ওবায় আউক্কা সিলেট!

কলেজ বেশকয়েকদিনের জন্য বন্ধ। ছুটিটা কীভাবে উপভোগ করব তা ভাবতে ভাবতে দুইদিন কেটে গেল। কিছুই যেন মাথায় আসছিল না। এমতাবস্থায় হঠাৎ করে নাজমুল ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কয়েকদিন ফ্রি আছি কিনা। মাথা উপর-নিচ নেড়ে আমি তাঁর প্রশ্নে ইতিবাচক সায় দিলাম। সাথে সাথে তিনি বলে উঠলেন, ‘তাহলে ব্যাগ গুছিয়ে ফেল। কাল সকালে সিলেট যাচ্ছি আমরা।’

সিলেট বাংলাদেশের সুন্দর জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। পূণ্যভূমি সিলেট প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের এক অনন্য আধার। টিভিতে বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র অনুষ্ঠানে সিলেটের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে আগে শুধু মুগ্ধ হতাম। সেই মুগ্ধতা থেকেই সিলেট সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য জোগাড় করা শুরু করে দিই একসময়। অবশেষে নাজমুল ভাইয়ের পরিকল্পনায় একদিন হঠাৎ করেই সিলেট যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলি।

আমি তো মহা খুশি। সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আমাকে একটু বেশিই আকর্ষণ করে সবসময়। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে সেই আকর্ষণকে বরাবরই পাস কাটিয়ে যেতে হয় আমাকে। অতঃপর নাজমুল ভাইয়ের কল্যাণে আজ থেকে তিন বছরেরও বেশি সময় আগে অপরূপ সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি সিলেটের রূপ দুই নয়নভরে উপভোগ করার সুযোগ আসে আমার সামনে। সেসময় আমি এতটাই কৌতুহূলি ছিলাম যে সিলেট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার ৫ মিনিটের মধ্যে ব্যাগপ্যাক গুছিয়ে আমি পুরোপুরি প্রস্তুত। পরদিন সকালে সিলেটের পথে যাত্রা শুরু করি আমরা।

সিলেটে নাজমুল ভাইয়ের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব ও বড় ভাই আছেন। তাদের মধ্যে উনার বন্ধু মোহাম্মদ সাদেক আমাদের রিসিভ করেন। প্রথম সাক্ষাতে সাদেক ভাই সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় আমাদের সাথে যে কথাগুলো বলেন তার কিছুই আমি বুঝি নাই।

পরে নাজমুল ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি বুঝছো কিছু?’ ভাইয়ের জবাব, ‘ইতা ছিলোটি মাত। আস্তে আস্তে বুঝবি।’ যদিও সিলেটের ভাষা বুঝে উঠা অতটা সহজও না। কারণটা বলতে গেলে বাংলা সাহিত্যের বিদ্রুপাত্মক প্রাবন্ধিক প্রমথ চৌধুরীর এই উক্তিটি মনে পড়ে যায়, ‘বাংলা ভাষা আহত হয়েছে সিলেটে আর নিহত হয়েছে চট্টগ্রামে।’ আসলে বাংলা ভাষার সাথে সিলেট ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার এতটাই অমিল যে ওখানকার জনগোষ্ঠী ব্যতীত তাদের ভাষা বুঝা অন্যদের জন্য বড় দায়।

সিলেটে প্রথম রাতটা আমরা সাদেক ভাইয়ের বাসায় কাটাই। রাতে সাদেক ভাইকে আমি সিলেট ঘুরার একটা পরিকল্পনা সাজিয়ে দিতে বলি। তখন আমাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘সিলেট যে সুন্দর জায়গা ছুডু ভাই, ইকান গুরিয়া তুমি শেষ করতে ফারতানায়। ইতার চিফায় চাফায় সৌন্দর্য্য।’

সাদেক ভাই এত দ্রুত কথাগুলো বলছিলেন যে আমি কিছুই বুঝি নাই। তাঁর কথার আগাগোড়া না বুঝে শুধু মাথা নাড়াই আমি। প্রথম দিন সিলেট শহরটা পায়ে হেঁটে ঘুরি আমরা। সুরমা নদীর তীর, নতুন ব্রীজ, হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজার দেখতে দেখতেই বিকেল গড়িয়ে রাত। তারপরের তিনদিন প্রাণভরে সিলেটের ‘চিফা চাফা’ অলিগলির যত সোন্দর্য্য আছে সব উপভোগ করি আমরা।

