বলিউডের কমেডি ক্রাইসিস!

বলিউডে সর্বশেষ কোন সিনেমা দেখে হাসতে হাসতে আপনার পেটে খিল ধরে গেছে? কবে শেষ আপনি সিনেমার কোনো দৃশ্যে হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে গেছেন? অনেকে হয়তো ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আন্দাজ আপনা আপনা’র কথা বলবেন, কেউ বা সেই ১৯৮৩ সালের ছবি ‘জানে ভি দো ইয়ার’ টেনে আনবেন। কেউ কেউ ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মুক্তি পাওয়া যথাক্রমে ‘হাঙ্গামা’ ও ‘হালচাল’-এর কথথাও বলতে পারেন।

এই সিনেমাগুলোর মুক্তির সালই প্রমান করে দেয় বলিউডে একটা বড় রকমের কমেডি ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর সেকারণেই দর্শকরা লম্বা সময় হল মন খুলে হাসতে পারছেন না। রোম্যান্টিক, সামাজিক কিংবা অ্যাকশন সিনেমা তো বিস্তর হচ্ছে বলিউডে, কিন্তু কমেডি সিনেমা হচ্ছে হাতে গোনা।

কমেডি সিনেমাগুলো তাহলে কোথায় হারালো? একদমই যারা তরুণ তারা হয়তো ‘জানে ভি দো ইয়ার’, ‘চুপকে চুপকে’ কিংবা ‘গোল মাল’ (১৯৭৯ সালে ঋষিকেশ মুখার্জীর অরিজিনাল গোল মাল) দেখেইনি। তাহলে তাদের কমেডির জন্য হাঁহাকার মিটবে কিসে।  নব্বই দশকের পর বলা যায়, কমেডি জেনারটাকে এক হাতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন প্রিয়দর্শন। তাঁর ‘হেরা ফেরি’, ‘হালচাল’ ও ‘হাঙ্গামা’ সিনেমাগুলো তাই প্রমাণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁরও হাত ফাঁকা।

যাই হোক, ভাল একটা কমেডি সিনেমা বানানো কিন্তু বেশ শক্ত কাজ। কমেডি হল এমন একটা জেনার জেনার যেটা গোটা জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের হৃদয় ছুয়ে যাবে। যারা সপ্তাহে অন্তত একটা সিনেমা দেখার বিলাসিতা করতেই পারে উইকেন্ডে, তাঁরা আসলে একটা সুখ খোজার চেষ্টা করে এই সিনেমাগুলোতে। তাঁরা পপকর্ন আর কোল্ড ড্রিংকস নিয়ে হলে আসে হাসতে, টাকা খরচ করে হাসতে আসে, এটা তাদের সপ্তাহের পরিশ্রমকে ভুলিয়ে যায়।

তাই, কোনো ভাবেই এটা ভাবা ঠিক নয় যে এই শ্রেণির মানুষকে হাসানো খুব সহজ। লোক হাসানো খুব শক্ত কাজ। তাই তো মিস্টার বিন কিংবা চার্লি চ্যামলিনের মত মানুষরা ক্ষণজন্মা।  বরং, দর্শকদের কাঁদানো, কষ্ট কিংবা ভালবাসার অনুভূতি দেওয়া সহজ কাজ।

একটা ভাল কমেডি সিনেমা হল একটা সমষ্টিগত চেষ্টা। এখানে কোনো একক অভিনেতার পক্ষে খুব বেশি কিছু করার থাকে না। পরিস্থিতিগত হিউমার ব্যাপারটা নির্ভর করে স্ক্রিপ্টের কাঠামোর ওপর। এখনকার সিনেমায় এই ব্যাপারটারই খুব অভাব। তাই তো ‘তেজা ম্যায়, মার্ক ইধার হ্যায়’র মত আইকনিং ডায়লোগগুলো তাঁদের যোগ্য উত্তরসুরী খুঁজে পায়নি। ‘গোগো জি কা ঘাগড়া’ পুরনো কোনো আলমিরাতে ঝুলে আছে, অপেক্ষায় আছে আবারো কোনো যোগ্য কেউ এসে সেটা পরবে।

এটাই এখন ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক্রাইসিস। এখানে এখানে ভালবাসার ফর্মুলা সিনেমা হয়, সেখানে তারকাদের উপস্থিতি থাকে, সাথে থাকে আইটেম গান। কোনো নির্দিষ্ট তারকার কাঁধে ভর করে সিনেমা হিট কিংবা ফ্লপ হয়। বলিউড এখন সিক্স প্যাক, জিরো ফিগার, কিংবা ‘পারফেক্ট’ লোকেশনে আবদ্ধ হয়ে আছে।

এই অবস্থায় বলিউডকে খুব একটা দোষ দিয়েও লাভ নেই। দর্শকদের চাহিদারও বিবর্তন ঘটেছে। এখন বাহুবলিকে ইমারত ভাঙতে দেখলে লোকে বিনোদিত হয়। তাঁরা চায় ‘বাজিরাও মাস্তানি’-তে রণবীর সিং দিপীকা পাড়ুকোনের সাথে রোম্যান্স করুক। তাঁরা প্রেমে পড়তে যায়। কিন্তু, হাসতে ভুলে গেলে কি আদৌ প্রেমে পড়া সম্ভব?

