কনটেন্টই এখন ‘কিং অব কলকাতা’

২০১৮ সাল শেষ হল। কলকাতার বাংলা চলচিত্রের জন্য দুর্দান্ত একটি বছর গেল।  এবছর টলিউড পাড়া বেশ কয়েকটি দারুণ অর্থবহ এবং ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়া ছবি পেয়েছে।

সময় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে, ভারতীয় সিনেমারসিকদের স্বাদ পাল্টাচ্ছে। ধীরে ধীরে একটি বড় পরিবর্তন আসছে এখানে। তাঁরা পুরনো ধাঁচের মশলা ধরণের ছবি বাদ দিয়ে কন্টেন্ট নির্ভর ছবির পিছনে যাচ্ছে। ছোট বাজেটের ছবি হলেও কাহিনীসমৃদ্ধ ছবিগুলি এখন দর্শক ও সমালোচকদের মন জয় করে চলেছে।

তেমনই কিছু আলোচিত, কিন্তু কনটেন্ট নির্ভর সিনেমা দিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। সিনেমাগুলো  খুব বড় বাজেটের না হলেও স্রেফ দারুণ সব গল্পের কারণে সারা ফেলেছে বক্স অফিসে।

  • উড়নচণ্ডী

অভিষেক সাহা পরিচালিত ‘উড়নচন্ডী’ বক্স অফিসে বেশ ভালো সাড়া ফেলে দিয়েছিল। বাংলা সিনেমার প্রথম রাস্তায় দৃশ্যায়িত চলচ্চিত্র বলে মনে করা হয় এটিকে।

চারজন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের কৌতূহলীদ্দীপক গল্প এ ছবিতে উঠে এসেছে। এই ছবিতে তিন প্রজন্মের তিন অভিনেতা ছিলেন – চিত্রা সেন, সুদীপ্তা চক্রবর্তী এবং নবাগত রাজনন্দিনী পল। অমর্ত্য রায় ছিলেন একটি তরুণ লরিচালকের ভূমিকায়। আমাদের সমাজে হরহামেশাই অল্পবয়সী মহিলারা অত্যাচার, যন্ত্রণা ও নৃশংসতার মুখোমুখি হন। চিত্রা সেন, সুদীপ্তা ও রাজনন্দিনীর চরিত্রগুলি এ ছবিতে এই নির্যাতনের মুখোমুখি হয়ে প্রতিবাদী নারীমুখের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

  • রেনবো জেলি

সৌকর্য ঘোষালের শিশুতোষ ফ্যান্টাসি মুভি ‘রেনবো জেলি’ তাঁর অনন্য কাহিনী দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে। এই ছবি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বেশ কয়েকটি পুরষ্কার জেতে। একজন বঞ্চিত শিশু ঘোটনের গল্প ফুটে উঠেছে এখানে, ঘোটন চরিত্রে ছিল মহাব্রত। কৌশিক সেন এখানে একজন বদরাগী কাকার ভূমিকায় ছিলেন, যিনি ভাতিজার উপর সবসময় বিরক্ত থাকতেন।

ছেলেটি তাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে এবং কল্পনার জগতে সবসময় ডুবে থাকত। একদিন, এক পরী নেমে এলো তাঁর কাছে(শ্রীলেখা মিত্র) এবং বলল, যদি তাঁর কাকাকে সাতটি রঙের খাবার খাওয়ানো হয় তবে সে বদলে যাবে। পরী তাঁর জন্য রঙিন এক জেলি বানিয়ে দিল, তারপর একের পর এক অসাধারণ ঘটনা ঘটতে লাগল!

  • পিউপা

পিউপা কলকাতার ভিন্নধারার সিনেমার মধ্যে অন্যতম। এর প্লট ছিল আমাদের দেখা সাধারণ বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রগুলির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পারিবারিক কলহ থেকে ইথানাসিয়ার ধারণা উঠে আসে। ‘ইথানাসিয়া’ হলো মূলত মানসিক চাপ ও কষ্ট উপশম করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের জীবনের শেষ করার জন্য অনুশীলন। চলচ্চিত্রটি শুভ্র নামে একজন প্রবাসীর(রাহুল ব্যানার্জী) গল্প নিয়ে তৈরি, যিনি তাঁর মা মারা যাওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন।

তিনি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন তার বাবার (প্রদীপ মুখার্জী) সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। শুভ্রের কাকা (কমলেশ্বর মুখার্জী) তাকে আবেগকে পাশ কাটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পরামর্শ দেন। আসলে আমেরিকায় তাঁর পিএইচডি শুরু হচ্ছিল, যা ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান, এখন তাঁর যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, আবার যেতেও পারছিল না। সুচিত্রা চক্রবর্তী এই ছবিতে শুভ্রের বোনের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এই গল্পের ক্লাইম্যাক্স ছিল কষ্টের।

