সিনেমার মানুষ তিনি, জীবনটাও সিনেম্যাটিক!

সত্তর দশকের শেষ ভাগ, ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে চিত্রনায়িকা পারভীন ববি, এমন সময় এক চলচ্চিত্র নির্মাতার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। নির্মাতা বিবাহিত হলেও ভালোই দিন কাটছিল, কিন্তু আচমকা ববি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ধীরে ধীরে তা আরো প্রকট হয়ে উঠলো। প্রেমিক যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলে তাকে সুস্থ করতে, কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন, ফিরে যান স্ত্রীর কাছে।

পরবর্তীতে সেই প্রেমিক নির্মাতা নিজের জীবনের গল্প থেকে অনুপ্রানিত হয়ে নির্মান করলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সিনেমা ‘আর্থ’। স্ত্রীর ভূমিকায় শাবানা আজমী আর প্রেমিকার চরিত্রে নির্বাচন করলেন স্মিতা পাতিলকে, আর নিজের চরিত্রে পছন্দ করলেন খুলভূষনকে। জগজিৎ সিংয়ের অনবদ্য গজলে সিনেমাটি পেয়েছিল অন্যরকম পরিপূর্নতা। মুক্তির পর ছবিটি বেশ সমাদৃত হয়েছিল, শাবানা আজমী অনবদ্য অভিনয়ে জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার। আর এই সিনেমাটিকে যিনি প্রান দিয়েছিলেন সেই প্রেমিক নির্মাতা হচ্ছেন ভারতীয় সিনেমা জগতের স্বনামধন্য চলচ্চিত্রকার মহেশ ভাট।

১৯৭৪ সালে, ‘মঞ্জিলে এক ভি হ্যায়’ ছবি দিয়ে পরিচালক হিসেবে আত্বপ্রকাশ,এরপর এই দশকেই নির্মান করেন ‘নয়া দৌড়’-এর মত আলোচিত সিনেমা। তবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন আশির দশকে, বহুল আলোচিত আর্থ ছবির পর নির্মান করেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কালজয়ী ছবি ‘সারাংশ’, এক সন্তানহারা পিতার করুণ কাহিনী নিয়ে নির্মিত এই ছবিতে মূল ভুমিকায় অভিষিক্ত হন অনুপম খের, ছবিটি সেই বছর ভারতের হয়ে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করে।

এই দশকেই বাবা ও মেয়ের সম্পর্কের দ্বন্ধ নিয়ে নির্মান করেন ‘ড্যাডি’, বাবা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য অনুপম খের জাতীয়ভাবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিলেন, মেয়ে চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নিজের কন্যা নবাগত পূজা ভাট। বলিউডে শুরু হয় ভাটদের রাজত্ব!

নব্বইয়ের দশকে এসে নিজের জয়যাত্রাকে যেন পরিপূর্ন করলেন, ‘আশিকি’ ছবি দিয়ে বলিউডে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন, উপহার দিয়েছিলেন কিছু প্রতিশ্রুতিশীল তারকা, এরপর ‘দিল হ্যায় কি মানতা নেহি’, ‘সাদাক’, ‘গুমরাহ’, ‘হাম রাহি হ্যায় পেয়ার কে’, ‘দুশমন’, ‘স্যার’-এর মত জনপ্রিয় সিনেমা। যদিও এই দশকে ‘চাহাত’, ‘ডুপ্লিকেট’, ‘দ্য জেন্টলম্যান’, ‘দস্তক’-এর মত ফ্লপ ছবিরও নির্মাতা তিনি।

সর্বশেষ নির্মান করেন ‘জখম’-এর মত প্রশংসিত সিনেমা, এই ছবিতে অভিনয় করে অজয় দেবঘন জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার, পূজা ভাটের সেরা সিনেমা বলা হয় এটাকে।

পরিচালনায় আর না এলেও, ‘বিশেষ ফিল্মসের’ অন্যতম কর্নধার হয়ে প্রযোজক,কাহিনীকার হয়ে উপহার দিয়েছেন বেশকিছু জনপ্রিয় সিনেমা, এর মধ্যে সংঘর্ষ, রাজ সিরিজ, গ্যাংস্টার, মার্ডার, জিসম অন্যতম। এছাড়া প্রেমিকা পারভিন ববির জীবন কাহিনী নিয়ে নির্মিত আলোচিত ছবি ‘ও লামহে’ প্রযোজনা করেছিলেন।

এখনো তার প্রযোজনা সংস্থা থেকে ছবি নির্মিত হয়, তবে আগের মত সাফল্য পাচ্ছেন না। টেলিভিশনের জন্য বেশ কয়েক টি সিরিয়াল ও নির্মান করেন তিনি, এর মধ্যে ‘কাভি কাভি’,   উড়ান’, ‘নাম করন’ অন্যতম।

বলিউডে বহু নতুন মুখ উপহার দিয়েছেন তিনি,যারা পরবর্তীতে জনপ্রিয় তারকায় পরিনত হয়েছেন। অনুপম খের, আশুতোষ রানা, সুস্মিতা সেন, সোনালি বেন্দ্রে, বিপাশা বসু, ইমরান হাশমি, কঙ্গনা রনৌত সবারই আত্বপ্রকাশ ওনার হাত ধরেই, পাকিস্তানের জনপ্রিয় গায়ক আতিফ আসলাম কিংবা বাংলাদেশের স্বনামধন্য ব্যান্ড তারকা জেমসের বলিউড যাত্রা শুরু হয় তার প্রযোজিত ছবিতে। অনেকে বলেন, বাংলাদেশের জনপ্রিয় নায়িকা মৌসুমীকেও উনার ‘ডুপ্লিকেট’ সিনেমার জন্য অফার দিয়েছিলেন।

বর্নিল ক্যারিয়ারে ‘হাম রাহি হ্যায় পেয়ার কে’র জন্য বিশেষ জুরি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন, এছাড়া একাধিক ফিল্মফেয়ার পেয়েছেন।

মহেশ ভাটের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২০ সেপ্টেম্বর।ব্যক্তিজীবনে প্রথমে বিয়ে করেন কিরন ভাটকে, এরপর সোনি রাজদানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পূজা ভাট ও আলিয়া ভাট তার কন্যা, ইমরান হাশমি ভাগ্নে। বাবা নানাভাই ভাট ছিলেন প্রযোজক, বড় ভাই মুকেশ ভাটও প্রযোজক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।