সিনেমার জেনারেও এসেছে পরিবর্তন।  দীবাকর ব্যানার্জীর ‘খোসলা কা ঘোসলা’য় যেসব হিউমার ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর সাথে মিডল ক্লাস খুব সহজে নিজেদের রিলেট করতে পারে। পরিবারের সাথে ড্রয়িংরুমে দেখার মত আদর্শ এক সিনেমা। সাধাসিধে মধ্যবিত্ত মি. খোসলা (অনুপম খের) কিং এস্টেট ডিলার (বোমান ইরানির)  – দু’জনই ছিলেন অনবদ্য।

ফরাসি সিনেমা ‘লে ডিনের ডি কন্স’ অনুকরণে নির্মিত ‘ভেজা ফ্রাই’ আক্ষরিক অর্থেই দর্শকদের ভেজা (ব্রেইন) ফ্রাই করেছে, আর দর্শক তাতে খুব একটা আপত্তি করেনি। খুব অল্প বাজেটের সিনেমা হওয়ার পরও বক্স অফিসে বড় সাফল্য এসেছে। ফলে, আবারো প্রমাণিত হয় যে, দর্শক কমেডি থেকে একদম মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। ভাল সিনেমা হলে, কমেডিতে এখনো ব্যাপক আগ্রহ আছে তাঁদের।

ভিন্ন জেনারের সিনেমাতে কমেডি উপাদান ঢেলে দিয়ে ফিউশন হচ্ছে। বেশ দারুণ ভাবে মানিয়েও যাচ্ছে। গত দুই যুগে ভাল ভাবে এটা বিস্তর সংখ্যক সিনেমায় দেখা গেছে। এর মধ্যে ‘হেরা ফেরি’, ‘থ্রি ইডিয়টস’, ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’ কে আদর্শ কমেডি টাইমিংয়ের সিনেমা বলে উদাহরণ দেওয়া যায়।

অন্যদের মধ্যে ‘ভুল ভুলাইয়া’, ‘হালচাল’ (দু’টোই প্রিয়দর্শনের), কিংবা গোলমাল সিরিজের প্রথমটা দর্শকদের মনে ভালভাবেই গেঁথৈ গেছে। তানুজা চন্দ্র’র ‘কারিব কারিব সিঙ্গেল’ খুব পরিপক্ক একটা ভালবাসার গল্প হলেও সেখানে খুব মোক্ষম কায়দায় হিউমার ব্যবহৃত হয়েছে। একই কথা বিকাশ ব্যালের ‘কুইন’-এর ব্যাপারেও বলা যায়।

‘বাজরাঙ্গি ভাইজান’ সিনেমায় নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীর করা ‘চাঁন্দ নবাব’ চরিত্রটাও ভাল করেছে। বলিউডে এগুলোই এখন ‘পারফেক্ট কমিক মোমেন্ট’। তবে, শুধু মোমেন্ট দিয়ে আর কদ্দিন কাজ চলবে, এখন সময় পূর্ণাঙ্গ কমেডি সিনেমা নির্মানের। কমেডি জেনারটাকে স্রেফ কিছু মোমেন্টে ধরে রাখতে চাইলে শিগগিরই এটা কালের ধারায় হারিয়ে যেতে পারে।

সেদিন হয়েছে বাসি যে সময় কমেডি নির্ভর সিনেমাগুলো দেখে হাসতে হাসতে লোকে বেহুশ হয়ে যেত। সিনেমাগুলো এমন ছিল যে, গোটা হলে একা বসে দেখলেও নিজেকে একা মনে করার উপায় নেই। কবে আবার সেদিন আসবে, যখন বহুকালের পুরনো জোক্সেই আবার হাসবে দর্শক? বলিউডের তেজা কিংবা রিং মাস্টার গোগোরাই বা কোথায় গেল? কবে ফিরে আবারো দর্শকদের হাসির রাজ্যে ভাসাবে? এই মুহূর্তে তাই বলিউডে কমেডি বিপ্লবের কোনো বিকল্প নেই। নয় তো যতদিন যাবে কমেডির জন্য লোকের আক্ষেপ আর চুলকানি ততই বাড়বে!

– মেনএক্সপি অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।