  • সোনার পাহাড়

সোনার পাহাড় একজন বৃদ্ধার শেষজীবনের গল্প।একটি শিশু ও বৃদ্ধার স্বর্গীয় বন্ধনের উপর ভিত্তি করে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি সেই বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। শিশু শিল্পী শ্রীজাতো ‘বিটলু’র অসাধারণ চরিত্রটার জোরে অবশ্যই আপনাকে হাসাবে। ইঁদুর দৌড়ের আজকের যুগে, বাচ্চাদেরকে তাদের পরিবার, বিশেষ করে দাদা-দিদাদের সাথে আরও বেশি সময় কাটানো উচিত, যাতে তাঁরা সঠিক মানসিকতা ও মানবিকতা নিয়ে গড়ে উঠে।

গল্পটি এমন একজন বৃদ্ধার সম্পর্কে, যিনি তার ছেলেকে কাছে রাখতে চান এবং অবশেষে ছোট ছেলেটির সাথে তার বন্ধুত্বের মধ্যে কিছুটা শান্তি পান। শুধু গল্পই নয়, তানুজা মুখার্জী এবং জিসু সেনগুপ্তের অভিনয় এই ছবিটির মূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে।

  • আহারে মন

প্রতীম গুপ্তের ‘আহারে মন’ নিজস্বতা দিয়ে আপনার ক্লান্তিকে দূর করে দিবে নিশ্চিত। চারটি চরিত্রের অন্তদ্বিধা ও অন্বয়ী সমীকরণগুলির এমন উপাদান রয়েছে যা সরাসরি আমাদের জীবনের সাথে মিলে যায়। মুভিটি না কোন প্রশ্ন রেখে গেছে, না কোন শুভ সমাপ্তি ঘটিয়েছে।

আহারে মন

এই চলচ্চিত্র কেবল সামাজিক নিয়মে ঘেরা জীবনগুলির বাস্তবতাগুলিতে লুকানো গল্পগুলিকেই বলে। প্রতীম গুপ্ত কেবল কাহিনীতে তার চরিত্রকেই নয় বরং প্রতিটি চরিত্রের স্পন্দন জাগাতে জোর দিয়েছেন।

  • ফ্ল্যাট নং ৬০৯

অরিন্দম ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘ফ্ল্যাট নং ৬০৯’ বক্স অফিসে ঝড় তোলে। অভিনয়ে আবীর চ্যাটার্জী, তানুশ্রী চক্রবর্তী, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মমতা শংকর, রুদ্র্রনীল ঘোষ, খরাজ মুখার্জীরা ছিলেন মুখ্য ভূমিকায়। একটি থ্রিলার কাহিনী গড়ে উঠে অর্ক ও সায়ন্তনী নামে এক দম্পতিকে ঘিরে, যারা কলকাতায় একটি বাসাভাড়া করার জন্য ব্রোকারের সাহায্য চান।

বেশ কয়েকটি বাসা যাচাই বাছাইয়ের পর, নববধূ দম্পতি শেষ পর্যন্ত রাজারহাটের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্বামী একটি আইটি কোম্পানির কাজ করে, তাঁর স্ত্রী তাঁদের নতুন ফ্ল্যাটে বাসা গোছাতে জন্য উৎসাহী এবং উত্তেজিত ছিল। কিন্তু কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে, দম্পতি তাদের নতুন প্রতিবেশীদের সাথে পরিচিত হয় যাদের কিছু রহস্যময় বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

  • গুপ্তধনের সন্ধানে

আবীর চট্টোপাধ্যায়ের সোনাদা চরিত্র দারুণ সব কীর্তি করে যাচ্ছে, যারা ইতিহাস জড়ানো রহস্যকে ভালবাসেন তাদের আকৃষ্ট করবেই! আবীরের ভক্তরা চরিত্রটিতে সাথে লীন হয়ে ছিলেন যতক্ষণ সোনাদা দুঃসাহসিক অভিযানে ছিলেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক সুবর্ণ সেন সংক্ষেপে সোনাদা এ ছবির মূল চরিত্র ছিল, এই গুপ্তধন উদ্ধার অভিযান ভিন্ন স্বাদের কাহিনী দিয়ে দর্শকদের আকৃষ্ট করে। ব্যোমকেশ ও ফেলুদার মতই এ ধরণের চরিত্রে আবীর সবসময়ই দর্শকদের মন জয় করেন।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।