্রম সাইড টু সাইড’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ সহ-অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতেন রাখী। এরপর আর ইন্ডাস্ট্রিতে আসেননি রাখী।

সব ধরণের পুরস্কার মিলে রাখী মোট ১৬ বার মনোনয়ন পেয়েছেন। এর মধ্যে আটবার সেটা অভিনেত্রী হিসেবে, আর আটবার সেরা সহ-অভিনেত্রী হিসেবে। সর্বোচ্চ মনোনয়ন পাওয়ার দিক থেকে কখনো তাঁকে কোনো অভিনেত্রী ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। মাধুরী দিক্ষিত কেবল তাঁকে ছুঁতে পেরেছেন।

পরিণত বয়সে রাখির আবারো বিয়ে হয়েছিল। এবারের পাত্র খ্যাতনামা পরিচালক, কবি ও লিরিকিস্ট সম্পূর্ণ সিং গুলজার। রাখী মজুমদার বনে গেলেন রাখী গুলজার। প্রেমের বিয়ে এই দম্পতির জুটি ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ আলোচিত ছিল। তাঁদের একমাত্র মেয়ে মেঘনা ‍গুলজার। মেঘনা নিজেও একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি ফিলহাল, জাস্ট ম্যারিড, দাস কাহানিয়া ও তালভারের মত সিনেমা বানিয়েছেন।

যদিও, মেঘনার বয়স যখন মাত্র এক বছর তখনই তাঁরা আলাদা যান। আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ অবশ্য হয়নি কখনো। মেঘনা বড় হয়েছেন বাবার কাছে। এই সময় রাখীর ব্যক্তিগত জীবন খুব বিপর্যস্ত ছিল। প্রায়ই তিনি মদের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন। জীবনটা হয়ে ওঠে অনিয়ন্ত্রিত।

ক্যারিয়ারের এই সময়টাতে সিনেমার চরিত্র ও ব্যক্তিগত জীবনের কারণে তাকে ‘কুইন অব ট্র্যাজেডি’ মিনা কুমারীর সাথেও তুলনা করা হত। মিনা অবশ্য ৩৮ বছর বয়সেই চলে গিয়েছিলেন জীবন নদীর ওপারে। রাখী এই ৭১ বছর বয়সেও দিব্যি বেঁচে আছেন।

তবে, পর্দা তো বটেই, লাইমলাইটেরও অনেক দূরে তাঁর বসবাস। প্রথমে থাকতেন মুম্বাইয়ের সরোজিনী রোডের ‘মুক্তাঙ্গন’ নামের বাড়িতে। এরপর দু’বাড়ি বাদেই একটা অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠেন। সেই ফ্ল্যাটের নামও রাখেন মুক্তাঙ্গন। কে জানে, নিজের বাড়িতে হয়তো তিনি মুক্ত বিহঙ্গের মত উড়তে জানেন! ২০১৫ সাল থেকে অবশ্য বেশিরভাগ সময়ই কাটান  পানভেলে নিজের ফার্মহাউজে।

চোখের আড়ালে গেছেন, কিন্তু এসব চার দেওয়ালের স্বেচ্ছা নির্বাসনেরও তাকে মনের আড়াল করার সাধ্য নেই!

– বলিউড বাবল অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।