চকবাজারের ইফতার: ঐতিহ্য, হাইপ ও খাদ্য-অখাদ্য

রমজান এলেই ঢাকার পত্রিকাগুলোর প্রথম বা শেষ পাতায় চকবাজারের ইফতার বাজারের ছবি থাকা এখন রীতিমত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। ঢাকার মানুষের জন্য চকবাজারের ইফতার একটা মিথের মত। এর কিছুটা ঐতিহ্য, কিছুটা বাস্তব, আর কিছুটা স্রেফ লোক দেখানো অপপ্রচার।

চকবাজারের ইতিহাসের সাথে দাসপ্রথা জড়িয়ে আছে বলে শোনা যায়। কেউ কেউ বলেন, আরব বণিকরা এখানে দাস ব্যবসা করতেন। চক আরবি শব্দ। এর অর্থ ‘নাখাশ’ বা ‘দাস বিক্রেতা’। জনশ্রুতি আছে, মোগল আমলে এখানে দাস-দাসী কেনাবেচা হতো।  নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে বলা আছে, ১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজারের বিখ্যাত ইফতারর বাজার গড়ে ওঠে।

কালের প্রবাহে চকের ইফতার বাজার এখন অনেকটাই রং হারিয়েছে। আবু যোহা নূর আহমেদ তাঁর ‘উনিশ শতকের ঢাকার সমাজ জীবন’ বইয়ে চকের ইফতার বাজারের অনেক রকম খারাবের কথা বলে গেছেন।  এর মধ্যে আছে – শিরমলি, বাকেরখানি চাপাতি, নান রুটি, কাকচা, কুলিচা, নানখাতাই, শিক কাবাব, হান্ডি কাবাব, মাছ ও মাংসের কোফতা, শামী ও টিকা কাবাব, পরাটা, বোগদাদী রুটি, শবরাতি রুটি, মোরগ কাবাব, ফালুদার শরবত ও নানারকম ফল।

চকের ইফতারের সবচেয়ে বেশি হাইপ তোলা খাবার হল ‘বড় বাপের পোলায় খায়’। এর চেয়ে ওভাররেটেড খাবার ঢাকার ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। যদি কেউ খেতে চান, খেয়ে দেখেন, একবার খেলে আর দ্বিতীয়বার খাবেন না। আমার নিজের অভিজ্ঞতাটাই বলি।

বড় বাপের পোলায় খায়

একবার আমি চকবাজারেরবড় বাপের পোলায় খায়এনেছিলাম। পড়েছিলাম তাতে পোলাওয়ের সাথে  মেশানো থাকে মুরগি, গরু, খাসী, কলিজা ভুনা, মগজ ভুনা, চিড়া, কোয়েল পাখি, ডিম, নানারকম মসলা ইত্যাদি। এনে ইফতারের সময় দেখি তাতে মুরগীর গলা, ডানা, গরুর মাংসের ছিড়া টুকরা, কলিজার ফ্যাপশাএসব চিড়ার মধ্যে মাখানো! তাতে তীব্র ঘামের গন্ধ! তখনই কানে ধরেছি – আর নয় ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

কেউ কেউ বলেন, এই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ পুরান ঢাকার নিজস্ব খাবার নয়, আবার কেউ বলেন আগে এই খাবারটা যেমন ছিল এখন সেই মানের ছিটেফোটাও নেই। এটা নিয়ে অনেকরকম ইতিহাস প্রচলিত আছে, অনেক রকম তর্ক-বিতর্ক আছে।

তবে, চকবাজারের ইফতার অবশ্যই আপনি কিনে খাবেন। সেজন্য আপনাকে বোম্বে কনফেকশনারি, আনন্দ কনফেকশনারি, আমানিয়া হোটেলের মত ঐতিহ্যবাহী সব দোকানে যেতে হবে। চকবাজারে জিলাপি কিনবেন বোম্বে কনফেকশনারি থেকে, আর না হয় চকবাজার শাহী মসজিদের পেছনে ‘চুড়িহাট্টা’ নামের যে গলি আছে সেখানকার ‘নিয়াজের জিলাপি’ থেকে। মিষ্টির জন্য ‘আলাউদ্দিন সুইটমিট’ তো আছেই।

রমজানে চকের রাস্তায় অনেক রকম ইফতারের পসরা বসে। সেসব দেখতে যত আকর্ষণীয়ই হোক না কেন, খেতে যাবেন না। বিশেষ করে রাস্তার ওপর থেকে দই বড়া খাবেন না, খেলে পস্তাবেন। না খেলে পস্তাবেন না, নিশ্চিত।

চকবাজার যাবেন, অথচ কাবাব খাবেন না, তা কী হয়? হতেই হবে। চকবাজারে গিয়ে কাবাব খাবেন না। ওখানে কাবারের নামে যা পাওয়া যায় তা আসলে কোনো কাবারে মধ্যেই পরে না। রেশমি কাবাব, সুতি কাবাব, জালী কাবাবা, বটি কাবাব ইত্যাদি যত বাহারী নামই থাকুক না কেন, খেতে যাচ্ছেতাই। আপনি একান্তই যদি কিনতে চান, তবে চকবাজার মসজিদের নিচে আনন্দ বেকারিতে ঢুকে পড়েন।

পুরান ঢাকায় দোকান দিলেই সেটা পুরাতন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবার হয়ে যায় না। আসল নকলের পার্থক্যটা জানতে হয়।  পুরান ঢাকার আসল স্বাদ চাইলে অবশ্যই একদিন ঢুঁ মেরে আসুন চকবাজারের শাহ সাহেব বিরিয়ানি থেকে। এটা না খেলে আসলেই পস্তাবেন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।