  • সিলেট যেভাবে যাবেন

রাজধানীর সায়দাবাদ থেকে সারাদিন প্রতি আধঘন্টা পরপর সিলেটগামী বাস ছাড়া হয়। নন এসি বাসের ভাড়া ৪৮০ টাকা (শ্যামলী,হানিফ)। আর কলাবাগান থেকে ছাড়া সিলেটগামী গ্রীন লাইন বাসের ভাড়া ৮০০-১০০০ টাকার মত। বিজনেস ক্লাস ১২০০ টাকা।

সিলেটে বাস গিয়ে থামে কদমতলী বাসস্ট্যান্ডে। সেখানে পৌঁছতে সময় লাগে ৫.৩০-৬.০০ ঘন্টা। গান শুনতে শুনতে কিংবা জানালা দিয়ে বাইরের পরিবেশ দেখতে দেখতে এই সময়টা কখন যে ফুরিয়ে যায় তা আসলে টেরই পাওয়া যায় না।

  • যেখানে থাকবেন

হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজারের আশেপাশে, আম্বরখানায় অনেক হোটেল রয়েছে থাকার জন্য। মানের দিক থেকে সেগুলোর ভাড়া ৫০০-৬৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে।

  • যেখানে খাবেন

হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজারের আশেপাশে বিভিন্ন মানের অনেক খাবার হোটেল রয়েছে। তবে সিলেটের সুপরিচিত হোটেল হলো ‘পাঁচ ভাই’ এবং ‘পানসি’। এই হোটেল দু’টোর খাবারের গুণগত মান অনেক ভালো। নতুন গড়ে ওঠা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টগুলোতেও খেতে পারেন। খাবারের স্বাদ ঢাকার মতই। এছাড়া উপশহরের পাশেই ‘লাহাম’ নামের হোটেলে এক কাপ চা বা দুপুরের খাবার খেতে ভুলবেন না।

  • ঘোরার জায়গা

সিলেটে ঘুরার জায়গার অভাব নেই। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো হলো

১. বিছানাকান্দি

২. জাফলং

৩. পান্থুমাই

৪. রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট

৫.লাক্কাতুরা চা বাগান

৬.হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজার

সিলেটের বাইরে রয়েছে মাধবকুন্ড ইকোপার্ক, শ্রীমঙ্গলে লাউয়াছড়া ফরেস্ট, হামহাম ঝর্ণা, সিতাপ ঝর্ণাসহ আরো কত কী!

  • বিছানাকান্দি

আমার দৃষ্টিতে সিলেটের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটি হলো বিছানাকান্দি। প্রথমবার যখন গেলাম সেখানে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না। সামনে সারি সারি পাহাড়। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের দল। পাহাড়ের বুক বেয়ে বয়ে চলা ঝর্ণার পানি এসে মিলছে নদীতে। বিছানাকান্দির ঝর্ণার পানি এত স্বচ্ছ যে পানির নিচে থাকা বিভিন্ন রং এর পাথর এমনকি পানির নিচে ডুবে থাকা পা স্পষ্ট দেখা যায়। এর চারদিকে সবুজের ছড়াছড়ি। মানে সবকিছু মিলিয়ে এ যেন এক কল্পনার রাজ্য!

আর এই কল্পনার রাজ্যে গমন করতে সিলেট বন্দর, শিশু পার্ক এবং আম্বরখানা থেকে হাদারপার বাজারগামী লেগুনা,সি.এন.জি পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ১২০ টাকা। বিছানাকান্দির জন্য সি.এন.জি রিজার্ভ নিলে ভাড়া পড়ে ৮০০-১২০০ টাকা। হাদারপার থেকে পায়ে হেঁটে অথবা নৌকায় বিছানাকান্দি যাওয়া যায়। নৌকার ভাড়া ৮০০-১৬০০ টাকা। পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে ৩০-৪০ মিনিট। তখন আশেপাশে নজর বুলাতে বুলাতে সময় পার হয়ে যায়।

  • রাতারগুল

বর্ষাকালে রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট এক অন্য রূপ ধারণ করে। চারদিকে পানি আর পানিতে ডুবে থাকা এক বিশাল বন। বর্ষাকালে পুরো বনটাই পানিতে ডুবে থাকে। তাই পুরো বন নৌকা নিয়ে ঘুরতে হয়। এখানে ওয়াচ টাওয়ারও আছে যেখান থেকে পুরো বনের সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়।

রাতারগুল যেতে আম্বরখানা থেকে সি.এন.জি রিজার্ভ করা যায়। ভাড়া ১০০০-১২০০ টাকা। রাতারগুলের নৌকা ভাড়া ৬৫০ টাকা। চাইলে রাতারগুল ও বিছানাকান্দি যাওয়ার সি.এন.জি একবারে রিজার্ভ করে নিতে পারেন। ভাড়া পড়বে ১৫০০-১৬০০ টাকা।

  • জাফলং

কদমতলী বাসস্টপ থেকে জাফলং যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ৬৫ টাকা। বাস থেকে নেমে অটো করে ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার ভাড়া ৩০ টাকা। ঘাট থেকে জাফলং যাওয়ার নৌকা ভাড়া লোকাল ৫০ টাকা আর নৌকা রিজার্ভ নিলে ৬০০-১০০০ টাকা। বর্ষাকালে জাফলং যাওয়ার সময় পান্থুমাই যাওয়া যায়।

  • লাক্কাতুরা চা বাগান

লাক্কাতুরা সিলেট শহর থেকে বেশি দূরে নয়। লাক্কাতুরা চা বাগান মোটামুটি বিশাল একটি জায়গাজুড়ে অবস্থিত। ছোট ছোট টিলা রয়েছে সেখানে যেগুলোতে চা পাতা চাষ করা হয়। বিকেলে সময় কাটানোর জন্য বেশ ভালো একটা জায়গা লাক্কাতুরা চা বাগান। ওহ হ্যাঁ! সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামও একদম এর গা ঘেষে। সি.এন.জি ভাড়া আম্বরখানা থেকে ১০০-১৫০ টাকা (রিজার্ভ)।

  • হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজার

সিলেট আম্বরখানার পাশেই হযরত শাহজালাল (রা:) এর মাজারের অবস্থান।

  • টিপস

১. সিলেটে ঘুরতে আসলে গ্রুপ করে আসাই ভালো। এতে টাকাও সাশ্রয় হবে, সাথে সাথে ট্রিপটাও বেশ উপভোগ্য হবে।

২. সাঁতার না জানা থাকলে বিছানাকান্দি, রাতারগুল এবং জাফলংয়ের পানিতে সাবধানতা অবলম্বন করাই শ্রেয়। আর কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে বাহনের ভাড়া অবশ্যই ঠিক করে নিবেন।

৩. কোনো জায়গায় অপচনশীল কিছু ফেলবেন না। চিপ্স এর প্যাকেট, পানির বোতল সাথে করে নিয়ে আসবেন। আমি এখন পর্যন্ত দুইবার বিছানাকান্দি গিয়েছি। তো শেষবার বিছানাকান্দি গিয়ে জায়গাটা চিনতে আমার একটু বেগ পেতে হয়েছিল। প্রথমবার দেখা বিছানাকান্দি এবং শেষবার দেখা বিছানাকান্দির মধ্যে অনেক তফাৎ। জায়গায় জায়গায় পানির বোতল,খাবার এর প্যাকেট, পলিথিন এমনকি শিশুদের ব্যবহৃত ডাইপারও পড়ে রয়েছিল সেখানে। ভ্রমণের সময় এসব ছোটখাটো বিষয়ে আমাদের তীক্ষ্ম নজর রাখা দরকার সবসময়। কারণ আমাদের প্রকৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যদি এসব ব্যাপারে সচেতন না হই তাহলে বিছানাকান্দির মতো সুন্দর জায়গা অচিরেই তার স্বরূপ হারাবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।